নিজের ভাই–বোনকে বাবার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে গোপনে ভুয়া স্বাক্ষর ও স্ট্যাম্প জালিয়াতির মাধ্যমে ট্রান্সকম গ্রুপের ১৪ হাজার ১৬০টি শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগে সিমিন রহমানের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গত ১১ জানুয়ারি পিবিআইয়ের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান ঢাকার আদালতে এ চার্জশিট জমা দেন। বৃহস্পতিবার আদালতে চার্জশিট উপস্থাপন করা হলে ঢাকা মহানগর হাকিম মো. সেফাতুল্লাহ এ বিষয়ে শুনানির জন্য আগামী ২১ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. মনির হুসাইন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
চার্জশিটে সিমিন রহমানের পাশাপাশি আরও পাঁচজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক মো. কামরুল হাসান, মো. মোসাদ্দেক, আবু ইউসুফ মো. সিদ্দিক, মো. সামসুজ্জামান পাটোয়ারী এবং লতিফুর রহমানের স্ত্রী শাহনাজ রহমান।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ১৩ জুন ঢাকায় ট্রান্সকম গ্রুপের একটি বোর্ড মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে নথিপত্রে দেখানো হয়। ওই মিটিংয়ের এজেন্ডায় ছিল পূর্বের সিদ্ধান্ত অনুমোদন, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সভায় অংশগ্রহণ ও ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরের অনুমোদন এবং লতিফুর রহমানের শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়। হাজিরা শিটে লতিফুর রহমানকে ছুটিতে দেখানো হয়। সেখানে আরশাদ ওয়ালিউর রহমানের স্বাক্ষর থাকলেও তদন্তে দেখা যায়, সভার সময় তিনি কুমিল্লায় অবস্থান করছিলেন।
চার্জশিট অনুযায়ী, ওই বোর্ড মিটিংয়ের তৃতীয় এজেন্ডার মাধ্যমে লতিফুর রহমানের মোট ২৩ হাজার ৬০০ শেয়ারের মধ্যে বড় মেয়ে সিমিন রহমানকে ১৪ হাজার ১৬০টি এবং ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমান ও ছোট মেয়ে শাযরেহ হককে চার হাজার ৭২০টি করে শেয়ার হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত দেখানো হয়। তবে মামলার বাদী শাযরেহ হক দাবি করেন, ওই ধরনের কোনো বোর্ড মিটিং ২০২০ সালের ১৩ জুন আদৌ অনুষ্ঠিত হয়নি।
তদন্তের সময় কোম্পানির বর্তমান পরিচালকদের কাছে ওই দিনের বোর্ড মিটিং ও রেজুলেশনের কাগজপত্র চাওয়া হলেও আসামিপক্ষ কোনো নথি জমা দেয়নি। একই সঙ্গে বোর্ড মিটিংয়ের আগে ই-মেইল বা ডাকযোগে কোনো নোটিশ পাঠানোর প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
চার্জশিটে আরও বলা হয়েছে, শেয়ার হস্তান্তরের কাগজপত্র ২০২০ সালের ১৩ জুন যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে (আরজেএসসি) জমা দেওয়া হয়। যদিও শেয়ার হস্তান্তর কার্যকর হয় ১৭ আগস্ট, আরজেএসসির নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ফি পরিশোধ করা হয়নি। বিলম্বে ওই ফি পরিশোধ করা হয় ২ সেপ্টেম্বর। তদন্তে বলা হয়েছে, এই জমা প্রক্রিয়ায় একাধিক অনিয়ম হয়েছে।
শেয়ার হস্তান্তরের সময় দাতা ও গ্রহীতা—কোনো পক্ষই আরজেএসসিতে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না। শুধু আসামিদের পক্ষে অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। অথচ কোম্পানি আইন অনুযায়ী দাতা ও গ্রহীতাকে আরজেএসসির প্রতিনিধির সামনে উপস্থিত থেকে স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক। এই নিয়ম না মানায় ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের ৩৮ ধারার লঙ্ঘন হয়েছে বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২০ সালে ভাই–বোনদের ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে অধিকাংশ শেয়ার নিজের নামে নিতে সিমিন রহমান গ্রুপ অব কোম্পানির নথিপত্র ও পারিবারিক ডিড অব সেটলমেন্ট তৈরি করেন। এ জন্য তিনি দুটি ভুয়া নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প এফিডেভিট ব্যবহার করেন। সেখানে ছোট বোন শাযরেহ হকসহ বাবা, ভাই ও অন্যদের স্ক্যান করা স্বাক্ষর ব্যবহার করে ট্রান্সকমের শেয়ার হস্তান্তরের দলিল তৈরি করা হয় এবং সেগুলো আরজেএসসিতে জমা দেওয়া হয়।
শাযরেহ হকের নামে দাখিল করা এফিডেভিটে ব্যবহৃত নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ২০২৩ সালে তৈরি বলে ডাক বিভাগ ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্ট্যাম্পের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে আদালতের নির্দেশে জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে প্রতিবেদন নেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, যে ভেন্ডরের নাম স্ট্যাম্পে উল্লেখ রয়েছে, তার লাইসেন্স ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর বাতিল হয়। তিনি ২০২৩ সালের স্ট্যাম্প অসদুপায়ে সংগ্রহ করে ২০২০ সালের ৩ মার্চ তারিখ দেখিয়ে নিজ স্বাক্ষরে সরবরাহ করেন।
এর আগে ভাই–বোনদের বাবার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগে ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শাযরেহ হক গুলশান থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় সিমিন রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়।

