দেশে ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা এখন প্রায় আড়াই লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসব মামলায় ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা আটকে আছে। তবে মামলা করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছে না প্রতিষ্ঠানগুলো। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ও নানা আইনি জটিলতার কারণে অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।
গত বছরের প্রথম ৯ মাসে নতুন করে ২৫ হাজার ৫৮২টি মামলা বিচারাধীন হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে ঋণ খেলাপিদের মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯২৩টিতে।
আইনি জটিলতায় আটকে ঋণ আদায়
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, অনেক ঋণ খেলাপি অর্থঋণ আদালতে মামলা হওয়ার পর উচ্চ আদালতে রিট দাখিল করে স্থগিতাদেশ পান। এতে দীর্ঘদিন মামলা কার্যক্রম স্থগিত থাকে এবং ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া থমকে যায়। আইনি ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে খেলাপিরা বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ করছেন। এর ফলে আর্থিক খাতে ঝুঁকি বাড়ছে এবং ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের অর্থ আটকে থাকছে।
রিটের আগে টাকা জমার প্রস্তাব
এই পরিস্থিতিতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ উচ্চ আদালতে রিট দাখিলের আগে ঋণের একটি অংশ জমা দেওয়ার বিধান চালুর দাবি করেছে। জনতা ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুজিবুর রহমান বলেন, “ছোটখাটো ঋণ অনেক সময় আদায় করা সম্ভব হলেও বড় অঙ্কের ঋণ ফেরত পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। রিট দাখিলের আগে যদি একটি নির্দিষ্ট শতাংশ টাকা জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে, খেলাপিরা দ্রুত সমঝোতায় আসতে বাধ্য হবে।”
বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনায় আরও শক্ত অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন বলেন, “শুধু মামলা দায়ের করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। মামলাটি নিয়মমাফিক পরিচালনা করতে হবে, দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ দিতে হবে এবং দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা করতে হবে। কজ লিস্টে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত শুনানি হলে নিষ্পত্তির গতি বাড়বে।”
আইনজীবীরা বলছেন, মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে আদালত নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মাহসিব হোসাইন বলেন, “অনেক সময় ঋণ নেওয়ার ঠিকানায় খেলাপিদের খুঁজে পাওয়া যায় না। তারা মনে করেন মামলা হলে আরও কয়েক বছর সময় পাওয়া যাবে। এ সুযোগে তারা সময়ক্ষেপণ করে, ফলে ব্যাংকগুলো মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। অর্থঋণ আদালত যদি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে এবং অতিরিক্ত সময় না দেয়, তাহলে এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব।”
বর্তমানে ঋণ খেলাপিদের মামলাগুলোতে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা আটকে রয়েছে। দ্রুত নিষ্পত্তি এবং আইনি প্রক্রিয়া সহজ করা না গেলে ভবিষ্যতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

