ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে পুলিশ নিয়োগ! শোনার পর অবিশ্বাস্য মনে হলেও, বাস্তবে এমন ঘটনা ঘটেছে। শুধু দু-একজন নয়, শত শত ব্যক্তি এই জালিয়াতির শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে গোপালগঞ্জসহ ছয়টি জেলার ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের জেলা কোটায় নিয়োগ দিতে এই অনৈতিক পথ অবলম্বন করা হয়েছে। এই ছয় জেলা হলো: গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, বাগেরহাট ও খুলনা।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে তৎকালীন ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই অপকর্মে। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৭ বছরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন এবং সরকারের শেষ দিন পর্যন্ত ডিএমপি কমিশনার ছিলেন।
সূত্র জানিয়েছে, এই জেলার প্রার্থীদের পুলিশে ঢোকানোর জন্য ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি কিনে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রে স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করা হয়েছিল। চাকরি পাওয়ার পর অনেকে জমি বিক্রি করে অর্থ গ্রহণ করেন। তবে দলীয় প্রাপ্যতা বিবেচনায় নিয়োগ হলেও, এতে বড় ধরনের নিয়োগ বাণিজ্যও চলে। ফলে গোপালগঞ্জের এসপি হাবিবসহ পুলিশের একটি সিন্ডিকেট রাতারাতি অর্থবৃত্তে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
সরকার এ ধরনের জালিয়াতি চিহ্নিত করতে নড়েচড়ে বসেছে। ১৫ মার্চ পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সব জেলার পুলিশ সুপারকে চিঠি দিয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এক মাসের মধ্যে বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে। চিঠিতে ছয়টি বিষয় অনুসন্ধানের জন্য বলা হয়েছে:
- ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে ভিন্ন জেলার প্রার্থীকে স্থায়ী নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে কি না।
- বিশেষ সুবিধা দিয়ে পৃথক কক্ষে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে কি না।
- প্রার্থী বা তার পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ বা অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে কি না।
- লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মধ্যে অস্বাভাবিকতা থাকছে কি না।
- প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে কি না।
- পরীক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট করা ও প্রতারকচক্রের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কতটা তৎপর ছিল।
এই অনুসন্ধান কার্যক্রমে ৬৪ জেলায় ৪ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে নেতৃত্বে রয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার। অপর সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন), জেলা গোয়েন্দা কর্মকর্তা (ডিআইও-১) এবং রিজার্ভ অফিসার।
একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ঢাকা জেলা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জে ভুয়া ঠিকানায় অনেক কনস্টেবল নিয়োগ পেয়েছেন। অভিযোগ এত বেশি ছিল যে, সব জেলায় কমিটি গঠন করা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, সবচেয়ে বেশি কনস্টেবল নিয়োগ করেছেন হাবিবুর রহমান। ২০১২ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত তিনি ঢাকার এসপি এবং পরবর্তীতে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজিও ছিলেন। এরপর পুলিশ হেডকোয়ার্টারে গুরুত্বপূর্ণ পদও অধিকার করেন এবং সর্বশেষ অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে ডিএমপি কমিশনার পদে আসীন হন।
গোপালগঞ্জের প্রভাবশালী এই পুলিশ কর্মকর্তা শেখ হাসিনার আস্থা ভিত্তিক নিজস্ব বলয় তৈরি করেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বলয়টির নেতৃত্বে ছিলেন। এ কারণে পুলিশের সিনিয়ররাও তার কাছে কোনো বাধ্যতা অনুভব করতেন না। খোদ গোপালগঞ্জের তিন পুলিশ কর্মকর্তা তিনটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিতেন। অন্য দুই গ্রুপের নেতা ছিলেন পুলিশের তৎকালীন আইজি বেনজীর আহমেদ ও এসবিপ্রধান মনিরুল ইসলাম।
এই ভয়াবহ জালিয়াতির মাধ্যমে ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) নিয়োগ শুরু হয় ২০১২ সালে। নিয়োগ পাওয়া কনস্টেবলদের অনেকে এখন পদোন্নতি পেয়ে এএসআই ও এসআই হয়েছেন এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় যারা দলীয় ক্যাডারের মতো ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে এভাবে নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যরা সামনের সারিতে ছিলেন।

