জলিল মিয়া জানেন, তার সঞ্চয়পত্রে টাকা আছে। কাগজে-কলমে সব ঠিকঠাক। সরকারি হিসাবও মিলছে। কিন্তু বাস্তবে সেই টাকা তার হাতে আসছে না। সমস্যা একটাই—যে ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে তার সঞ্চয়পত্র যুক্ত ছিল, সেটি এখন আর নেই। আর নতুন কোনো হিসাব যুক্ত করারও পথ বন্ধ।
জলিল মিয়া মতো অসংখ্য সঞ্চয়পত্র গ্রাহক এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে পড়েছেন অসহায় অবস্থায়। জাতীয় সঞ্চয়পত্র দেশের নিরাপদ বিনিয়োগের প্রতীক। অনেকের জন্য এটি অবসর জীবনের ভরসা, অসুস্থতা বা জরুরি মুহূর্তের শেষ আশ্রয়। কিন্তু বর্তমানে অনেক গ্রাহকের কাছে এটি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে।
সমস্যার মূল কারণ একটি জালিয়াতির ঘটনা। গত বছরের অক্টোবরে এস এম রেজভী নামে একজন গ্রাহকের মোবাইল নম্বর ও লেনদেনের সীমা কৌশলে পরিবর্তন করে ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রের অর্থ তুলে নেওয়া হয়। ঘটনায় চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সেই সঙ্গে, সঞ্চয়পত্র বিক্রির পাসওয়ার্ড রাখার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। “এ বিষয়ে আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। মন্ত্রণালয় যা বলে, আমরা তা করি। সেটাই আমাদের কাজ,”—জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. রওশন আরা বেগম।
জালিয়াতির ঘটনা তদন্তের পর নিরাপত্তা জোরদার করতে গ্রাহকদের ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল নম্বর পরিবর্তনের প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু এর প্রভাব পড়েছে মূলত সাধারণ গ্রাহকদের ওপর। বহু মানুষ নতুন হিসাব যুক্ত করতে না পারায় তাদের সঞ্চয়পত্রে থাকা অর্থ সরাসরি সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। মোটের ওপর, নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য নেওয়া পদক্ষেপই গ্রাহকদের জন্য বড় ধরনের অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জলিল মিয়া এমন একজন ভুক্তভোগী। তার একটি ব্যাংকে চলতি ও সঞ্চয়ী—দুটি হিসাব ছিল। সঞ্চয়পত্র কেনার সময় চলতি হিসাবটি সংযুক্ত করা হয়েছিল। পরে ব্যবসায় ক্ষতি হওয়ায় তিনি ওই চলতি হিসাবটি বন্ধ করেন। সম্প্রতি সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষ হলেও সংযুক্ত হিসাবটি বন্ধ থাকায় তিনি টাকা তুলতে পারছেন না। নতুন কোনো হিসাব যুক্ত করার চেষ্টা করেও সমাধান পাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, “ব্যাংকেও গেছি, সঞ্চয় অধিদপ্তরেও গেছি—কেউই কিছু করতে পারছে না। আমার মতো আরও অনেক গ্রাহক এখন একই পরিস্থিতির শিকার। কেউ চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য রাখা টাকা তুলতে পারছে না, কেউ সংসারের জরুরি প্রয়োজনেও সঞ্চয়পত্রের অর্থ পাচ্ছে না।”
জলিল মিয়া বলেন, “একটি জালিয়াতির ঘটনায় নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন, এতে কারও দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে যদি বৈধ গ্রাহক মাসের পর মাস ভোগান্তিতে পড়ে, তবে এটি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।” অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আন্তরিকতা দেখিয়েছেন। তবে হিসাব পরিবর্তনের ব্যবস্থা করতে পারছেন না। তাদের পরামর্শ, বন্ধ ব্যাংক হিসাবটি আবার চালু করতে আবেদন করতে হবে। হিসাব পরিবর্তন এখন জটিল হয়ে গেছে। জলিল মিয়ার মতো সমস্যায় পড়েছেন আরও অনেকে। গত রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) সঞ্চয় অধিদপ্তরে অনেক গ্রাহককে একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে ধর্ণায় বসতে দেখা যায়।
মো. আরিফুল নামে একজন গ্রাহক বলেন, “একই নামে দুটি ব্যাংক হিসাব ছিল। একটিকে বন্ধ করি। সঞ্চয়পত্রে সেই হিসাব সংযুক্ত। এখন মেয়াদ শেষ হলেও টাকা পাচ্ছি না। ব্যাংক যোগাযোগের পর সঞ্চয় অধিদপ্তরেও গিয়েছি। কর্মকর্তারা আন্তরিক, কিন্তু হিসাব পরিবর্তনের সুযোগ নেই। তারা পরামর্শ দিয়েছেন বন্ধ হিসাব আবার চালু করতে।”
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, মন্ত্রণালয় থেকে সীমিতভাবে হিসাব পরিবর্তনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে তা শুধুমাত্র দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক এবং মৃত গ্রাহকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যারা হিসাব বন্ধ করেছেন, তাদের জন্য এখনো সুযোগ নেই। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, হিসাব পরিবর্তনের কয়েক হাজার আবেদন জমে আছে। তবে প্রক্রিয়াটি বন্ধ থাকায় নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না।
এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “গ্রাহকের দুর্ভোগ আমরা বুঝি। কিন্তু অনুমোদন ছাড়া কিছু করার ক্ষমতা আমাদের নেই। নতুন নীতি অনুযায়ী হিসাব পরিবর্তনের দায়িত্ব কেবল তিনজন কর্মকর্তার হাতে। আগে গ্রাহক যেখান থেকে সঞ্চয়পত্র কিনতেন, সেখানে হিসাব পরিবর্তন করা যেত। এখন কেবল অধিদপ্তর থেকে সম্ভব।”
তিনি আরও বলেন, “হিসাব পরিবর্তন সহজ হওয়া উচিত। জটিল করার প্রয়োজন নেই। কারণ চাকরি বা অন্যান্য কারণে গ্রাহককে স্থানান্তরিত হতে হয়। প্রকৃত গ্রাহক যাতে সঠিক সেবা পায়, তার দিকে নজর রেখে নীতি করা উচিত।”
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. রওশন আরা বেগম বলেন, জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর বলেন, “এই বিষয়ে আমার পক্ষে বলা সম্ভব না। মন্ত্রণালয় যা বলে, আমরা তা করি। সেটাই আমাদের কাজ।”
যা ঘটেছিল অক্টোবরে:
হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের হিসাব নিরীক্ষণ কর্মকর্তা মঞ্জুর আলম তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এস এম রেজভীর আয়কর রিটার্ন পূরণ করতে গিয়ে দেখেন, তার নামে কেনা ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ১৩ অক্টোবর তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে রেজভীর নিজে কোনো আবেদন করেননি। পরে জানা যায়, গ্রাহকের মোবাইল নম্বর ও লেনদেনের সীমা পরিবর্তনসহ নানা জালিয়াতির মাধ্যমে ২৩ অক্টোবর ওই টাকা উত্তোলন করা হয়।
রেজভীরের ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ভাঙিয়ে টাকা এনআরবিসি ব্যাংকের দিনাজপুরের রানীগঞ্জ উপশাখার মো. আরিফুর রহমান মিমের অ্যাকাউন্টে নেওয়া হয়। সেখানে জমা হওয়ার পর ঢাকার দুটি শাখা থেকে তা উত্তোলন করা হয়। আরিফুর লেনদেন সীমা মূলত ২ লাখ টাকা হলেও জালিয়াতির মাধ্যমে তা ১০ লাখ টাকা করা হয়।
এছাড়া, মোহাম্মদ মারুফ এলাহী রনির ডাচ–বাংলা ব্যাংকের কারওয়ানবাজার শাখার ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে আরও দুই ব্যক্তির সঞ্চয়পত্র থেকে ৫০ লাখ টাকা নেওয়া হয়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা উত্তোলনের আগেই আটকে দেয়।
ঘটনার পর জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের এনএসসি সিস্টেমে জালিয়াতির কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পাসওয়ার্ড থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন কর্মকর্তা দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। নতুন তিন জনকে দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
জালিয়াতি প্রতিরোধে নিয়ম অনুযায়ী, যে অফিস থেকে সঞ্চয়পত্র কেনা হয়, শুধুমাত্র সেই অফিস থেকে তথ্য পরিবর্তন, সুদ পাওয়া বা অর্থ উত্তোলনের আবেদন করা যায়। আবেদন পাওয়ার পর গ্রাহকের মোবাইল নম্বরে ওটিপি পাঠানো হয়। উপস্থিত গ্রাহক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মীকে ওটিপি দেখিয়ে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুযায়ী তথ্য পরিবর্তন করতে পারে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে সার্ভারে ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা প্রমাণ রেকর্ড থাকে।

