যিনি একসময় ঠিক করতেন কে জেলে যাবে আর কে বাইরে থাকবে, আজ ভাগ্যের পরিহাসে সেই লৌহমানব নিজেই এখন শ্রীঘরে।
২০০৭ সালের আলোচিত ‘ওয়ান-ইলেভেন’ বা ১/১১-এর অন্যতম প্রধান কারিগর, সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে সোমবার গভীর রাতে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটল এক লম্বা ও বিতর্কিত অধ্যায়ের।
১/১১-এর ‘অঘোষিত রাজা’ ও দুর্নীতির রাজত্ব
২০০৭ সালে ফখরুদ্দীন আহমদের সেনা-সমর্থিত সরকারের সময় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন সাভারের জিওসি। কিন্তু তার ক্ষমতা ছিল যেকোনো মন্ত্রীর চেয়েও বেশি। গুরুতর অপরাধ ও ‘দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র প্রধান হয়ে তিনি তখন রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের ওপর যে দমন-পীড়ন চালিয়েছিলেন, তা মানুষ আজও ভোলেনি।
-
শুদ্ধি অভিযানের নামে জুলুম: দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধের নাম করে তিনি তখন অসংখ্য মানুষকে হয়রানি করেছেন বলে অভিযোগ আছে। বড় বড় ব্যবসায়ী ও নেতাদের ধরে এনে ভয়ভীতি দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আদায়ের পেছনে তার হাত ছিল বলে বিভিন্ন সময় খবর বেরিয়েছে।
-
চাঁদাবাজির অভিযোগ: সেই আমলে অনেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে জোর করে চেক লিখে নেওয়া এবং দেশ ছাড়তে বাধ্য করার পেছনে তার নাম বারবার এসেছে। মানুষের কাছে নিজেকে ‘পরিচ্ছন্ন’ দেখালেও পর্দার আড়ালে তিনি নিজের জন্য এক বিশাল অর্থের পাহাড় গড়েছিলেন।
ভোল পাল্টানোর জাদুকর: ক্ষমতার সাথে সখ্য
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সবচেয়ে বড় গুণ ছিল সময় ও ক্ষমতা সাথে নিজেকে বদলে ফেলা। ১/১১-এর সময় দাপট দেখালেও- পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সাথেও তিনি চমৎকার সম্পর্ক বজায় রাখতে নিজের খোলসও পরিবর্তন করেছিলেন।
-
পুরস্কার হিসেবে বিদেশ যাপন: ২০০৮ সালে সরকার বদলের পর তাকে কৌশলে অস্ট্রেলিয়ায় রাষ্ট্রদূত (হাইকমিশনার) করে পাঠানো হয়। আওয়ামী লীগ সরকার তিন তিনবার তার চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে তাকে বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল।
-
রাজনীতিতে ভোলবদল: ২০১৮ সালে তিনি প্রথমে আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন, সেখানে সুযোগ না পেয়ে রাতারাতি জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে সংসদ সদস্য হন। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তিনি একই কৌশলে জয়ী হন। ফেনী-৩ এলাকায় তার ক্যাডার বাহিনীর দাপট ও সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতনের কাহিনী এখন সবার মুখে মুখে।
বিচারের মুখোমুখি ‘কিং মেকার’
ডিবির তথ্য অনুযায়ী, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৫টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে হত্যা, মানবপাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধভাবে সম্পদ গড়ার মতো গুরুতর অভিযোগ আছে। গত ১৫-১৬ বছরে তিনি যে পরিমাণ অর্থবিত্ত বানিয়েছেন এবং ঢাকার দামি রেস্তোরাঁসহ যেসব ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন, এখন সেসবের তদন্ত শুরু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেপ্তার হওয়া এটা প্রমাণ করে যে, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে চিরকাল পার পাওয়া যায় না। একসময় যারা অন্যদের জেলে পাঠাতেন, আজ তাদেরও একই পথ দিয়ে যেতে হচ্ছে।
পরিশেষে, যে হাতকড়া আর কারাগারের ভয় তিনি অন্যদের দেখাতেন, আজ সেই ভাগ্য তার নিজের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। ১/১১-এর সেই প্রবল ক্ষমতাধর জেনারেল আজ পুলিশের ভ্যানে একজন সাধারণ আসামির মতো বসে আছেন। ইতিহাস আবারো প্রমাণ করল—অন্যায় আর জুলুম করে কেউ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে না।

