দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রাজস্ব ফাঁকি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের মালিকদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুদক তমা গ্রুপের ৫টি এবং ম্যাক্স গ্রুপের ১০টি অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন (অডিট রিপোর্ট) তলব করেছে।
দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান টিমের প্রধান ও দুদকের পরিচালক আবুল হাসনাত স্বাক্ষরিত চিঠি সম্প্রতি বিভিন্ন ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও জয়েন্ট স্টক কোম্পানি ও ফার্মসমূহের রেজিস্ট্রি (আরজেএসসি) অফিসে পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ওই দুই গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত কোন নথি দুদকের কাছে পৌঁছায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নথিপত্র সরবরাহের জন্য শিগগিরই আরও একটি চিঠি পাঠানো হবে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের মালিকদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানান, “দায়িত্বপ্রাপ্ত অনুসন্ধান কর্মকর্তারা দুদকের আইন ও বিধি অনুযায়ী কাজ করছেন। অনুসন্ধান শেষে অভিযোগের সত্যতা জানা যাবে।”
অভিযোগ অনুযায়ী, তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের মালিকরা তাদের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক আয়-ব্যয় বা লাভ-লোকসানের তথ্য গোপন ও জালিয়াতি করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), জয়েন্ট স্টক কোম্পানি বা যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি) এবং বিভিন্ন ব্যাংকে বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। ব্যাংকঋণ নেওয়ার সময় তারা প্রতিবেদনগুলোতে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল লাভ দেখিয়েছে। কিন্তু এনবিআরে জমা দেওয়া রিপোর্টে লোকসান দেখানো হয়েছে, আবার জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনগুলোতে সীমিত লাভ বা কিছু ক্ষেত্রে লোকসান দেখানো হয়েছে। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছে। দুদক জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে তমা গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো:
- তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড (টিসিসিএল)
- তমা কংক্রিট
- তমা ট্যাক্সি
- তমা প্রপার্টিজ
- ভাটিকান প্রপার্টিজ লিমিটেড
পর্যায়ক্রমে গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনও তলব করা হতে পারে। এছাড়া, প্রাথমিকভাবে ম্যাক্স গ্রুপের ১০টি প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো:
- ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড
- কুশিয়ারা পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি লিমিটেড
- ম্যাক্স পাওয়ার লিমিটেড
- ম্যাক্স ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড
- ম্যাক্সিনক্স লিমিটেড
- ম্যাক্স সিকোসও
- ম্যাক্স বিল্ডিং টেকনোলজি লিমিটেড
- ম্যাক্স প্রি-স্ট্রেস লিমিটেড
- লুব হাউস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড
- আফা স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড
দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিক চিঠি পাঠানোর পরও যদি কোনো নথি না জমা দেওয়া হয়, তবে পুনরায় নথি তলব করা হবে। রাজস্ব ফাঁকি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগের ভিত্তিতে তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের বিরুদ্ধে দুদক গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুসন্ধান শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথমে একজন উপপরিচালকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিশেষ টিম গঠন করা হয়। তবে টিম কাজ শুরু করতে না পারায় পুনরায় আরেকজন উপপরিচালকের নেতৃত্বে টিম পুনর্গঠন করা হয়। এরপরও আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় অনুসন্ধান কর্মকর্তাদের পরিবর্তন করা হয়।
শেষ পর্যন্ত পঞ্চম অনুসন্ধান টিমের দায়িত্ব পেয়েছেন দুদকের পরিচালক আবুল হাসনাত। চার সদস্যের এই বিশেষ টিমের নেতৃত্বে তিনি গত ১৮ জানুয়ারি তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনসহ প্রয়োজনীয় তথ্য তলব করতে নোটিশ পাঠিয়েছেন এনবিআর, জয়েন্ট স্টক কোম্পানি এবং বিভিন্ন ব্যাংকে।
দুদক জানিয়েছে, তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি অনুসন্ধান চলছে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান রেলওয়ের বিভিন্ন প্রকল্পে ৩০ হাজার কোটি টাকার আত্মসাতের অভিযোগ সম্পর্কিত। অভিযোগ অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় সব প্রকল্পের কাজ নিয়ন্ত্রণ করেছে তমা ও ম্যাক্স গ্রুপ। রাজনৈতিক প্রভাবে এই প্রতিষ্ঠান দুটি অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।
প্রকল্পের মেয়াদ ও খরচ বাড়িয়ে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। লুটের টাকার বড় অংশ বিদেশে পাচারের উদ্দেশ্যে ভুয়া এলসি খোলা মাধ্যমে ব্যবহার করা যন্ত্রপাতি আমদানির নামে পাঠানো হয়েছে। অনুসন্ধান অনুযায়ী, অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন ম্যাক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ, তার স্ত্রী ও গ্রুপের পরিচালক কানিজ ফাতেমা, তমা গ্রুপের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ভূঁইয়া, তার মেয়ে ও গ্রুপের পরিচালক রাসনাত তারিন রহমান, এবং ছেলে ও গ্রুপের পরিচালক মুকিতুর রহমান। দেশ ছেড়ে পালানোর ঝুঁকি এড়াতে দুদকের আবেদনমতে, বিচারিক আদালত ওই সকল পরিচালকের জন্য বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
রাজবাড়ী-টুঙ্গিপাড়া, পাবনা ঈশ্বরদী-ঢালারচর, চট্টগ্রাম দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণ, আখাউড়া-লাকসাম রেললাইনসহ বিভিন্ন প্রকল্পের মেয়াদ ও খরচ দফায় দফায় বাড়িয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা লোপাটের অভিযোগে তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের বিরুদ্ধে ২০১৮ সাল থেকে দুদকে অভিযোগ জমা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক প্রভাবে বহু অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হলেও ফাইলবন্দি হয়ে পড়েছে।
২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর নতুন করে আরও অভিযোগ আসে। এর মধ্যে আখাউড়া-লাকসাম ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। দেড় বছর অনুসন্ধানের পর বিষয়টি ফাইলবন্দি হয়।
পুনরায় অনুসন্ধানের জন্য দুদকের পরিচালক মো. আবুল হাসনাতের নেতৃত্বে চার সদস্যের বিশেষ টিম গঠন করা হয়। টিমের অন্য সদস্যরা হলেন সহকারী পরিচালক আশিকুর রহমান, আল আমিন ও উপসহকারী পরিচালক সাবিকুন নাহার। টিম ইতোমধ্যে প্রকল্পসংক্রান্ত নথিপত্র সংগ্রহ করেছে। প্রাথমিক পর্যালোচনায় নথিপত্র থেকে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
তমা ও ম্যাক্স গ্রুপের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মধ্যে একটি হলো রাজবাড়ী-টুঙ্গিপাড়া প্রকল্প:
আখাউড়া-লাকসাম রেল প্রকল্পের কাজ যৌথভাবে পেয়েছে ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং তমা কনস্ট্রাকশন। কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই ২০১০ সালে প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ১০১ কোটি টাকা। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার সময়সীমা ছিল ২০১৩ সাল, তবে প্রকল্প বাস্তবে শেষ হয় পাঁচ বছর পরে, অর্থাৎ ২০১৮ সালে।
কাজের মেয়াদ তিনবার বাড়ানো হয় এবং নির্মাণ ব্যয় ৯৩৪ কোটি টাকা বৃদ্ধি পায়। ফলে ১ হাজার ১০১ কোটি টাকার প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়ায় ২ হাজার ৩৫ কোটি টাকায়। অভিযোগ অনুযায়ী, এই প্রকল্পে অন্তত ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে।
পাবনা ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথ:
২০১০ সালে পাবনা থেকে ঈশ্বরদী-ঢালারচর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের কাজ পেয়েছে মাক্স গ্রুপ। প্রকল্পের কাজ পাঁচ বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সাড়ে তিন বছর সময় বাড়িয়ে ২০১৮ সালে প্রকল্প সম্পন্ন হয়।
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯৮৩ কোটি টাকা। পরবর্তীতে তিন দফায় ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে তা দাঁড়ায় ১ হাজার ৭১৫ কোটি টাকায়। এর ফলে প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা হয়। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর এই রুটে মাত্র একটি ট্রেন চলাচল করছে, যেখানে ২০ থেকে ২৮টি ট্রেন চলার কথা ছিল। বিষয়টি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির গুরুতর উদাহরণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার রেলপথ:
বিগত সরকারের সময়ে সবচেয়ে আলোচিত রেলপ্রকল্প ছিল চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণ। এ প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি অর্থ লোপাটের অভিযোগ এসেছে। ২০১৬ সালে ১০১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথের জন্য প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা। তবে প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকৃত ব্যয় দাঁড়ায় ১৮ হাজার কোটি টাকায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরিকল্পনা, নির্মাণ সময় ও ব্যয়ের অনিয়মের কারণে এই প্রকল্পে বিপুল অঙ্কের অর্থ লোপাট হয়েছে, যা দেশের রেল খাতে সবচেয়ে বড় দুর্নীতির ঘটনা হিসেবে ধরা হচ্ছে।

