দশ মাস আগে সুলতানা পারভীনের জীবনে এসেছিল আনন্দের নতুন সকাল। লালমনিরহাটের আদিতমারীর সাধারণ পরিবারের এই মেয়েটি বিয়ে করেছিলেন জাপান প্রবাসী এক যুবককে। স্বপ্ন ছিল কয়েক মাস পর স্বামীর সঙ্গে দেখা হবে। নতুন দেশে গিয়ে শুরু হবে নতুন সংসার।
বিয়ে ঘিরে পরিবার, বন্ধু ও প্রতিবেশীদের চোখেমুখেও ছিল আনন্দ। সুলতানার চোখে তখন ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন। কিন্তু সেই আলো বেশিদিন টেকেনি। হঠাৎ করেই তার জীবন নেমে আসে গভীর অন্ধকারে।
সুলতানার জীবনের এই বিপর্যয়ের পেছনে ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি একটি ভুয়া ভিডিও। প্রযুক্তির অপব্যবহারে তৈরি ওই ভিডিও মুহূর্তেই বদলে দেয় তার জীবন। সমাজের সন্দেহ, অবিশ্বাস আর মানহানির ভয় তাকে একা করে তোলে। একের পর এক চাপ ভেঙে দেয় তার মানসিক শক্তি। তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করেছিলেন। তবে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিভ্রান্তির সামনে শেষ পর্যন্ত তিনি টিকতে পারেননি। গত বছরের ৬ এপ্রিল বাবার বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। পরিবার জানায়, দীর্ঘ মানসিক চাপে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন।
পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একটি ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে সুলতানার স্বামীর পর্তুগাল প্রবাসী বোন জামাই মৃদুল আপত্তিকর ভিডিওটি ছড়িয়ে দেন। ভিডিওটি প্রথমে সুলতানাকে, পরে তার স্বামী অনিককে পাঠানো হয়। এতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি শুরু হয়। একপর্যায়ে অনিক যোগাযোগ বন্ধ করে দেন এবং বিচ্ছেদের কথাও বলেন। পরে তদন্তে জানা যায়, ভিডিওটি ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া এবং এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি।
এ ধরনের ঘটনার শিকার শুধু সুলতানা নন। ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নীলা (ছদ্মনাম) একদিন সকালে অচেনা নম্বর থেকে একটি বার্তা পান—‘তোমার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।’ লিংকে ক্লিক করে তিনি দেখেন, একটি পর্নোগ্রাফিক ভিডিওতে অন্য এক নারীর দেহের সঙ্গে তার মুখ জুড়ে দেওয়া হয়েছে। পরে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি ডিপফেক প্রযুক্তিতে তৈরি। নীলা বলেন, তাকে নিয়ে চারপাশে আলোচনা শুরু হয়। অথচ তিনি কিছুই জানতেন না। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন উপকার বয়ে আনছে, তেমনি অপব্যবহারও বাড়ছে। সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তি, অপতথ্য ও গুজব ছড়াতে ডিপফেক এখন বড় হাতিয়ার। এসব ভিডিওতে মুখভঙ্গি ও কণ্ঠস্বর এতটাই নিখুঁতভাবে বসানো হয় যে অনেকেই সত্য-মিথ্যা বুঝতে পারেন না। গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন সহিংসতার প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন না। আইনি সহায়তার অভাবে অভিযোগ করেন না ২৫ শতাংশ। হয়রানির ভয়ে ২৩ শতাংশ এবং সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কায় ১৭ শতাংশ অভিযোগ এড়িয়ে যান।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিপফেক হলো এআইভিত্তিক একটি কৌশল, যেখানে ডিপ লার্নিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে কারও মুখ, কণ্ঠ বা অঙ্গভঙ্গি অন্য ভিডিওর সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়। এখন মাত্র কয়েকটি সাধারণ মোবাইল অ্যাপ দিয়েই এ কাজ করা সম্ভব। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে যেখানে ডিপফেক তৈরি করতে বড় কম্পিউটার ও দক্ষ প্রোগ্রামার লাগত, এখন সেখানে একজন সাধারণ ব্যবহারকারীও ফ্রি অ্যাপ দিয়ে এক ঘণ্টার মধ্যে ভুয়া ভিডিও বানাতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন নারীরা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, সাইবার অপরাধ দমন ইউনিট ডিপফেক অপরাধে নজরদারি বাড়িয়েছে। অপরাধী শনাক্তে ডিজিটাল ফরেনসিক ও বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনে তদন্ত কঠিন হয়ে উঠছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, শক্ত আইন, সামাজিক সচেতনতা এবং প্রযুক্তি শিক্ষার অভাব এই অপরাধ বাড়াচ্ছে। তারা নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা ও মানসিক সহায়তা সেবার ওপর জোর দিচ্ছেন।
পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের (পিসিএসডব্লিউ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তারা ৯ হাজার ১১৭টি হয়রানির অভিযোগ পেয়েছে। জানুয়ারিতে ৭১৫, ফেব্রুয়ারিতে ৬৫৩, মার্চে ৭২৩, এপ্রিলে ৭৩০, মে মাসে ৭৭৩, জুনে ৮৪২, জুলাইয়ে ৭১০, আগস্টে ৬৩০, সেপ্টেম্বরে ৯৭৯, অক্টোবরে ৮৮১, নভেম্বরে ৭১৪ এবং ডিসেম্বরে ৭৬৭টি অভিযোগ আসে।
রিউমর স্ক্যানারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে আন্দোলনে অংশ নেওয়া নারী অ্যাক্টিভিস্টদের অন্তত আটজনকে জড়িয়ে ৩২টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ফারজানা সিথিকে ঘিরে ছড়ানো ভুয়া ভিডিওর সংখ্যা ১৫টি। পিসিএসডব্লিউ জানায়, ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা মোট ৪২ হাজার ৬৪২টি অভিযোগ পেয়েছে। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ অভিযোগকারী পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে বা আইনগত পদক্ষেপ নিতে আগ্রহ দেখাননি।
ডিপফেক হয়রানির বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে ঝিনাইদহ ও টাঙ্গাইলের ঘটনাতেও। গত বছরের নভেম্বরে ঝিনাইদহে এক কলেজছাত্রী ইনস্টাগ্রামে বন্ধুত্বের অনুরোধ পেয়ে প্রতারণার শিকার হন। তার ছবি ব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও বানিয়ে হয়রানি করা হয়। এছাড়া গত বছরের ৮ জানুয়ারি থেকে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলায় ৮ স্কুলছাত্রীসহ ১৩ জনের ছবি দিয়ে ভুয়া পর্নো ভিডিও তৈরি করে অর্থ দাবি করা হয়। এক ভুক্তভোগীর পরিবার জানায়, টাকা না পেয়ে পরে ভিডিওগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয়। দুটি ঘটনায় ভুক্তভোগীরা থানা ও পিসিএসডব্লিউতে অভিযোগ করেন। তদন্তে প্রথম ঘটনায় প্রতিবেশী এক তরুণ এবং দ্বিতীয় ঘটনায় এক কিশোরী সহপাঠীকে অভিযুক্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়। পরে পুলিশ তাদের আটক করে।
অপরাধীরা কারা:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডিপফেক ভিডিও তৈরির একটি বড় অংশই পরিচালিত হচ্ছে বিদেশে হোস্ট করা ওয়েবসাইট এবং এনক্রিপ্টেড টেলিগ্রাম গ্রুপ থেকে। এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে ভুয়া ছবি ও ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে। প্রতিশোধ, সাবেক প্রেমিক বা সম্পর্ক ভাঙার জের, আবার অনেক ক্ষেত্রে সাইবার চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যেই এই প্রযুক্তির অপব্যবহার করা হচ্ছে। সাইবার ক্রাইম তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, অপরাধীরা ভিপিএন ব্যবহার করে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখছে। এতে দেশের ভেতরে তদন্ত জটিল হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন হচ্ছে।
‘সাইবার সহিংসতার শিকার নারীদের মনো-সামাজিক পরিবর্তন এবং বাংলাদেশে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মূল্যায়ন’ শীর্ষক এক পিএইচডি গবেষণায় দেখা যায়, সাবেক প্রেমিকের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি সাইবার সহিংসতার শিকার হয়েছেন নারীরা। এ হার প্রায় ৩৩ শতাংশ। অনলাইন বন্ধুর মাধ্যমে ২০ শতাংশ, অপরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে ১৬ শতাংশ, সাবেক স্বামীর মাধ্যমে ১২ শতাংশ, বন্ধুর মাধ্যমে ৮ শতাংশ, সহকর্মী ও সহপাঠীর মাধ্যমে ৬ শতাংশ এবং স্বজনদের মাধ্যমে ৪ শতাংশ নারী সাইবার সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
গবেষণায় আরও বলা হয়, ভুক্তভোগীদের প্রায় ৯০ শতাংশই শহরের বাসিন্দা। তাদের মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশ শিক্ষার্থী। সরকারি চাকরিজীবী প্রায় ২৯ শতাংশ। বেসরকারি চাকরিজীবী ২০ শতাংশ এবং গৃহিণী ১২ শতাংশ। অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, এআই ব্যবহার করে ভুয়া ছবি ও ভিডিও বানিয়ে ব্ল্যাকমেইল এবং যৌন হয়রানির ঘটনা বাড়ছে। এ ধরনের অপরাধ শুধু নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে পুরুষরাও এর শিকার হচ্ছেন।
এই গবেষণার সময়কাল ছিল ২০২১ ও ২০২২ সাল। এটি প্রকাশিত হয় গত বছরের নভেম্বরে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুকের তত্ত্বাবধানে গবেষণাটি পরিচালনা করেন একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রোকসানা সিদ্দীকা।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, অনলাইন সহিংসতার প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটনায় কোনো অভিযোগ করা হয় না। আইনি সহায়তার অভাবে অভিযোগ করেন না ২৫ শতাংশ ভুক্তভোগী। হয়রানির ভয়ে অভিযোগ করেন না ২৩ শতাংশ। সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কায় অভিযোগ এড়িয়ে যান ১৭ শতাংশ।
বিচার ব্যবস্থার চিত্র বিশ্লেষণে পুলিশের কাছে নথিভুক্ত ১ হাজার ১৮৯টি মামলার মধ্য থেকে ১৪৭টি মামলা পর্যালোচনায় নেওয়া হয়। এছাড়া ২০১৩ সালের ২৮ জুলাই থেকে ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের ৫২০টি মামলা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর মধ্যে ৩২৮টি মামলা ঝরে গেছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ১৪৭ জন ভুক্তভোগীর মধ্যে ৬১ শতাংশ জানান, তারা সাধারণ ডায়েরি বা মামলা করেছিলেন। তাদের মধ্যে ৬২ শতাংশ বলেন, মামলার পর অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ৬৭ শতাংশ ভুক্তভোগী জানান, তদন্তের জটিলতা, প্রমাণ সংগ্রহের দুর্বলতা এবং কার্যকর বিচারপ্রক্রিয়ার অভাবে শেষ পর্যন্ত অপরাধীদের সাজা হয়নি।
ভুক্তভোগীদের নীরবতা:
অনেক নারী এ ধরনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা গোপন রাখেন। সামাজিক অপমানের ভয়ে তারা নিস্তব্ধ হয়ে পড়েন। ভুক্তভোগী নীলা বলেন, ‘আমি পুলিশের কাছে যাইনি। সবাই যদি মনে করে এটা সত্যি, তখন আমি বাঁচবো কেমন করে?’
রিউমর স্ক্যানার বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট চেকিং নেটওয়ার্ক স্বীকৃত একটি তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান। তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে শনাক্ত হওয়া গুজবের অন্তত ২১ শতাংশ নারীকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়েছে। এ সময়ে অন্তত ২৭৬ জন নারীকে জড়িয়ে ৫৬৭টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এসব অপতথ্যের শিকার হয়েছেন রাজনীতি, বিনোদন, জাতীয়সহ বিভিন্ন অঙ্গনের পরিচিত ব্যক্তিরা। এছাড়া সাধারণ নারীরাও নিয়মিত এ ধরনের অপতথ্যের শিকার হচ্ছেন।
নারী অ্যাক্টিভিস্টদের ওপর ক্রমাগত অপপ্রচার:
রিউমর স্ক্যানারের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বিশেষভাবে আলোচিত ছিল। কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতনের সময় নেতৃত্বে থাকা এই সংগঠনকে জড়িয়ে পরবর্তীতে নিয়মিত ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে।
এ আন্দোলনে অংশ নেওয়া নারী অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে অন্তত আটজনকে জড়িয়ে চলতি বছরে ৩২টি অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জুলাই আন্দোলনকারী ফারজানা সিথিকে ঘিরে ছড়ানো হয়েছে ১৫টি ভুয়া ভিডিও। এগুলোর একটি ছাড়া বাকিগুলো এআই ও ডিপফেক পদ্ধতিতে তৈরি ভিডিও ফুটেজ।
প্ল্যাটফর্মটির সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক উমামা ফাতেমাকে জড়িয়ে অন্তত সাতটি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। এছাড়া নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও জুলাই আন্দোলনকারী নাফসিন মেহনাজকে জড়িয়ে পাঁচটি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে তিনটিতে তার আপত্তিকর দৃশ্যের ছবি ছিল। এর বাইরে সামিয়া মাসুদ মম, তিলোত্তমা ইতি, সাবরিনা আফরোজ সেবন্তি, এথিনা তাবাসসুম মীম ও আনিকা তাসনিমকে জড়িয়ে একটি করে অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের আরও সতর্ক থাকার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। তারা বলেছেন, জুয়ার নির্মিত এআই জেনারেটেড ডিপফেক ভিডিও দ্বারা প্রতারিত না হওয়া জরুরি।
আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, “এআই দিয়ে বর্তমান সরকারের উপদেষ্টাদেরও ছবি-ভিডিও বিকৃত করে ছোড়া হচ্ছে। কিন্তু এ ধরনের ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।”
প্রেস উইং-এর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলাদেশি ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে জুয়ার বিজ্ঞাপন নতুন নয়। তবে সম্প্রতি এটি বিরক্তিকর মোড় নিয়েছে। জুয়াড়িরা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে ভুয়া সংবাদ প্রতিবেদন ও ডিপফেক ভিডিও ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করছে।
অশ্লীল বার্তা পাঠালে আইন অনুযায়ী শাস্তি:
খসড়া “বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫”-এ মোবাইল ফোনে অশ্লীল, আপত্তিকর বা অশোভন বার্তা পাঠালে দুই বছরের কারাদণ্ড বা দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। কাউকে বারবার বিরক্ত করলেও এক লাখ টাকা জরিমানা বা ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
গত বছরের ৬ নভেম্বর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এই অধ্যাদেশের খসড়া প্রকাশ করেছে। ধারা ৬৯ অনুযায়ী, টেলিযোগাযোগ বা বেতার যন্ত্রের মাধ্যমে অশ্লীল, ভীতিকর, অপমানজনক বা অশোভন বার্তা, ছবি বা ভিডিও পাঠালে দুই বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ দেড় কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হবে। গুরুতর অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
পুলিশের ব্যবস্থা ও ভুক্তভোগীদের সতর্কবার্তা:
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, “ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার এবং সিটিটিসির সাইবার ইউনিট রয়েছে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ দিলেই তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কেউ স্বাচ্ছন্দ্যে অভিযোগ করতে পারেন। পুলিশ কঠোর অবস্থানে আছে।”
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া ও পিআর) এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, “সাইবার জগতে কেউ হয়রানির শিকার হলে অবশ্যই পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে হবে। অভিযোগ না দিলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়।” তিনি আরও জানান, “যদি থানায় অভিযোগ দিতে না চান, তবে পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (পিসিএসডব্লিউ)-তে অভিযোগ করতে পারেন। এখানে ভুক্তভোগী নারীদের জন্য নারী পুলিশ সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্বে রয়েছেন।”
অপরাধ বিশ্লেষক ও টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, “প্রযুক্তির অপব্যবহার সমাজের সব স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তির ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।”
তিনি আরও বলেন, “এআই ব্যবহার করে ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করে ব্ল্যাকমেইল এবং যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। এই ধরনের অপরাধ শুধু নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে পুরুষরাও এর শিকার হচ্ছেন।”
অধ্যাপক ফারুক বলেন, “সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এআই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় কাউন্টার এআই বা প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এখনও পর্যাপ্ত নয়। ফলে এ ধরনের অপরাধ ক্রমেই বাড়ছে।”
তিনি পুলিশ সাইবার ইউনিটের কার্যক্রম সীমিত পরিসরে পরিচালিত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “এটি না হলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভুক্তভোগীর সংখ্যা আরও বাড়বে।” অধ্যাপক ফারুক আরও বলেন, “ভয় বা সামাজিক লজ্জার কারণে অনেক ভুক্তভোগী পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে যান না। অথচ এসব ঘটনায় যত দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে, অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কমানো তত সহজ হবে।”

