আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ প্রথম দিন থেকেই দেশের সরকার পরিচালনা শুরু করবে। একইসাথে এটি ১৮০ দিন সময়কাল পর্যন্ত সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবে—এমন মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও সদ্য বিলুপ্ত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
এই বক্তব্য প্রকাশের পর থেকে জনমনে নানা প্রশ্ন জন্মেছে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন ফোরামে মানুষ জানতে চাইছেন, নির্বাচনের পরে অন্তর্বর্তী সরকার কি সত্যিই আরও ১৮০ দিন বা ছয় মাস দায়িত্বে থাকবে? অর্থাৎ, যদি গণভোটে “হ্যাঁ” জয়ী হয়, তাহলে জুলাই সনদে উল্লিখিত সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন হওয়া পর্যন্ত এই সরকারই কি দায়িত্বে থাকবে?
বিভ্রান্তি আরও বাড়ছে এমন বিষয়গুলো নিয়েও। সাধারণ মানুষ জানেন না, হ্যাঁ জয়লাভ মানেই জুলাই সনদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যাবে কি না। এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন হচ্ছে, সংশোধনের কার্যপ্রক্রিয়া কী হবে এবং গণভোটে হ্যাঁ ভোটে জয়লাভের পর সরকার বা সংশ্লিষ্ট সংস্থা কোন ধাপগুলো গ্রহণ করবে।
এই বিভ্রান্তি মূলত তথ্যের অভাব এবং সরকারী ব্যাখ্যা স্পষ্ট না হওয়ায় তৈরি। গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে জনমনে সন্দেহ ও প্রশ্ন স্বাভাবিক। কেউ বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকৃত পরিকল্পনা জানার প্রয়োজন রয়েছে, যাতে জনগণ নিশ্চিত হতে পারে যে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া সংগত এবং সময়মতো সম্পন্ন হবে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করাচ্ছেন, ১৮০ দিন সময়কাল সংবিধান সংশোধনের জন্য নির্ধারিত হলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করে না। সরকারের দায়িত্ব হবে এই সময়ের মধ্যে সংশোধনের প্রস্তাব প্রস্তুত করা, সংসদে প্রক্রিয়া চালু করা এবং জনগণকে বোঝানো।
সুতরাং, আগামী নির্বাচনের পর সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত কার্যক্রম এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল নিয়ে এখনই স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরি। জনমতকে বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত করতে সরকারের উচিত বিস্তারিত ও পর্যাপ্ত তথ্য সরবরাহ করা, যাতে ভোটাররা গণভোটে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
২০২৫ সালের জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, গণভোটে উপস্থাপিত প্রশ্নের উত্তরে “হ্যাঁ” সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু হবে। আদেশ অনুযায়ী:
-
জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যারা সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে।
-
নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দুই ধরনের দায়িত্ব পালন করবেন—একইসাথে জাতীয় সংসদের সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে।
-
সংবিধান সংশোধনের কার্যক্রম পরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন হবে। একবার কার্যক্রম সমাপ্ত হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কার্যক্রম শেষ হবে এবং সংসদ সদস্যদের দ্বৈত দায়িত্বও শেষ হবে।
এই প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে দেখায় যে, সংবিধান সংশোধনের সময়কাল এবং পরিষদের কার্যক্রম শুধুমাত্র নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে যে, গণভোটে হ্যাঁ জয়লাভ করলে অন্তর্বর্তী সরকার আরও ছয় মাস ক্ষমতায় থাকবে। সরকারের পক্ষ থেকে তা ভিত্তিহীন বলে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অধ্যাপক আলী রীয়াজ কোথাও বলেননি যে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ১৮০ দিন সংবিধান সংশোধন কার্যক্রম পরিচালনা করবে; বরং তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই দায়িত্ব পালন করবেন নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই।
সরকারের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সাংবিধানিক সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ হলে সংসদের দ্বৈত ভূমিকার অবসান ঘটবে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শুধুমাত্র সংসদ সদস্য হিসেবেই দায়িত্ব পালন করবেন। এতে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ বাড়ানোর কোনো ইঙ্গিত নেই। আদেশে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে, দ্বৈত দায়িত্বের কথাই, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ নয়।
জাতির উদ্দেশে সম্প্রতি দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট হ্যাঁ হলে আগামী সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এই প্রতিনিধিরা একইসাথে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া পরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন হবে।
প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে আরও বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হবার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে, যার মেয়াদ হবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত।
মূল বিষয়টি স্পষ্ট:
- যারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হবেন, তারা প্রথম ৬ মাস বা ১৮০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
- এই সময়ের মধ্যে জুলাই সনদে উল্লেখিত প্রতিটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক হবে।
- সংসদ সদস্যরা আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করবেন কোন প্রস্তাব পূর্ণমাত্রায় রাখা হবে, কোনটি বাদ দেওয়া হবে বা কোনটি সংশোধিত আকারে অনুমোদিত হবে।
- শুধুমাত্র যে প্রস্তাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য একমত হবেন, তা কার্যকর হবে।
অর্থাৎ, জুলাই সনদ আর কোনো অ্যাবসোলিউট বা চূড়ান্ত ডকুমেন্ট নয়। বরং এটি একটি আলোচনার ভিত্তিক নথি, যা সংবিধান সংস্কার পরিষদে ও সংসদে ভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ পাবে।
- পরিষদের সদস্যরা চাইলে পুরো সনদ অনুমোদন করতে পারেন।
- প্রতিটি প্রস্তাবের ওপর পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা ও বিতর্কের পর সংখ্যা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
- প্রক্রিয়াটি সাধারণ আইন প্রণয়নের মতোই হবে—আলোচনা, বিতর্ক এবং ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত।
এই ব্যাখ্যা আরও স্পষ্টভাবে দেখায় যে, গণভোটে হ্যাঁ জয় মানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জুলাই সনদ কার্যকর হবে না। এটি কেবল সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু করবে, এবং কার্যকরী সিদ্ধান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আলোচনার ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল।
জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংশোধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে গণভোটে হ্যাঁ জয়লাভের পর কার্যকর হবে। এটি কেবল একটি চূড়ান্ত ডকুমেন্ট নয়; বরং এতে উল্লিখিত প্রতিটি প্রস্তাব সংসদ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে বিস্তারিত আলোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত রূপ পাবে। সংবিধানের মূলনীতি সংশোধন সংক্রান্ত বিষয়গুলোর ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের মতামত বিশেষভাবে প্রাধান্য পাবে। যদি সদস্যরা মনে করেন মূলনীতি পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই, বা বর্তমানে যেভাবে আছে সেখানে পরিবর্তন আনতে চান, অথবা জুলাই সনদে যেভাবে উল্লেখ আছে সেভাবেই তারা একমত, সেটিও ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
সংবিধানের মূলনীতি ছাড়াও সংবিধান সংশোধন পরিষদ এবং সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মেয়াদ, রাষ্ট্রপতি নিয়োগ, সংসদে এমপিদের বক্তব্য স্বাধীনতা সম্পর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদ, ডেপুটি স্পিকার ও গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিগুলোর সভাপতি বিরোধী দল থেকে নিয়োগের মতো বিষয়গুলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে। এই প্রস্তাবগুলো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্ক আশা করা যায়।
বিশেষভাবে সংসদের উচ্চকক্ষের গঠনের বিষয়টি কিছুটা জটিল। সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষে নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক (Proportional Representation-PR) পদ্ধতির মাধ্যমে একটি উচ্চকক্ষ গঠন করতে হবে। উচ্চকক্ষের মোট আসন সংখ্যা একশো নির্ধারিত থাকবে এবং নির্বাচিত দলগুলো নিজ নিজ আসনের বিপরীতে সদস্য মনোনয়ন দেবে। উচ্চকক্ষের গঠনের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রয়োজনীয় বিধান প্রণয়ন করতে পারবে। অর্থাৎ, উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে সদস্যরা দ্বিমত পোষণ করতে পারবেন না—এটি বাধ্যতামূলক।
সার্বিকভাবে বলা যায়, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় গণভোট হ্যাঁ মানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব প্রস্তাব কার্যকর হবে না। সংবিধান সংশোধন কার্যক্রমে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আলোচনার ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। উচ্চকক্ষ গঠনও পরিষদের প্রয়োজনীয় বিধান প্রণয়নের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে। এই প্রক্রিয়া সংবিধান সংশোধনের স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী (অনুচ্ছেদ ১৪২), কোনও সংবিধানের ধারা বা মূলনীতি পরিবর্তন করতে হলে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতি প্রয়োজন। কিন্তু জুলাই সনদে উল্লিখিত নিয়ম অনুযায়ী, সংসদের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সংবিধানের যেকোনো সংস্কার প্রস্তাব অনুমোদিত হবে। অর্থাৎ, ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ১৭৬ জন হ্যাঁ বললেই প্রস্তাব কার্যকর হবে। অন্যান্য প্রস্তাবও সংসদে উপস্থিত ও ভোটদানকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাস হয়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি সংসদে কমপক্ষে ৬০ জন সদস্য উপস্থিত থাকেন, তার মধ্যে ৩১ জন পক্ষে ভোট দিলে প্রস্তাব পাস হবে।
সরকার মূলত যেকোনো মূল্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চায়। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৪৮টি প্রস্তাব হুবহু অনুমোদন করানো হবে। এই প্রস্তাবগুলো রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সংবিধান সংশোধনের নিয়ম অনুযায়ী কিছু বিতর্ক ও সমস্যা দেখা দিতে পারে। জুলাই সনদে নোট অব ডিসেন্ট বাদ দিয়ে চূড়ান্ত খসড়া হিসাবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সরকারে পেশ করেছে ৪৮টি প্রস্তাব। এর মধ্যে ২৮টি সংবিধান ও সংসদ সম্পর্কিত।
সংবিধান সংশোধনের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে সংবিধানের মূলনীতি, প্রজাতন্ত্রে রাষ্ট্রভাষা, নাগরিকত্ব, মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্রপতি নিয়োগ ও ক্ষমতা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সংসদের উচ্চকক্ষ এবং সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো। এ ছাড়াও সংবিধানের বর্তমান চারটি মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা—সংশোধিত প্রস্তাবে বদলে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি প্রাধান্য পাবে।
বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, ন্যায়পাল, সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি), দুদকসহ রাষ্ট্রীয় নানা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও ক্ষমতার বিষয়েও প্রস্তাব রয়েছে। এই বিষয়গুলো রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে এগুলোর বাস্তবায়ন কতটুকু হবে তা পরিষদের আলোচনার ওপর নির্ভর করবে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সংবিধান সংশোধনের জন্য নতুন ধারা তৈরি করবে, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতামতের ওপর প্রস্তাব পাস হবে। তবে এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের সাথে সাংঘর্ষিক, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্কের সম্ভাবনা বাড়াবে।
জনমতের দিক থেকে দেখা যায়, সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে এগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে চাইলেও সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা, বিতর্ক এবং মতবিনিময় হবে অপরিহার্য। এ প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন প্রস্তাবের চূড়ান্ত অনুমোদন নিশ্চিত নয়।
জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংশোধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি। তবে এর কিছু প্রস্তাব বিদ্যমান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং গণতান্ত্রিক রীতি-নীতির পরিপন্থি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ কর্তৃক গৃহীত সংবিধান সংশোধন চূড়ান্ত হবে এবং এর জন্য রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের কোনো প্রয়োজন হবে না।
তবে আইনগত বাস্তবতা অন্য। যেকোনও সাধারণ আইনই যেখানে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন প্রয়োজন, সেখানে সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন উপেক্ষা করার যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায় না। বিশেষভাবে, রাষ্ট্রপতিকে ব্যক্তিগতভাবে বিবেচনা করা যায় না; এটি একটি প্রতিষ্ঠান। জুলাই সনদে একদিকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব থাকলেও, সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন উপেক্ষা করা হয়েছে, যা সাংঘর্ষিক এবং বিতর্কিত।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়লাভ মানে জুলাই সনদে উল্লিখিত সমস্ত প্রস্তাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে বা সরকারকে সব প্রস্তাব মানতে বাধ্য করবে—এটি সত্য নয়। শুরুতে সনদে একটি বিধান ছিল, যেখানে নির্ধারিত ২৭০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদ প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানের অংশ হবে। তবে সমালোচনার মুখে সরকার সেই বিধান বাতিল করেছে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের মেয়াদ কমিয়ে ১৮০ দিনে আনা হয়েছে।
বর্তমানে প্রকাশিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সনদ আর কোনো চূড়ান্ত বা অ্যাবসোলিউট ডকুমেন্ট নয়। বরং এর প্রতিটি প্রস্তাব সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদে আলোচনা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত রূপ পাবে। যেসব প্রস্তাবের বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য একমত হবেন, কেবল সেগুলোই অনুমোদিত হবে। অন্যদিকে, সংখ্যাগরিষ্ঠ একমত না হলে বা বিতর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো না গেলে প্রস্তাব পাস হবে না। অর্থাৎ রাষ্ট্র সংস্কারের যে বিষয়ে সদস্যরা ঐকমত্যে পৌঁছাবেন, কেবল সেই সংস্কার কার্যকর হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে যে গণভোটে হ্যাঁ জয়লাভ মানে জুলাই সনদের পুরো ডকুমেন্ট অবিকল সংবিধানে যুক্ত হবে না। বরং সংবিধান সংশোধনের চূড়ান্ত রূপ নির্ধারিত হবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আলোচনার এবং ভোটের মাধ্যমে। এতে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বজায় থাকবে, তবে প্রক্রিয়াটি বিতর্ক ও জটিলতার মধ্য দিয়ে হবে।
জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংশোধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি। গণভোটে হ্যাঁ জয়লাভ করলে সনদে উল্লিখিত প্রস্তাবগুলো সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে পাস হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে।
বিশেষ করে বিএনপির সম্ভাব্য ভূমিকাকে কেন্দ্র করে সরকার, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী ভয় দেখা দিয়েছে। জুলাই সনদের অনেক প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি ছিল। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যখন নোট অব ডিসেন্টগুলো বাদ দিয়ে সনদের চূড়ান্ত খসড়া সরকারকে পেশ করেছে, তখন বিএনপি তা কড়া সমালোচনা করেছে। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়, তাহলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া অনিশ্চিত হয়ে যাবে। অর্থাৎ নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
এই পরিস্থিতি সরকার ও সমর্থক রাজনৈতিক দলগুলোকে উদ্বিগ্ন করছে। সূত্র মতে, নির্বাচনে বিএনপি যাতে সরকার গঠন করতে পারলেও এককভাবে বেশি আসন না পায়, সে জন্য অন্তর্ভুক্ত পরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক কৌশলও ভাবা হচ্ছে। মূল ভয়টি হলো, যদি বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তাহলে জুলাই সনদে উল্লিখিত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোতে তাদের আপত্তি কার্যকরভাবে প্রভাব ফেলতে পারে এবং সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়াটি সরকারের প্রত্যাশামতো এগোতে নাও পারে। এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কেবল আইনগত নয়, বরং নির্বাচনী ফলাফলের ওপরও নির্ভরশীল হয়ে গেছে। গণভোটে হ্যাঁ জয়লাভ মানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সনদ কার্যকর হবে না; সংবিধান সংস্কার পরিষদে এবং সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আলোচনার ও ভোটের মাধ্যমে প্রস্তাব চূড়ান্ত হবে। ফলে সংবিধান সংশোধনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে অনিশ্চিত।
এই প্রক্রিয়ায় সরকার ও সমর্থক দলগুলো সংবিধান সংশোধন, উচ্চকক্ষ গঠন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসহ রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত রূপে বাস্তবায়ন করতে চাইছে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নির্বাচনী ক্ষমতার বিতরণ এই প্রক্রিয়াকে জটিল ও অস্থির করে তুলছে।

