খুলনা বিভাগের আমন ধান সংগ্রহ অভিযানে ব্যাপক অনিয়ম ও ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, বিভাগের ১০ জেলার মিল মালিক ও খাদ্য কর্মকর্তাদের জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা আদায় করা হচ্ছে। বিশেষ করে অতিরিক্ত বরাদ্দের ধান ও চাল কেনার ক্ষেত্রে মিলার ও গুদাম কর্মকর্তাদের প্রতি কেজি ৩০ পয়সা থেকে ১ টাকা কমিশন দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও মিল মালিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, দাবি করা অর্থ না দিলে বদলি করা বা নানা রকম হয়রানি করা হয়। যেসব মিলার অর্থ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন, তাদের বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়ার সঙ্গে নানা ধরনের ভীতি প্রদর্শন করা হয়।
চলতি আমন মৌসুমে খুলনা বিভাগের ১০ জেলা থেকে চাল সংগ্রহের মূল লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭৭,২৫৩ টন। পরে তা ১,১৩,৮৮৬ টনে বৃদ্ধি করা হয়। ধানের বাজারমূল্য কম থাকায় কিছুটা বেশি লাভ করছেন মিল মালিকরা। তবে অতিরিক্ত বরাদ্দের চাল ও ধানের প্রতিকেজি থেকে বিভাগীয় খাদ্য কর্মকর্তা প্রতি কেজি ৩০ পয়সা ও প্রথম বরাদ্দের ধান-চাল থেকে ১০ পয়সা কমিশন নিচ্ছেন বলে অভিযোগ।
প্রথম পর্যায়ে ধান কেনা হয়েছে ৬,৩১৩ টন। এরপর বিশেষ বরাদ্দের নামে আরও ২৬,০০০ টনের বেশি ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। অতিরিক্ত বরাদ্দে গুদাম কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রতি কেজি ১ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। এভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন মামুনুর রশিদ।
জেলা পর্যায়ে তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ধান কেনা হয়েছে চুয়াডাঙ্গা, যশোর ও সাতক্ষীরা জেলায়। চুয়াডাঙ্গা জেলা থেকে জানা গেছে, দর্শনা গুদামের ধারণক্ষমতা ৫০০ টন। চলতি মৌসুমে সেখানে ধান সংগ্রহ করা হয়েছে ১,৯০০ টন। জেলার সদর এলএসডিতে মূল বরাদ্দ ছিল ৪০ টন, পরে অতিরিক্ত কেনা হয়েছে ৬১১ টন। সরোজগঞ্জ এলএসডিতে ২৫ টন মূল বরাদ্দের পর কেনা হয়েছে ১,৭২৮ টন। আলমডাঙ্গা উপজেলায় কেনা হয়েছে ১৬৭ টন, পরে অতিরিক্ত ২,২০৯ টন। এক জেলা থেকেই অতিরিক্ত ধান কেনার মাধ্যমে প্রায় ১৫ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে।
স্থানীয় খাদ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গুদামে ধান ও চাল রাখার ক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ধান কেনা হয়েছে। কৃষকদের নামে ধান সংগ্রহ দেখানো হলেও প্রকৃত কৃষকরা তা সরবরাহ করেননি। আরসি ফুডের সহযোগিতায় জালিয়াতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে।
মামুনুর রশিদ শুধু ৩০ পয়সা কমিশনেই থামেননি। তিনি আঁতাতকারীদের জেলায় অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়ার মাধ্যমে আরো অর্থ আদায় করছেন। চুয়াডাঙ্গা সদর ও দর্শনা গুদামে বরাদ্দের তুলনায় ৫–১০ গুণ বেশি ধান কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। কর্মকর্তারা কৃষকদের থেকে ধান কিনে নিজস্ব গুদামে জমা দিয়েছেন। এ বিষয়ে তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের দায়িত্বে থাকাকালীনও মামুনুর রশিদ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন। খুলনায় যোগদানের পর চলতি মৌসুমে ধান ও চালের প্রতি কেজিতে কমিশন নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম বরাদ্দে ১০ পয়সা এবং অতিরিক্ত বরাদ্দে ৩০ পয়সা করে বাটা নেওয়া হচ্ছে।
খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে দুই দফা উপস্থিত হয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর সহকারী আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক পরিতোষ কুমার কুণ্ডু দাবি করেছেন, “লক্ষ্যমাত্রার মাত্র দুই টন চাল কম সংগ্রহ হয়েছে, ধান শতভাগ সংগ্রহ হয়েছে। কৃষক ও মিলারদের বিল চেকের মাধ্যমে পরিশোধ করেছি। অতিরিক্ত টাকা বা কমিশন নেওয়ার অভিযোগ মিথ্যা।”

