চট্টগ্রামের আদালতপাড়ায় বিচারক বাড়ানো হলেও অবকাঠামো বাড়েনি। ফলে এজলাস ও খাস কামরা সংকটে ২৯ বিচারককে ভাগাভাগি করে বিচারিক কাজ চালাতে হচ্ছে। এতে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তিও বাড়ছে।
অর্থঋণ আদালতে এক এজলাসে দুই বিচারক:
চট্টগ্রামের দুটি অর্থঋণ আদালতে ৮০টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণের মামলা বিচারাধীন। নিয়ম অনুযায়ী দুই বিচারকের জন্য আলাদা এজলাস ও খাস কামরা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে দুই বিচারক একটি খাস কামরা ব্যবহার করছেন। একই এজলাস ভাগাভাগি করে চলছে বিচারিক কার্যক্রম।
সকালে অর্থঋণ আদালত-২ এর বিচারক এজলাসে ওঠেন। তাঁর কাজ শেষ হলে দুপুরে একই এজলাসে বসেন অর্থঋণ আদালত-৩ এর বিচারক। কক্ষ সংকটের কারণে এভাবেই বিচার চালাতে হচ্ছে।
মহানগর দায়রা জজ আদালতেও একই চিত্র:
চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের ছয় যুগ্ম মহানগর দায়রা জজও একটি এজলাস ও একই খাস কামরা ভাগাভাগি করছেন। সকালে একজন বিচারক এজলাসে বসলে অন্যজন খাস কামরায় অপেক্ষা করেন। প্রথমজন নেমে গেলে দুপুরে দ্বিতীয়জন এজলাসে ওঠেন। গত ছয় থেকে সাত মাস ধরে এভাবেই চলছে বিচারিক কার্যক্রম।
নতুন ২৯ বিচারকের পদ সৃষ্টি করে পদায়ন করা হলেও তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত কক্ষ ও এজলাস নেই। আদালত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিগগির এ সংকট কাটার সম্ভাবনা কম।
চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নাজির জিএএম শহীদুল ইসলাম জানান, জেলা জজ পদমর্যাদা ও অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজসহ ২৬টি নতুন আদালত সৃষ্টি হয়েছে। অধিকাংশ পদে বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কক্ষ সংকটে একটি খাস কামরা ও এজলাস দুজন বিচারককে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হচ্ছে। সংকট নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপায় খুঁজছেন।
চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের নাজির মো. নেছার আহম্মদ বলেন, মহানগর জজশিপে ১৫ বিচারকের জন্য এজলাস ও খাস কামরা রয়েছে। বর্তমানে ১৯ জন বিচারক থাকায় চারজনের জন্য কক্ষ নেই। নেজারতখানা ও লাইব্রেরি ভেঙে একটি নতুন এজলাস ও খাস কামরা তৈরি করা হয়েছে। তবুও সংকট কাটেনি।
আইনজীবী জাফর ইকবাল বলেন, বিচারিক কাজে গতি আনতে নতুন বিচারক নিয়োগ ইতিবাচক পদক্ষেপ। জেলা প্রশাসন ভবনের সামনে টিনশেড পুরোনো কয়েকটি স্থাপনা খালি রয়েছে। সেগুলো অস্থায়ীভাবে ব্যবহার করলে কিছুটা চাপ কমতে পারে।
আদালত সূত্র জানায়, চারটি অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ পদ সৃষ্টি হওয়ায় বর্তমানে ১১টি অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচার চলছে। সব মিলিয়ে মহানগর দায়রা জজ আদালতে এখন ১৯ জন বিচারক রয়েছেন। এর মধ্যে ১৫ জনের এজলাস ও খাস কামরা রয়েছে। নতুন চারজন অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ অফিস সংকটে আছেন। সাতজন যুগ্ম মহানগর জজ তিনটি এজলাস ভাগাভাগি করছেন। নয়জন অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আলাদা এজলাস ব্যবহার করলেও দুইজনকে একটি এজলাস ভাগ করে নিতে হচ্ছে।
একই অবস্থা চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে। আগে ১০টি আদালত ছিল। পরে আরও ১০টি অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি ১৩টি পারিবারিক যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, একটি ল্যান্ড আপিল ট্রাইব্যুনালের জেলা জজ পদমর্যাদা, একটি জেলা শিশু ধর্ষণ জজ এবং একটি পারিবারিক আপিল জজ আদালতসহ মোট ২৬টি নতুন আদালত গঠন করা হয়।
বর্তমানে জেলা ও দায়রা জজসহ ১১টি অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারকদের জন্য কক্ষ রয়েছে। ফলে একজন অতিরিক্ত জেলা জজের খাস কামরা ও এজলাস দুইজন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজকে ভাগাভাগি করতে হচ্ছে।
জেলা জজ আদালত ভবনের ছাদে তিন বিচারকের জন্য খাস কামরা ও এজলাস নির্মাণে সরকার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। তবে এখনও অর্থ বরাদ্দ হয়নি। বিকল্প হিসেবে জেলা প্রশাসন ভবনের সামনে থাকা পুরোনো তিনটি টিনশেড ভবন ব্যবহারের আলোচনা চলছে। একসময় সেখানে চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের কার্যক্রম চলত। নতুন ভবনে স্থানান্তরের পর ভবনগুলো জেলা প্রশাসনের আওতায় পুলিশ ব্যবহার করছে।
গত সোমবার জেলা দায়রা জজ আদালত ভবনের বারান্দায় মিরসরাই থেকে আসা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, খুনের মামলায় হাজিরা দিতে ভোরে এসেছেন। পেশকার জানিয়েছেন, তাঁর মামলার শুনানি দুপুরের পর হবে। সকালে অন্য বিচারক বসবেন। তিনি নামার পর বিকেলে আরেকজন বিচারক একই এজলাসে উঠবেন। সারাদিন বারান্দায় অপেক্ষা করেই সময় কাটাতে হচ্ছে।
বিচারক বাড়লেও অবকাঠামো না বাড়ায় চট্টগ্রামের আদালতপাড়ায় চাপ বাড়ছে। দ্রুত সমাধান না হলে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে।

