পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি দেশের সৃজনশীল প্রকাশনা খাতও ধ্বংসের মুখে পড়ে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ কর্নার, মুজিব জন্মশতবার্ষিকীসহ নানা প্রকল্প চালু করা হয়। এসব প্রকল্পের আড়ালে মুজিব বন্দনার নামে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা অপচয় ও লুটপাট হয়েছে।
এই প্রকল্পগুলোতে আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ প্রকাশক ও লেখকরা সহজেই কাজের বরাদ্দ পেতেন। তারা মুজিব পরিবার ও মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাসভিত্তিক মানহীন বই প্রকাশ করে সরবরাহ করতেন। অন্যদিকে, ভিন্নমতাবলম্বী ও ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রকাশকদের বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন ট্যাগ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করা হয়। অনেককে নামমাত্র টাকার বইয়ের বরাদ্দ দেওয়া হয়। এতে অনেকে প্রকাশনা খাতে টিকে থাকতে হিমশিম খেয়েছেন।
একই সময়ে সরকারের অনুমতিতে ভারতীয় বই আমদানি ও বিক্রি বাড়ানো হয়। ফলে দেশীয় লেখক ও প্রকাশকরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হন। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, গবেষণা, প্রবন্ধ, জীবনী, বিজ্ঞান ও মহাকাশবিজ্ঞান বিষয়ক দেশীয় বইয়ের বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
ভুক্তভোগী প্রকাশকদের দাবি, আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা আওয়ামীঘেঁষা প্রকাশকদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ওয়ার্ক অর্ডার তৈরি করতেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লোকজনও এতে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা এ খাতে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশকদের জন্য নতুন প্রকল্প ও প্রণোদনার আহ্বান জানিয়েছেন।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মফিদুর রহমান বলেন, মুজিবসংশ্লিষ্ট বইগুলো পাবলিক লাইব্রেরি ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কেনা হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, এসব বইয়ের পেছনে সরকারের বিপুল অর্থ খরচ বা অপচয় হয়েছে। তবে বর্তমানে এসব বই আর কোথাও প্রদর্শন বা বিক্রি করা হচ্ছে না।
সূত্র জানায়, প্রায় ২০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা করে মুজিব পরিবারের গুণকীর্তনমূলক বই প্রকাশ করেছে। এসব বই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করে তারা বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। অভিযোগ আছে, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লব ঠেকাতে তারা সামাজিকমাধ্যম ও রাজপথে সক্রিয় ছিল। ফ্যাসিবাদের পতনের পরও তারা বর্তমান সরকারবিরোধী বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা বলেন, আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ কিছু প্রকাশক সে সময় সরকারি প্রতিষ্ঠানে জোর করে বই বিক্রি করেছেন এবং ইচ্ছামতো দাম নিয়েছেন। বর্তমানে অনেকে ভয়ে আত্মগোপনে আছেন, আবার কেউ কেউ রাজনৈতিক পরিচয় বদলে নতুনভাবে সক্রিয় হয়েছেন।
বৈষম্যবিরোধী সৃজনশীল গ্রন্থ প্রকাশক সমিতির সভাপতি সাঈদ বারী বলেন, বিগত সরকারের সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এসইডিপি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, গণগ্রন্থাগার ও বিভিন্ন প্রকল্পে বই সরবরাহের নামে শত শত কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। এতে সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
২০২৪ সালের ২৩ নভেম্বর প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে বই কেনার জন্য সরকারের ১০ কোটি টাকার বরাদ্দের প্রায় অর্ধেকই বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে নিয়ে লেখা বই কিনতে ব্যয় করা হয়।
প্রকাশনা খাতে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে অন্তত ২০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও তাদের মালিকদের বিরুদ্ধে। এদের মধ্যে রয়েছেন আগামী প্রকাশনীর ওসমান গনি, সময় প্রকাশনের ফরিদ আহমেদ, অন্যপ্রকাশের মাজহারুল ইসলাম, তাম্রলিপির তারিকুল ইসলাম রনি, কাকলী প্রকাশনীর নাসির আহমেদ সেলিম, অনুপম প্রকাশনীর মিলন কান্তি নাথ, চারুলিপির হুমায়ুন কবীর ও জার্নিম্যান বুকসের মালিক তারিক সুজাতসহ আরও অনেকে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ বৈষম্যবিরোধী সৃজনশীল গ্রন্থ প্রকাশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হাসান বলেন, মুজিববর্ষের কমিটিতে থাকা সিন্ডিকেট সদস্যরা সরকারি বই সরবরাহ খাতে বিপুল অর্থ লুট করেছেন।
তবে অভিযুক্ত প্রকাশকদের অনেকে লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সময় প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদ বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী বই কিনেছে এবং কোনো প্রকাশকের তিন-চারটির বেশি বই নেওয়া হয়নি। তাই প্রকাশকদের লুটপাটের সুযোগ ছিল না।
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের নামে বই প্রকাশ করে ব্যাপক অর্থ লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। ওই কমিটির সদস্য সচিব কবি কামাল চৌধুরীর নেতৃত্বে ওসমান গনি, মাজহারুল ইসলাম, ফরিদ আহমেদ, শহিদুল ইসলাম বিজু ও তারিক সুজাত শীর্ষে ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।
বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ কর্নার প্রকল্পের আওতায় দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্নার তৈরি করা হয়। গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের এই প্রকল্পে ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ২২ কোটি ২৪ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়। এসব কর্নারে “বঙ্গবন্ধু মানেই স্বাধীনতা”, “৩০৫৩ দিন”, “অমর শেখ রাসেল”সহ নানা বই সরবরাহ করা হয়।
জুলাই বিপ্লবের পর দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে এসব কর্নার সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কোথাও বই নষ্ট করা হয়েছে, কোথাও গুদামে রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক গফুর হোসেন বলেন, বিগত সরকারের সময়ে সরকারি বই সরবরাহ খাতে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এসইডিপি প্রকল্পেও বই কেনায় আওয়ামীঘেঁষা প্রকাশকদের প্রভাব ছিল। প্রকল্পের এক কর্মকর্তা জানান, শেখ মুজিব ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বইগুলো সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয়েছিল, যা পরে সরিয়ে ফেলা হয়। বর্তমানে এ প্রকল্পে বই কেনার বাজেটও বন্ধ রয়েছে।
মহাকালের প্রকাশক মৃধা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সে সময়ে ইসলামি বই বিক্রির কারণে তার স্টল বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শতাধিক প্রকাশক সরকারি বই ক্রয়ে বঞ্চিত হয়েছেন। তিনি দাবি করেন, সব মিলিয়ে এ খাতে হাজার কোটি টাকার বেশি লুটপাট হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের উচিত ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশকদের টিকিয়ে রাখতে নতুন প্রকল্প ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া।
সূত্র জানায়, অভিযুক্তদের মধ্যে চারুলিপি প্রকাশনের হুমায়ুন কবীর বর্তমানে কারাগারে আছেন। জার্নিম্যান বুকসের মালিক তারিক সুজাত পলাতক। অন্য কয়েকজন প্রকাশকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তারা সাড়া দেননি।

