চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার হাজীর পাড়ার বাসিন্দা রাসেল আহমেদ। তার ঘর জরাজীর্ণ, তিনি রক্তশূন্যতায় ভুগছেন। অন্যের সাহায্য ছাড়া হাঁটাও কঠিন। চার বছর আগে এক ব্যক্তি সহায়তার আশ্বাস দিয়ে তাঁর জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) করান। কিন্তু আজও কোনো সাহায্য পাননি রাসেল।
অস্বাভাবিক হলেও সত্য, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) চট্টগ্রামের পাহাড়তলী শাখায় রাসেলের নামে ৯ কোটি ২৭ লাখ টাকার ঋণ তৈরি হয়েছে। রাসেল আহমেদকে ‘রাসেল এন্টারপ্রাইজের মালিক’ দেখিয়ে ২০২২ ও ২০২৩ সালে এই ঋণ নেওয়া হয়েছে। শয্যাশায়ী রাসেল বলেছেন, তিনি কখনো ব্যাংকে যাননি, কোনো ঋণের আবেদন করেননি, এমনকি কোনো ব্যাংক হিসাবও খুলেননি। রাসেলের মতো আরও ১০২ জন হতদরিদ্রের নামে চট্টগ্রামের পাঁচটি শাখা থেকে মোট ৯৬৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে আরামিট গ্রুপ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কর্মচারীকে ব্যবসায়ী দেখিয়ে একই ব্যাংকের ঢাকার কারওয়ান বাজার শাখা থেকে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছে। অর্থ প্রবাহের বিশ্লেষণ দেখিয়েছে, এই দুটি ঋণের মধ্যে যোগসাজশ রয়েছে। ইউসিবির এই সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ঋণের মূল সুবিধাভোগীর সঙ্গে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
১০২ দিনমজুর ও কৃষকের নামে কোটি কোটি ঋণ প্রতারণা:
চট্টগ্রামের ১০২ জন দিনমজুর, ভ্যানচালক ও কৃষকের নামে কোটি কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) চট্টগ্রামের পাঁচ শাখা থেকে মোট ৯৬৩ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। পটিয়া ছাড়াও কক্সবাজার ও বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকার ১৩ জন ঋণগ্রস্তের বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। সবার গল্প প্রায় একই। সাহায্য দেওয়ার নাম করে পরিচিত বা অপরিচিত কেউ তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংগ্রহ করেছে। এখন তাদের নামে ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকার ঋণের নোটিশ পৌঁছে যাচ্ছে। তবে তারা কারও কাছে ঋণ নেয়নি বা এর কোনো সুবিধা ভোগ করেননি।
কক্সবাজারের রামুর প্রত্যন্ত ঈদগড়ের পূর্ব রাজঘটে চাটাইয়ের বেড়ার দুটি ঘরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দিন কাটান মোহাম্মদ জহির উদ্দীন ও নুরুল ইসলাম। জহির ও তাঁর স্ত্রী উম্মে সালমাকে জহির ইন্টারন্যাশনালের মালিক দেখিয়ে ইউসিবি চকবাজার শাখা থেকে সাড়ে ৯ কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছে। দিনমজুর নুরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী মায়মুনাকে ইসলাম এন্টারপ্রাইজের মালিক দেখানো হয়। এ প্রতিষ্ঠানের নামে একই শাখা থেকে ১৭ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। ঋণের নোটিশ পৌঁছার পর পারিবারিক কলহ শুরু হয়। জহির ও স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন হয়। নুরুল ইসলামের স্ত্রী মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়েন। তাদের তিন সন্তান স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, কারণ সহপাঠীরা তাদের ‘কোটিপতির সন্তান’ বলে কটাক্ষ করেছে।
বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারীর বড় বিলের বাসিন্দা মিজানুর রহমানের পরিবার আরও করুণ পরিস্থিতির মুখোমুখি। পাহাড়ি সড়ক থেকে বনের ভেতর চার মিনিট হেঁটে তার একটি ছাপরা ঘর পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম বন্দর শাখায় তার নামে সাড়ে আট কোটি টাকার ঋণ থাকা জানতে পেরে ২০২৪ সালে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। স্ত্রী তসলিমা বেগম বলেন, তিন সন্তান নিয়ে কোনোমতে দিন পার করছেন। মৃত স্বামীর ঋণের চিন্তায় তিনি অস্থির।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইউসিবি চট্টগ্রামের চকবাজার শাখা থেকে ৫০ জন দিনমজুরের নামে ৪৪৯ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। পাহাড়তলী শাখা থেকে ২২ জনের নামে ১৯৫ কোটি, বন্দর শাখা থেকে ১৩ জনের নামে ১৬৬ কোটি এবং বহদ্দারহাট ও খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে ১৭ জনের নামে ১৫৩ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে।
ইউসিবির নথি অনুযায়ী, ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালে এসব ভুয়া ঋণ দেওয়া হয়। ওই সময়ে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের পরিবারের হাতে। মন্ত্রী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে না থাকলেও তাঁর স্ত্রী রুখমিলা জামান ছিলেন চেয়ারম্যান। দুই ভাই ও দুই বোন ছিলেন পরিচালক। আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) জাবেদ পরিবারের এই ঋণের মূল সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বিএফআইইউ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভুয়া অ্যাকাউন্টে ঋণের অর্থ উত্তোলন করে জাবেদ পরিবারের মালিকানাধীন আরামিট গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জমা করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অর্থ অন্যদের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত করে আবার জাবেদ পরিবারের বিভিন্ন হিসাবে নেওয়া হয়েছে। এসব ঋণ বারবার শাখা থেকে নবায়ন করা হয়েছে, তাই খেলাপি হয়নি।
বিএফআইইউ চট্টগ্রামের চকবাজার, পাহাড়তলী ও বন্দর শাখা পরিদর্শন করে তথ্য দুদকে দিয়েছে। কারওয়ান বাজার শাখার পরিদর্শন এখনও চলছে। কর্মকর্তারা বলেন, অনেক শাখায় ভুয়া প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে ঋণ নেওয়া হয়েছে। পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ঋণ অনুমোদনের সময় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন সদ্য হয়েছে, অভিজ্ঞতা নেই, নগদ লেনদেনের হিসাবও নেই। তবু ঋণ দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়নি, বরং ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে ঋণ সৃষ্টি করা হয়েছে। ঋণ নেওয়ার আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এই দিনমজুর, ভ্যানচালক ও কৃষকদের নেই। তাদের সঙ্গে কোনোভাবে ঋণের সম্পর্ক নেই। কেবল কাগুজে প্রতিষ্ঠান ও ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করে ব্যাংক থেকে টাকা তোলা হয়েছে।
কারওয়ান বাজার শাখায় ঋণ জালিয়াতি:
রাজধানীর কারওয়ান বাজার শাখা থেকে সবচেয়ে বেশি জালিয়াতি হয়েছে। তৎকালীন ব্যবস্থাপক শরীফ আবদুল্লাহ সরকার শাখা ত্যাগের পর দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়া চলে গেছেন। বর্তমানে শাখার নতুন ব্যবস্থাপক এই বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “এটি খুব স্পর্শকাতর ইস্যু। এসব নিয়ে সহকর্মীদের মধ্যেও আলোচনা হয় না। প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন।”
ইউসিবির চেয়ারম্যান শরীফ জহির, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামদুদুর রশীদ ও প্রধান যোগাযোগ কর্মকর্তা জীশান কিংশুক হককে লিখিতভাবে প্রশ্ন পাঠানো হয়। কয়েক দফা যোগাযোগে জীশান কিংশুক টেলিফোনে জানান, “দুদক মামলা করেছে এবং বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। তাই বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে জড়িতদের বিষয়ে ইউসিবির ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে।” দুদক ইতিমধ্যেই জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া ঋণ সৃষ্টি ও আত্মসাতের ঘটনায় একাধিক মামলা করেছে। অধিকাংশ মামলায় সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদ, তাঁর পরিবারের সদস্য ও ব্যাংকের কর্মকর্তাসহ মোট ৬৮ জনকে আসামি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ঋণ বিতরণের আগে বিভিন্ন নিয়ম-আচার মেনে চলা জরুরি। এই ক্ষেত্রে তা না করে দিনমজুরদের নামে কোটি কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “এটি স্রেফ জালিয়াতি। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যাংক থেকে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। একই সঙ্গে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের নামে এসব ঋণ দেখানোর ব্যবস্থা করা উচিত।”
দিনমজুরদের কল্পিত ঋণের ফাঁদ:
চট্টগ্রামের পটিয়া, রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ির ১৩ জন দরিদ্র মানুষের নামে ভুয়া ঋণ নেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকেরই অবস্থা নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো। অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংগ্রহ করেছেন রামুর ঈদগড়ের মোহাম্মদ আবুল কালাম। এক যুগ আগে তিনি পটিয়ার রিকশা চালাতেন। চার বছর আগে পটিয়া বাজারের প্রদীপ বিশ্বাসের গোডাউনে কাজ করতে গিয়ে পটিয়ার দরিদ্র মানুষের এনআইডি সংগ্রহ শুরু করেন। নাইক্ষ্যংছড়িতে নুরুল বশর, রামুতে দর্জি মিজানুর রহমান সাহায্য করেন। দুদক কয়েকটি মামলায় আবুল কালামকেও আসামি করেছে।
এনআইডি সংগ্রহে সহায়তা করা তিনজনের নামেও ইউসিবি বড় অঙ্কের ঋণ দিয়েছে। আবুল কালামকে জাহান ট্রেডিংয়ের মালিক দেখিয়ে পাহাড়তলী শাখা থেকে ঋণ ৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। নুরুল বশরকে বশর এন্টারপ্রাইজের মালিক সাজিয়ে চকবাজার শাখা থেকে ১৩ কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছে। মিজানুর রহমানকে ক্যাটস আই করপোরেশনের মালিক দেখিয়ে বন্দর শাখা থেকে ৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে।
আত্মগোপনে থাকা আবুল কালাম ২৯ নভেম্বর বলেন, “আমি বুঝতেই পারিনি, এনআইডি দিয়ে ঋণ নেওয়া হচ্ছে। সাহায্য ভেবে আত্মীয় ও দরিদ্রদের তালিকা দিয়েছি। এখন চরম বিপদে আছি।” তবে তিনি বলেন, কাদের হাতে এনআইডি দিয়েছেন তা বলবেন না। নুরুল বশর ও মিজানুর রহমানও জানান, সাহায্য করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে মানুষদের বিপদে ফেলেছেন।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে মোহাম্মদ জহির উদ্দীন, নূরুল ইসলাম, মিজানুর রহমান, রাজধন কর্মকার, ফরিদুল আলম, নুরুল বশর, মোহাম্মদ আয়ূব, মৃত মিজানুরের স্ত্রী তসলিমা বেগম, রাসেল আহমেদ, সফিকুল ইসলাম, মুহাম্মদ খান সাহেব ও কিশোর দাশ রয়েছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এনআইডি নেওয়ার দুই-তিন মাস পর পটিয়ার একটি টং দোকান বা হোটেলে বসিয়ে নীল ও সাদা কাগজে স্বাক্ষর করানো হয়। ফিরতি পথে বিভিন্নভাবে নগদ টাকা দেওয়া হয়, ranging ১২ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর অক্টোবর থেকে তাদের নামে ইউসিবি থেকে ঋণের নোটিশ আসে। তখন তারা জানতে পারেন, তাদের নামে প্রতিষ্ঠান খুলে ঋণ নেওয়া হয়েছে।
রাসেল আহমেদ জানান, “আমি একটা মরা মানুষ। দুই টাকা সাহায্য দিলে হাত পেতে নিই। ঋণ তো দূরে থাক, ব্যাংকে কখনো যাইনি। চার বছর আগে কালাম এনআইডি নিয়ে গিয়েছিলেন, সাহায্য দেওয়ার কথা বলে।”
সফিকুল ইসলাম জানান, “করোনার সময় সাহায্য দেওয়ার কথা বলে এনআইডি নিয়েছিল। পরে ১২ হাজার টাকা করে দুইবারে ২৪ হাজার টাকা দেওয়া হয়। ঋণ বিষয়ে কিছু জানতাম না।”
কিশোর দাশকে শাহচাঁদ আউলিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক সাজিয়ে স্টেশন রোড শাখা থেকে ৮ কোটি টাকার ঋণ করা হয়েছে। ঋণের নোটিশের পর তিনি বাড়ি আসেননি। তার বাবা জানান, পরিবারকে কিছু না জানিয়ে ছেলে নিরুদ্দেশ। এখন তিনি সৌদি আরবে রয়েছেন।
মুহাম্মদ খান সাহেব জানান, সাহায্যের কথা বলে পটিয়া বাজারে নিয়ে গিয়ে নীল ও সাদা কাগজে স্বাক্ষর করানো হয়। ফিরতি পথে ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। তাদের সঙ্গে আর্থিক সক্ষমতা বা ব্যবসায়িক কোনো সম্পর্ক নেই।
জাবেদের প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরাও ঋণের ফাঁদে:
জাবেদ পরিবারের মালিকানাধীন আরামিট গ্রুপের কর্মচারীরাও ভুয়া ঋণের ফাঁদে পড়েছেন। ইউসিবির কারওয়ান বাজার শাখা থেকে ২২টি প্রতিষ্ঠানের নামে অন্তত আড়াই হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠান প্রগ্রেসিভ ট্রেডিং। আরামিট সিমেন্টের এজিএম মোহাম্মদ হোসাইন চৌধুরীকে এই প্রতিষ্ঠানের মালিক দেখিয়ে ২৩ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। সুদসহ তা এখন ৪৮ কোটি ৭২ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। ব্যাংকের নথিতে প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা হিসেবে ঢাকার ৮০/২ নবাবপুর এবং চট্টগ্রামের চাক্তাইয়ের রাজাখালীর শেখ মোশাররফ হোসাইন রোডের ১৪৩২ নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। সরেজমিন এ দুটি হোল্ডিং নম্বর পাওয়া যায়নি।
প্রগ্রেসিভ ট্রেডিংয়ের খেলাপি ঋণ আদায়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার অর্থঋণ আদালতে ইউসিবি মামলা করেছে। নথি দেখা গেছে, ২০১৮ সালের ১৪ জুন ঋণ আবেদন আসে, কিন্তু ঋণ ছাড় হয় আবেদনের এক মাস আগে। ঋণের অর্থ সরাসরি জাবেদ পরিবারের তিনটি প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো– আরামিট ফুটওয়্যার, নর্থ ওয়েস্ট সিকিউরিটিজ এবং নাহার ম্যাটালস। ঋণ ছয় মাসের জন্য দেওয়া হলেও মেয়াদ বারবার বাড়ানো হয়।
মোহাম্মদ হোসাইন চৌধুরী ঢাকার অর্থঋণ আদালতে জানান, তিনি ১৮ বছর ধরে আরামিট গ্রুপের অ্যাকাউন্টস বিভাগে কাজ করছেন। প্রশাসন বিভাগের প্রধান সৈয়দ কামরুজ্জামানের নির্দেশনায় বিভিন্ন নথিতে সই করতেন। আদালত ঋণ অনুমোদনকারী পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের মামলায় বিবাদী করার নির্দেশ দেন।
আরামিট গ্রুপের জুনিয়র অফিসার মোহাম্মদ মিছবাহুল আলমকে মডেল ট্রেডিংয়ের মালিক সাজিয়ে কারওয়ান বাজার শাখা থেকে ২১ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। ইম্পেরিয়াল ট্রেডিং নামে আরেক প্রতিষ্ঠানের নামে ২৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। মালিক দেখানো হয়েছে আবদুল আজিজকে, যিনি আরামিট গ্রুপের এজিএম। এই শাখা থেকে আরও কয়েকজন কর্মচারীর নামে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
ঋণের টাকা দুবাইয়ে পাচার:
বিএফআইইউ চট্টগ্রামের চকবাজার, পাহাড়তলী ও বন্দর শাখার কয়েকটি ভুয়া ঋণের তথ্য যাচাই করেছে। অর্থের গতিপথ বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি ঋণের মূল সুবিধাভোগী হিসেবে জাবেদ পরিবারকে চিহ্নিত করেছে।
বিভিন্ন শাখায় দিনমজুরদের নামে ঋণ তৈরি হলেও নগদ অর্থ জাবেদ পরিবারের মালিকানাধীন আরামিট সিমেন্ট, আরামিট থাই অ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। অনেক সময় অর্থ জমা হয়েছে আদনান ইমামের নামে নিবন্ধিত এডব্লিউআর ডেভেলপমেন্ট ও এডব্লিউআর রিয়েল এস্টেটের কারওয়ান বাজার শাখায়। এছাড়া ইউসিবির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান বশির আহমেদের মালিকানাধীন আলোক ইন্টারন্যাশনাল, বিঅ্যান্ডবি ইলেকট্রনিক্স ও এয়ারমেট লাইটিং অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল সল্যুশনের অ্যাকাউন্টেও অর্থ গিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উত্তোলন করেছেন সুমন, জাফর, দিদারুল আলম চৌধুরী, বিভাস বোস, তাহিদুল করিম ও মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান।
বিএফআইইউ অনুসন্ধান জানিয়েছে, সৃষ্ট ঋণের টাকা ভুয়া এলসি খুলে দুবাইয়ে পাঠানো হয়েছে। অধিকাংশ এলসি করা হয়েছে দুবাইয়ে নিবন্ধিত প্যানমার্ক ইমপেক্স মেগা ট্রেডিং এলএলসির নামে। প্রতিষ্ঠানটি ইউসিবির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান বশির আহমেদের নামে নিবন্ধিত। এখান থেকে যেসব এলসির আবেদনকারী প্রতিষ্ঠান, তারা বাস্তবে অস্তিত্বহীন। বন্দর শাখায় ২০২০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ১৭টি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৫৬টি এলসি ইস্যু হয়। মূল্য ১৯ লাখ ২৮ হাজার ডলার। এর মধ্যে প্যানমার্ক ইমপেক্স মেগা ট্রেডিংয়ের নামে খোলা ৩৩টি এলসি, যা মোটের ৬৬ শতাংশের বেশি, মূল্য ১২ লাখ ৭৪ হাজার ডলার।
পাহাড়তলী শাখায় ২০২১ থেকে ২০২৩ সালে ১৭টি এলসি খোলা হয়। এর মধ্যে ১১টি জাহান ট্রেডিং, বাকি ৬টি নাজ ইন্টারন্যাশনাল নামে। জাহান ট্রেডিংয়ের নামে ঋণ ৯ কোটি ৬৫ লাখ, নাজ ইন্টারন্যাশনালের নামে ১১ কোটি ৪১ লাখ টাকা। ছয়টি এলসি প্যানমার্কের নামে। চকবাজার শাখায় ২০২১ ও ২০২২ সালে ৪ লাখ ২৮ হাজার ৩১০ ডলারের মূল্যের ১৫টি এলসি ইস্যু হয়। এর মধ্যে ৯টি এলসি প্যানমার্কের নামে, মূল্য ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৫৭৩ ডলার।
বিএফআইইউ বলেছে, বাণিজ্যের আড়ালে এই কৌশল অর্থ পাচারের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। সংস্থা অধিক তদন্তের সুপারিশ করে দুদকে প্রতিবেদন দিয়েছে। এলসি ইস্যু ও ঋণ দেওয়ার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে শাস্তি দেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের পরিবার দেশছাড়া। জাবেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। ইউসিবির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান বশির আহমেদও পলাতক। এছাড়া আদনান ইমাম, যিনি মানি লন্ডারিংয়ে ব্যবহৃত অ্যাকাউন্টের একজন, তিনিও পলাতক।
১০ ডিসেম্বর আদনান ইমামকে ইমেইল করা হলে তিনি বলেন, “সরকার পরিবর্তনের পর ইউসিবির নতুন পর্ষদ আমাকে ভুলভাবে টার্গেট করেছে। আমি সব অভিযোগ অস্বীকার করি। বিস্তারিত বক্তব্যের জন্য পাঁচ কর্মদিবস সময় চাই।” এরপরেও প্রায় এক মাসে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বিদেশে জাবেদ পরিবারের বিপুল সম্পদ:
সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দেশের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি বাংলাদেশ থেকে প্রথমে অর্থ সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঠান। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থা সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজ (সিফোরএডিএস) দুবাই ভূমি বিভাগের রেকর্ড ও কিছু ইউটিলিটি কোম্পানির তথ্য বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীর একটি তালিকা তৈরি করেছে।
২০২০ ও ২০২২ সালের তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের মে মাসে অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট (ওসিসিআরপি) ‘দুবাই আনলকড’ নামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে ৪৬১ বাংলাদেশির নামে দুবাইয়ে ৯২৯টি সম্পত্তির তথ্য উঠে আসে। বাংলাদেশিদের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৪২টি সম্পত্তি জাবেদ পরিবারের নামে রয়েছে।
২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে সিআইডি জানায়, ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে জাবেদ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪৮ কোটি ডলারের বিনিময়ে ৬২০টি বাড়ি কিনেছেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা পাঁচ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা। এদের মধ্যে যুক্তরাজ্যে ৩৬০টি বাড়ি, ৩ হাজার ৮২৪ কোটি টাকায়; সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২২৬টি ফ্ল্যাট, ১ হাজার ২০০ কোটি টাকায়; এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৩৪টি সম্পদ, ৮৩২ কোটি টাকায়। সিআইডি সিঙ্গাপুরেও জাবেদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্ত করছে। দেশে বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও জাবেদ কখনও নির্বাচনী হলফনামা বা আয়কর নথিতে এসব উল্লেখ করেননি।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, জাবেদ বিভিন্ন বেনামি কোম্পানির নামে ঋণ সৃষ্টি করে অন্তত চার হাজার ২৭০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ব্যাংক এই অর্থ উদ্ধারের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ২৯ জুন যুক্তরাজ্যের কাছে সমপরিমাণ ৩৫ কোটি ডলার ফেরত চেয়ে চিঠি পাঠায়। অর্থ ফেরত চাওয়ার কাজ গ্র্যান্ট থর্নটনকে দেওয়া হয়, যিনি জাবেদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের প্রশাসক।
ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জাবেদ যোগসাজশ ও প্রভাব খাটিয়ে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিপুল অঙ্কের এ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয় নিয়ে মতামত জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, একক কোনো ব্যক্তি চাইলেই এভাবে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিতে পারে না। এর সঙ্গে পুরো একটি ব্যবস্থা জড়িত থাকতে হয়। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের একটি পরিচালনা পর্ষদ ছিল। এই অনিয়মের দায় তারা এড়াতে পারে না। একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়েও। তাঁর মতে, এত বড় অনিয়ম কীভাবে নজরের বাইরে রইল, সেটিও বড় প্রশ্ন। ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, এখানে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করেছে। ব্যাংকের ভেতর ও বাইরে সমন্বয় ছাড়া এমন জালিয়াতি সম্ভব নয়।
দরিদ্র ও অসহায় যেসব মানুষকে ফাঁদে ফেলে তাদের নামে ঋণ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে, তাদের বিষয়ে তিনি বলেন, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব ব্যক্তিকে ঋণের দায় থেকে মুক্ত করতে হবে। প্রকৃত সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

