গণভোটে বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে। এই বিজয় জুলাই সনদের অন্তর্ভুক্ত সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পথে বড় ধাপ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ শুধু আইন প্রণয়নই করবে না, এটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভূমিকাও পালন করবে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ ১৮০ দিন বা ছয় মাসের মধ্যে জুলাই সনদ অনুযায়ী সাংবিধানিক সংস্কার সম্পন্ন করতে বাধ্য থাকবে। যদি তা না হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া ‘সংবিধান সংশোধনের বিল’ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাশ হয়ে গেছে বলে গণ্য হবে।
সংস্কারের পর প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাস পাবে, তবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এবার বিভিন্ন সাংবিধানিক পদে নিয়োগ দিতে হবে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল ও ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে। বর্তমানে সংবিধান অনুযায়ী প্রায় সব নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকে। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে অন্য কোনো কাজ করতে হলে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিতে হয়। এই নিয়ম পরিবর্তিত হবে।
সংসদে ভোটের ক্ষেত্রে সদস্যদের স্বাধীনতা বাড়বে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য স্থাপন হবে। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হওয়ায় সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আসবে। সংসদ এখন থেকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হবে। নিম্নকক্ষে পাশ হওয়া কোনো আইন বা সংস্কার উচ্চকক্ষেও অনুমোদিত হতে হবে। ফলে কোনো একক দলের দাবিতে সংবিধান সংশোধন করা কঠিন হবে।
২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সংবিধান ও রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য বিভিন্ন কমিশন গঠন করা হয়—সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। এই ছয়টি কমিশনের সুপারিশের মধ্যে ১৬৬টি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য তৈরি করতে ২০২৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কার্যক্রম শুরু করে।
বিএনপি, জামায়াতসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়, যেগুলোর মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। অন্য প্রস্তাবগুলো সরকারি আদেশ, অধ্যাদেশ বা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য। কিছু সংস্কার ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার বাস্তবায়ন করেছে, তবে সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো শুধুমাত্র অধ্যাদেশ বা আদেশে সম্ভব নয়। তাই এই ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে।
নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত হবে, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, সংসদীয় সদস্যদের স্বাধীনতা বাড়বে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপিত হবে। এছাড়া সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়াও আরও জটিল ও স্বচ্ছ হবে।
ভাষা, নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকারের সংস্কার:
বিদ্যমান সংবিধানে বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষার স্বীকৃতি নেই। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে—বাংলা হবে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা এবং অন্যান্য মাতৃভাষাকেও স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এতদিন দেশের নাগরিকরা বাঙালি জাতি হিসেবে পরিচিত থাকলেও, সংস্কারের পর তাদের জাতীয় পরিচয় হবে “বাংলাদেশি”।
সংবিধান সংশোধনের জন্য পূর্বের নিয়মে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন, গণভোটের প্রয়োজন ছিল না। তবে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় এখন সংসদের নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই সংবিধান সংশোধন সম্ভব। বিশেষ কিছু ধারা—যেমন প্রস্তাবনার ৮, ৪৮, ৫৬, ১৪২ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা—পরিবর্তনের জন্য গণভোটও বাধ্যতামূলক থাকবে।
বর্তমান সংবিধানে ৭-এর ক ও খ অনুযায়ী সংবিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ার বিধান রয়েছে, যা নতুন সংস্কারে বিলুপ্ত হবে। সংবিধানের মূলনীতিও পরিবর্তিত হচ্ছে। বর্তমান সংবিধানের মূলনীতি—বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা—সংস্কারের পর হবে—সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সম্প্রীতি।
সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান নিশ্চিত করা হবে এবং তাদের মর্যাদা সুরক্ষিত থাকবে। এছাড়া বর্তমান ২২টি মৌলিক অধিকারের সঙ্গে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হবে—নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ব্যবহার ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী: দায়িত্ব ও সীমা:
বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরেই জরুরি অবস্থা জারি করা সম্ভব। কিন্তু নতুন সংস্কারের পরে জরুরি অবস্থা জারি করতে হবে মন্ত্রিসভার অনুমোদন নিয়ে। সেই সভায় বিরোধী দলের নেতা বা উপনেতার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। জরুরি অবস্থার সময় সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদের মৌলিক অধিকার—যেমন ইন্টারনেট সেবা ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা—ভঙ্গ করা যাবে না।
রাষ্ট্রপতির নির্বাচনের প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আসছে। বর্তমানে রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন করতে হয় সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে। নতুন নিয়মে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন গোপন ব্যালেটে, উভয় কক্ষের সংসদ সদস্যদের ভোটে। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ করতে পারবেন। এর মধ্যে আছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সদস্যদের নিয়োগ।
রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করতে বর্তমানে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের ভোট লাগে। নতুন নিয়মে উভয় কক্ষের সংসদ সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন হবে। বর্তমানে রাষ্ট্রপতি যেকোনো অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারেন সরকারের অনুমোদন দিয়ে। নতুন সংবিধানে এটি সীমিত হবে—শুধু ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবারের সম্মতি থাকলে অপরাধী ক্ষমা পাবে।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি একই পদে কত বছর থাকতে পারবে, তার ওপর সীমা নেই। নতুন সংস্কারের পরে একজন ব্যক্তি এক জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর, অর্থাৎ দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। এছাড়া বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী একাধিক পদে থাকতে পারেন, নতুন সংস্কারে এটি নিষিদ্ধ হবে।
প্রজাতন্ত্রের সংসদ ও সরকারব্যবস্থার সংস্কার:
বর্তমান সংবিধানে নির্বাচনের সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নেই। নতুন সংস্কারের পরে নির্বাচন পরিচালনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন বাধ্যতামূলক হবে। এতে প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি দল, বিরোধী দল ও দ্বিতীয় বিরোধী দলের মতামত অনুযায়ী দায়িত্ব নির্ধারণ করা হবে।
সংসদও হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। উচ্চকক্ষে ১০০ জন সদস্য থাকবেন। এখানে আসন বণ্টন হবে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারের ভিত্তিতে। এছাড়া নারীদের সংরক্ষিত আসন ৫০টি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১০০টি হবে। বর্তমানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার সরকারি দল থেকেই নির্বাচিত হন। নতুন সংবিধানে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন বিরোধী দল থেকে। সংসদে এমপিরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে পদ হারায়। তবে নতুন নিয়মে বাজেট ও আস্থাবিলের বাইরে এমপিরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।
বিদেশের সঙ্গে সরকারের চুক্তি করতে সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন নেই। কিন্তু ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সম্পর্কিত চুক্তি করতে উভয় কক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হবে। সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের একক কর্তৃত্ব নির্বাচন কমিশনের (ইসি) থাকবে না। এ দায়িত্ব ইসির সঙ্গে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি মিলিয়ে পালন করবে।
নির্বাচন কমিশনের গঠনও পরিবর্তিত হবে। এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে থাকা কমিশন গঠনে আগামীতে অংশ নেবেন—স্পিকারের সভাপতিত্বে বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও আপিল বিভাগের বিচারপতি।
আইন ও বিচারব্যবস্থায় পরিবর্তন:
সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে বড় পরিবর্তন আসছে। বর্তমানে রাষ্ট্রপতি যে কাউকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে পারেন। নতুন সংস্কারে প্রধান বিচারপতি হবে শুধু আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকে।
বিদ্যমান সংবিধানে আপিল বিভাগের বিচারপতির সংখ্যা সরকার নির্ধারণ করে। আগামীতে প্রধান বিচারপতির প্রয়োজন অনুযায়ী বিচারপতির সংখ্যা নির্ধারিত হবে। হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা এখন প্রধানমন্ত্রীর হাতে, নতুন সংস্কারে এটি প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশনের হাতে থাকবে। এছাড়া বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত হবে, প্রতিটি বিভাগের হাইকোর্টে এক বা একাধিক বেঞ্চ স্থাপন করা হবে, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল শক্তিশালী হবে এবং নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত হবে।
ন্যায়পাল নিয়োগে স্পিকারের সভাপতিত্বে গঠিত সাত সদস্যের কমিটি সুপারিশ দেবে। কমিটিতে থাকবেন—বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের প্রতিনিধি, রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি এবং আপিল বিভাগের বিচারপতি। একইভাবে সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক, দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রেও বিরোধী দলের অংশগ্রহণসহ আলাদা আলাদা কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক হবে।
আইনের সংস্কার ৩৬টি:
৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কারের বাইরে আরও ৩৬টি সংস্কার আইন, অধ্যাদেশ, বিধি বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
- সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণে আইন প্রণয়ন
- বিচারকদের জন্য অবশ্য পালনীয় আচরণবিধি
- সাবেক বিচারপতিদের জন্য আচরণবিধি
- সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা
- স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস গঠন
- বিচার বিভাগের জনবল বৃদ্ধি
- জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থাকে অধিদপ্তরে রূপান্তর
- বিচারক ও সহায়ক কর্মচারীদের সম্পত্তির বিবরণ প্রণয়ন
- আদালত ব্যবস্থাপনা সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশন
- আইনজীবীদের আচরণবিধি
- স্বাধীন ও স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন
- সরকারি কর্ম কমিশন গঠন—সাধারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে
- ভৌগোলিক অবস্থান ও সহজ যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনায় কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে দুটি নতুন প্রশাসনিক বিভাগ গঠন
এর মধ্যে কিছু আইন ও অধ্যাদেশ ইতোমধ্যে জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।

