এক বছরের পারিবারিক বিয়ে হলেও দাম্পত্য জীবনে মিল পাওয়া যায়নি। একজন শিক্ষক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) যিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, তিনি জানিয়েছেন, বিয়ের পর থেকে স্ত্রী ও তাঁর মধ্যে পারস্পরিক সখ্য তৈরি হয়নি। কেউ কাউকে পছন্দ করেননি এবং সংসারে আনন্দ ও শান্তি বজায় রাখা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও জানিয়েছেন, স্ত্রী তার নাম ব্যবহার করে যাচ্ছেতাই মন্তব্য করেন এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হেয়াভাবে আচরণ করছেন। পারিবারিক ও আর্থিক কারণে চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি, স্ত্রী তার কাছে মামলা বা জেলহাজতের ভয় দেখাচ্ছেন। তবে তিনি নিজে কোনো আইনি জটিলতায় পড়েননি।
এ অবস্থায় তিনি মনে করছেন, একসঙ্গে থাকা ভবিষ্যতে বড় সমস্যার দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাই তিনি ডিভোর্সের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে আগ্রহী। তিনি জানতে চাচ্ছেন, কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে, কোন প্রতিষ্ঠানে বা কার কাছে আবেদন করতে হবে, এবং এর সাথে যুক্ত খরচ ও সময়কাল কত হতে পারে। তিনি আরো জানিয়েছেন, স্ত্রী তার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না এবং তিনি নিজেও বিয়ে টিকিয়ে রাখতে চাইছেন না। যদি দু’পক্ষই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী না হন, তবে সমাধান খোঁজা জরুরি।
ডিভোর্সের বিষয়টি এখন তার কাছে এক জরুরি ও বাস্তবিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা দিচ্ছে, যাতে ব্যক্তিগত ও মানসিক শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। এ অবস্থায় বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া জানা প্রয়োজন।
সমাধান হিসেবে আইনে সুস্পষ্ট ভাবে দেয়া আছে, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনে তালাকের নিয়ম স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। তালাক দিতে চাইলে আপনাকে প্রথমে লিখিত নোটিশ দিতে হবে। নোটিশটি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে পাঠাতে হবে, যেখানে স্ত্রী বসবাস করছেন।
সাথে তালাকপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে নোটিশের কপি সরাসরি দিতে হবে। নোটিশ পাঠানোর সময় আইনে নির্দিষ্ট কোনো কঠোর সময়সীমা নেই; এটি তখনই বা যথাশিগগির সম্ভব পাঠানো যেতে পারে। ডাকযোগে পাঠালে রেজিস্ট্রিড এডি (Acknowledgment Due) ব্যবহার করা উত্তম, তবে সরাসরি দেওয়ার বিকল্পও আছে।
আইন অনুযায়ী, নোটিশ পৌছানোর তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ কার্যকর হবে। এই সময়ে সালিসি বা সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। ৯০ দিনের মধ্যে কোনো উদ্যোগ না নেওয়া হলেও তালাক কার্যকর ধরা হবে। প্রক্রিয়া শুরু করার আগে একজন যোগ্য আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইনজীবী আপনাকে প্রয়োজনীয় খরচ, সময়কাল এবং অন্যান্য আইনি জটিলতা সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেবেন।
যদি আপনার স্ত্রী মামলা বা জেলহাজতের ভয় দেখায় বা কোনো ব্যক্তিগত বিষয়ে মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে বাংলাদেশে আইনের সুরক্ষা রয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত)–এর ১৭ ধারা স্পষ্টভাবে বলে, কোনো ব্যক্তি যদি অন্যের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে এবং ন্যায্য কারণ ছাড়া মামলা বা অভিযোগ করেন, তাহলে তাকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে। ফৌজদারি কার্যবিধি (২৫০ ধারা) অনুযায়ী, যদি কোনো ম্যাজিস্ট্রেট প্রমাণ পান যে মামলা মিথ্যা বা হয়রানিমূলক, তাহলে বাদীকে কারণ দর্শানোর নোটিশসহ ক্ষতিপূরণ আদেশ দিতে পারেন।
দণ্ডবিধি ১৯১–১৯৬ ধারা মিথ্যা সাক্ষ্যদান, মিথ্যা সাক্ষ্য তৈরি এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার শাস্তি নির্ধারণ করে। তাই, হুমকিপূর্ণ আচরণের ক্ষেত্রে প্রথমে তাঁকে আইনের কথাগুলো জানানো উচিত। এরপরও যদি হুমকি বা হয়রানি চলতে থাকে, নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা ভালো হবে। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। আইনি সচেতনতা ও যথাযথ পদক্ষেপের মাধ্যমে আপনি নিজের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষা করতে পারবেন।
লেখক: ব্যরিস্টার মিতি সানজানা: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।

