বিগত আওয়ামী লীগ আমলে সুশাসন প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুম, অপহরণ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড মানুষকে আতঙ্কিত করত। তখন নাগরিকরা ভয় পেত রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে।
আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। মানুষ এখন ভয় পাচ্ছে উন্মত্ত জনতাকে। আগের অপরাধ ছিল পরিকল্পিত ও কাঠামোগত, বর্তমানের অপরাধ বিশৃঙ্খল ও তাৎক্ষণিক। উভয় ক্ষেত্রেই নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা প্রায় বিলুপ্ত।
ভোট ও আইনের শাসন একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রাণ কিন্তু যখন কোনো অঞ্চলে আইন তার নিজস্ব কার্যকারিতা হারায় এবং বিচারব্যবস্থা কেবল শক্তিশালী ও প্রভাবশালীদের সুরক্ষা দেয়, তখন সেখানে জন্ম নেয় এক ভয়াবহ দানব—মব জাস্টিস বা গণবিচার।
সমাজবিজ্ঞানী গুস্তাভ লে বন (Gustave Le Bon) তার কালজয়ী গ্রন্থ The Crowd: A Study of the Popular Mind-এ দেখিয়েছেন, একটি উন্মত্ত ভিড় বা মবের নিজস্ব কোনো বিবেক বা মস্তিষ্ক থাকে না। সেখানে একক ব্যক্তির বিচারবোধ সামষ্টিক উন্মাদনায় বিলীন হয়ে যায়।
বাংলাদেশের সমকালীন প্রেক্ষাপটে এই মবিউক্রেসি বা উশৃঙ্খল জনতার শাসন আজ আইনের শাসনকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর আমরা এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করছি—একদিকে ফ্যাসিস্ট স্বৈরশাসনের অবসান ঘটেছে, অন্যদিকে রাজপথে আইনের শাসনের বদলে মব জাস্টিস এক নতুন মহামারি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি কেবল অপরাধের বিচার নয়। এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও সুশাসনের ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন। নাগরিকরা আর নিরাপদ বোধ করতে পারছে না।
মব জাস্টিস বা লিঞ্চিং (Lynching) শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও সবচেয়ে স্বীকৃত তথ্য অনুযায়ী, এটি এসেছে আমেরিকার গৃহযুদ্ধ পরবর্তী ভার্জিনিয়ার কর্নেল চার্লস লিঞ্চের নাম থেকে। তৎকালীন সময়ে নিয়মমাফিক বিচার ছাড়াই বিদ্রোহী বা অপরাধীদের তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার প্রথাটিকে লিঞ্চ ল (Lynch Law) বলা হত।
১৯শ শতাব্দীতে আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর যে নিষ্ঠুরতা চালিয়েছিল, তা লিঞ্চিং-এর ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায়। মধ্যযুগীয় ইউরোপের উইচ হান্ট বা ডাইনি শিকার থেকে শুরু করে, বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ায় গরু চোর বা ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা—সবই মূলত একই মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে।
যখন রাষ্ট্র নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি শিকড় গেড়ে বসে, তখন মানুষ আইন নিজের হাতে নেওয়ার প্ররোচনায় আসে। আধুনিক যুগে ভারত, পাকিস্তান এবং আফ্রিকার দেশগুলোতেও মব জাস্টিসের ভয়াবহতা দেখা যায়, যা ভঙ্গুর বিচারব্যবস্থারই প্রতিফলন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মব জাস্টিসের চরিত্র গত কয়েক দশকে পরিবর্তিত হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে শহরগুলোতে ছিনতাইকারী বা পকেটমার সন্দেহে গণপিটুনি ছিল বিচ্ছিন্ন ঘটনা কিন্তু ২০১১ সালে শবে বরাতের রাতে আমিনবাজারে ৬ ছাত্রকে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা দেশজুড়ে শোক ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। ২০১৯ সালে রাজধানীর বাড্ডায় তাসলিমা বেগম রেনুর মর্মান্তিক মৃত্যু দেখিয়েছে কীভাবে একটি গুজব মুহূর্তে মানুষকে খুনিতে পরিণত করতে পারে। তবে ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। মব জাস্টিস এখন কেবল সাধারণ অপরাধের তাৎক্ষণিক বিচার নয়। এটি রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক শুদ্ধি অভিযানের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডার্কহেইমের অ্যানোমি (Anomie) তত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা করা যায়। ডার্কহেইমের মতে, কোনো সমাজে বড় রাজনৈতিক বা সামাজিক বিপ্লব ঘটে এবং পুরনো মূল্যবোধ ও আইনের কঠোরতা শিথিল হয়ে যায়, কিন্তু সমমানের শক্তিশালী নতুন আইনি কাঠামো বা নৈতিক মানদণ্ড তৈরি না হলে সেই সমাজে নিয়মহীনতা বা ‘অ্যানোমি’ জন্মায়।
৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা সেই ‘অ্যানোমিক’ দশা প্রত্যক্ষ করছি। একদিকে বিগত সরকারের ফ্যাসিস্ট কাঠামোর পতন, অন্যদিকে প্রশাসনের দুর্বলতা—এই দুইয়ের মাঝে সাধারণ নাগরিকরা এক ধরণের ‘আইনি শূন্যতা’ অনুভব করছে। এই শূন্যতাই মানুষকে আইন নিজের হাতে নেওয়ার প্ররোচনা দিচ্ছে। যেখানে সামষ্টিক উন্মাদনা ব্যক্তিগত নৈতিকতাকে গ্রাস করছে।
মব জাস্টিসের আলোচনায় রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলাও একটি প্রধান দিক। ৫ আগস্টের আগে ও পরে বিটিআরসি ভবন, বিটিভি ভবন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও সেতু ভবনের মতো স্থাপনায় নজিরবিহীন হামলা ও অগ্নিসংযোগ দেখা গেছে। বিশেষ করে বিটিআরসি ভবনে হামলার ফলে দেশের ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছিল।
এই হামলার ঘটনায় পরবর্তীতে ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে এটি প্রমাণ করে, যখন মব বা উন্মত্ত ভিড় ক্ষিপ্ত হয়, রাষ্ট্র তার অবকাঠামো রক্ষা করতেও হিমশিম খায়। রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলা হলো প্রতিষ্ঠানকে আঘাত, আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক মব জাস্টিস হলো মানুষের জীবনকে আঘাত। উভয়ই নির্দেশ করে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি।
গবেষণার ভাষায় মব জাস্টিসের পেছনে তিনটি প্রধান মনস্তাত্ত্বিক কারণ কাজ করে:
- প্রথমত, বেনামি (Anonymity)—ভিড়ের মধ্যে ব্যক্তির আলাদা পরিচয় থাকে না, ফলে সে মনে করে তার একার ওপর কোনো দায় নেই।
- দ্বিতীয়ত, দায়িত্বের বিভাজন (Diffusion of Responsibility)—মানুষ মনে করে, ‘আমি একা তো মারছি না, সবাই মারছে’। এতে অপরাধবোধ কমে যায়।
- তৃতীয়ত, তৎক্ষণিক বিচার (Instant Gratification)—দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর অনাস্থা থেকে মানুষ তাৎক্ষণিক শাস্তি দেখতে চায়। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভবঘুরে তোফাজ্জলকে ভাত খাইয়ে পেটানো বা খাগড়াছড়িতে শিক্ষক সোহেল রানাকে স্কুলের ভেতরে হত্যা করা—সবই এই বিকৃত মনস্তাত্ত্বিক তৃপ্তির প্রকাশ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনের মান নির্ধারণকারী সংস্থা ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট -এর রুল অব ল ইনডেক্স অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিগত কয়েক বছর ধরে নিম্নগামী অবস্থানে আছে। বিশেষ করে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা এবং ফৌজদারি বিচার সূচকে আমাদের স্কোর আশঙ্কাজনক। মব জাস্টিসের এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ বা লিমিটেড অ্যাক্সেস অর্ডার হিসেবে চিহ্নিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডগলাস নর্থের মতে, যখন কোনো রাষ্ট্রে ক্ষমতার উৎস কেবল শক্তির প্রকাশ হয় এবং আইনের সুশৃঙ্খল প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়, তখন সেই রাষ্ট্র টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না। বিশেষ করে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক নজর বাংলাদেশের ওপর নিবদ্ধ। মব জাস্টিসের প্রতিটি ঘটনা আমাদের গ্লোবাল র্যাঙ্কিং-এ এক একটি নেতিবাচক নম্বর যোগ করছে।
বাংলাদেশে মব জাস্টিস দমনে কোনো বিশেষায়িত আইন নেই। বর্তমানে এসব ঘটনা বিচার হয় ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ১৪১ থেকে ১৪৯ ধারা অনুযায়ী বেআইনি সমাবেশ হিসেবে এবং ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা হিসেবে। কিন্তু এই প্রাচীন আইন দিয়ে আজকের সংগঠিত ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর মব জাস্টিস মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বেশিরভাগ ঘটনায় মামলার এজাহারে অজ্ঞাতনামা ৫০০ বা ১ হাজার জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এতে মূল অপরাধীরা সহজেই আড়ালে থেকে যায়। রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলার ঘটনায়, বিশেষ করে বিটিআরসি ভবনে হামলার মামলায় কিছু অগ্রগতি দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের গণপিটুনির ঘটনাগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে থেমে যায়।
মব জাস্টিস রোধে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার পেছনে প্রশাসনিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ বড় ভূমিকা রাখছে। ৫ আগস্টের পর পুলিশ বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়েছে। জনরোষের ভয়ে অনেক ক্ষেত্রে তারা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সাহস পাচ্ছে না। কোথাও মব হামলা হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক সময় মনস্তাত্ত্বিক পঙ্গুত্বে ভোগে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ডের শিথিলতা এবং অপরাধীদের বিপ্লবী বা ছাত্র পরিচয়ে পার পাওয়ার প্রবণতা। ফলে রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। রাষ্ট্র যখন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, তখন সমাজ নৈরাজ্যের দিকে এগিয়ে যায়। সুশাসনের অভাব মানেই মব জাস্টিসের বিস্তার।
বিগত আওয়ামী লীগ আমলে সুশাসন প্রশ্নবিদ্ধ ছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুম, অপহরণ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কারণে। তখন মানুষ ভয় পেত রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে। এখন মানুষ ভয় পাচ্ছে উন্মত্ত জনতাকে। আগের অপরাধ ছিল পরিকল্পিত ও কাঠামোগত। বর্তমানের অপরাধ বিশৃঙ্খল ও তাৎক্ষণিক। উভয় ক্ষেত্রেই নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা আজ প্রায় বিলুপ্ত।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্রকে কার্যকর হতে হলে তাকে দমনমূলক যেমন হওয়া চলে না, তেমনি নিষ্ক্রিয় থাকাও আত্মঘাতী। ভারসাম্যপূর্ণ ও দৃঢ় রাষ্ট্রীয় ভূমিকা ছাড়া এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়।
মব জাস্টিস দমনে রাষ্ট্রকে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, একটি বিশেষ মব জাস্টিস প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তোফাজ্জল বা সোহেল রানা হত্যার মতো ঘটনাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ৯০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। তৃতীয়ত, বিটিআরসি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গুজব শনাক্তে রিয়েল-টাইম মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। চতুর্থত, পুলিশ বাহিনীর সংস্কার করে তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনতে হবে এবং মব দমনে নিষ্ক্রিয়তাকে কর্তব্যে অবহেলা হিসেবে গণ্য করতে হবে। পঞ্চমত, প্রতিটি এলাকায় ছাত্র, শিক্ষক ও ধর্মীয় নেতাদের যুক্ত করে সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

