ফেসবুক ও ইউটিউবে স্বাস্থ্য পরামর্শ দিয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা একাধিক চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করে দেশে ভয়ংকর এক প্রতারণার জাল ছড়িয়েছে। জাহাঙ্গীর কবীর, তাসনিম জারা, মঞ্জুরুল কবির কিংবা জয়নাল আবেদীনের মতো পরিচিত চিকিৎসকদের ভিডিও, ছবি ও বক্তব্য কাটছাঁট করে ভুয়া পেজ ও চ্যানেলের মাধ্যমে নকল ওষুধ ও সাপ্লিমেন্ট বিক্রি করছে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র।
নিজেদের ‘বিকল্প চিকিৎসা’ বা হারবাল সাপ্লিমেন্ট হিসেবে প্রচার করা এসব পণ্যের বাজার ইতোমধ্যে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বাজারটি প্রতিবছর প্রায় ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। এই সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে প্রতারকরা। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এসব ভুয়া পেজ থেকে অর্ডার দিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন—কেউ পণ্যই পাচ্ছেন না, কেউ আবার পাচ্ছেন নিম্নমানের বা স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ পণ্য।
গতকাল শনিবার অনলাইনে ভুয়া তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, শুধু তাসনিম জারার নাম ব্যবহার করেই অন্তত ৫০টির বেশি ভুয়া ফেসবুক পেজ শনাক্ত করা হয়েছে। এসব পেজে যৌন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নানা পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে।
তাসনিম জারার ছবি সম্পাদনা করে ফটোকার্ড বানিয়ে, তার নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে নিয়মিত বিজ্ঞাপন চালানো হচ্ছে। মেটার অ্যাড লাইব্রেরির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিদিনই নতুন পেজ খোলা হচ্ছে বা পুরোনো পেজের নাম বদলে একই ধরনের প্রতারণা চালানো হচ্ছে।
অনুসন্ধানে তাসনিম জারা ছাড়াও আরও কয়েকজন জনপ্রিয় চিকিৎসকের নামে শতাধিক ভুয়া পেজ ও চ্যানেল শনাক্ত হয়েছে।
ভুক্তভোগী গ্রাহক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই চিকিৎসকের নামে চালানো এসব পেজ থেকে অর্ডার দিয়ে আগাম টাকা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু পরে আর পণ্য পাননি। আবার কেউ কেউ পণ্য পেলেও সেটি ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের।
প্রতারকরা পরিচিত চিকিৎসকদের ভিডিও বা ছবি ব্যবহার করে এমনভাবে বিপণন করছে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই বিশ্বাস করে অর্ডার দেন। টাকা নেওয়ার পর যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, অনলাইনে নকল ওষুধ ও সাপ্লিমেন্ট বিক্রির অভিযোগে ইতোমধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলো—জাহিদ, তৌহিদ আলম শান্ত, রিপন, আলামিন ও শাহিন মিয়া।
পুলিশ বলছে, একই উপকরণ ব্যবহার করে তারা অন্তত ২০–২২ ধরনের পণ্য তৈরি করত। ডায়াবেটিস, পাইলস, ওজন কমানো, শক্তিবর্ধকসহ নানা নাম দিয়ে এসব নকল সাপ্লিমেন্ট বাজারজাত করা হতো।
এই নকল পণ্যের বেশিরভাগ মোড়কে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘এলিট করপোরেশন’–এর নাম ব্যবহার করা হয়েছে। চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও কুমিল্লা সদরের বাইপাস এলাকার ঠিকানা দেওয়া থাকলেও অনুসন্ধানে এই নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ঠিকানাগুলোও ভুয়া।
গোয়েন্দারা বলছেন, চক্রটির নেপথ্যে কারা রয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, চক্রের এক সদস্য মো. শাহিন প্রতি মাসে ৬ থেকে ৮ টন ভেষজ গুঁড়া সরবরাহ করতেন। আমলকী, হরীতকী, বয়রা, ত্রিফলা ও সোনা পাতার গুঁড়া দিয়ে তৈরি হতো মাকা, ব্ল্যাক মাকা, স্লিমিং জুসসহ বাজারের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন সাপ্লিমেন্ট।
এই পণ্যগুলো চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাসহ সারা দেশে সরবরাহ করা হতো। কেরানীগঞ্জ, শ্যামপুর, কদমতলী, চকবাজার, মিরপুর ও বাড্ডা এলাকায় গুদামজাত করে ডেলিভারি দেওয়া হতো।
মিরপুরের বাসিন্দা মায়মুনা তুবা বলেন, ডা. জাহাঙ্গীর কবীরের নামে অনলাইনে মাকা পাউডার অর্ডার করেছিলেন। কয়েকদিন খাওয়ার পর পণ্যের মান নিয়ে সন্দেহ হয়। পরে পানিতে মিশিয়ে দেখেন, দলা পাকিয়ে যাচ্ছে। খাওয়ার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
আরেক ভুক্তভোগী মো. সুমন জানান, ফেসবুকে স্লিমিং জুসের বিজ্ঞাপন দেখে অর্ডার করেছিলেন। খাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তীব্র পেটব্যথা শুরু হয়। অভিযোগ জানাতে গেলে পেজটি তাকে ব্লক করে দেয়।
ডা. তাসনিম জারা বলেন, এসব প্রতারণার কারণে তিনি সামাজিক ও ব্যক্তিগতভাবে চরম বিড়ম্বনায় পড়ছেন। অনলাইন সাপ্লিমেন্ট ও কথিত ওষুধের ওপর কার্যকর নজরদারি না থাকাই এর মূল কারণ।
চিকিৎসক জাহাঙ্গীর কবীর জানান, ফেসবুকে তার মাত্র পাঁচটি ভেরিফায়েড পেজ ও ইউটিউবে একটি চ্যানেল রয়েছে। অথচ তার নামে শতাধিক ভুয়া পেজ থেকে প্রতারণা চালানো হচ্ছে। এ বিষয়ে থানায় মামলা করা হয়েছে এবং কয়েকজন গ্রেপ্তারও হয়েছে।
বাড্ডা থানার এসআই সুমন মিয়া জানান, নকল ওষুধ ও সাপ্লিমেন্ট বাজারজাতের ঘটনায় একটি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। গ্রেপ্তারদের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। উদ্ধার করা পণ্যের ল্যাব টেস্ট চলছে।
তিনি বলেন, তদন্তে যদি দেখা যায় কোনো পণ্য সরকারি নিবন্ধন ছাড়াই বিক্রি করা হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শেখ জহির রায়হান বলেন, জনপ্রিয় ব্যক্তিদের নাম ও ছবি ব্যবহার করে প্রতারণা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিটিআরসি ও ওষুধ প্রশাসনসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে স্বাস্থ্য খাতে বড় সংকট তৈরি হবে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক আকতার হোসেন জানান, অনলাইনে ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট বিক্রির জন্য তাদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। এখন পর্যন্ত এ ধরনের অনুমোদনের আবেদন তাদের কাছে আসেনি। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

