আমাদের সমাজ ক্রমশ অসহিষ্ণু ও সহিংস হয়ে উঠছে। ‘জোর যার মুল্লুক’ প্রথা যেন নিত্যদিনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। ভিন্নমত দমন এবং প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার মানসিকতা ভয়ঙ্করভাবে বিস্তার লাভ করেছে।
বাংলাদেশে অসহিষ্ণুতার চর্চা নতুন নয়। তবে আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনকালে এই অসহিষ্ণুতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি চরম সীমা ছুঁয়েছে। ভিন্নমত প্রকাশ করার দায়ে মানুষকে গুম করা হতো। সম্প্রতি প্রকাশিত গুম কমিশনের প্রতিবেদনে এ ধরনের তথ্য উঠে এসেছে।
তৎকালীন সরকারের সমালোচনা শুধু ব্যক্তিগত বিরোধে সীমাবদ্ধ থাকত না। সরকারের পাইক বা প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রকাশ করলেও গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা হতো। এ সময়ে পুলিশ ও অন্যান্য সরকারি পদে থাকা প্রভাবশালী কর্মকর্তা নিজের সম্পদ বৃদ্ধি করতেন, যা নিয়ে কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে শুরু হতো আদালত ও মামলা দিয়ে হয়রানি। উদাহরণস্বরূপ, বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে আটটি মামলা হয়েছিল, যা মূলত হেনস্তা ও চাপ সৃষ্টি করার জন্যই দায়ের করা হয়েছিল।
এ ছাড়াও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমালোচনা করলে মুখে নেমে আসতো নিপীড়ন ও নির্যাতন। অনেক সমালোচক কারাগারে গেছেন, কেউ গুম হয়েছেন, আবার কেউ হত্যা হয়েছেন। এই প্রক্রিয়ায় সমাজের অসহিষ্ণুতা গভীরভাবে গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশে আজ যে পরিস্থিতি, তা শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক সচেতনতার জন্যও সতর্কবার্তা। ভিন্নমত গ্রহণ ও সমালোচনাকে দমন করা চলতে থাকলে সমাজে অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি আরও মজবুত হবে।
সারা দেশে মাদকের বিস্তার গম্ভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিগত শাসনকালে শাসক দলের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠে মাদক সিন্ডিকেট। প্রতি এলাকায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছে সন্ত্রাসী বাহিনী। ৫ আগস্ট, জনগণ এই সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে প্রতিবাদ করে। সেই আন্দোলনের ফলস্বরূপ পতন ঘটে ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের। নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে জনগণ সেদিন পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছিল।
কিন্তু নতুন বাংলাদেশ কি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে? বাস্তবতা বলছে, তা হয়নি। সমাজে অস্থিরতা কমেনি, মানুষের জীবন নিরাপদ হয়নি। বরং নতুন করে গড়ে ওঠা মব সন্ত্রাস ও কিশোর গ্যাং দেশের মানুষের জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে নতুন সন্ত্রাসী বাহিনী।
মতের ভিন্নতা মানলেই গণমাধ্যম হামলার শিকার হচ্ছে। অফিসে আগুন লাগানো হচ্ছে, গণপিটুনির মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতা সমাজে বেড়ে উঠছে। কিছু নব্য ক্ষমতাবানদের কাছে দেশের মানুষ একপ্রকার জিম্মি হয়ে গেছে। এমন একটি পরিস্থিতির মধ্যে দেশে নির্বাচন হচ্ছে। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—সামাজিক অস্থিরতা কমানো, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। সরকারকে দায়িত্ব নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া উচিত, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সামাজিক অস্থিরতা কমানো এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্য অর্জনে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই কয়েকটি নীতিগত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর মধ্যে তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।
এক, মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি গ্রহণ করতে হবে। যে বা যারাই মব সহিংসতায় জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আইন কোনো অবস্থাতেই নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে হলে রাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—সহিংসতার কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক ছাড় নেই।
দুই, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। মুক্তচিন্তা ও ভিন্নমতের পথ উন্মুক্ত না হলে সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি দূর হয় না। মতের অমিলকে অপরাধ হিসেবে দেখার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব, যা গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি শক্ত করে।
তিন, রাজনীতির ভাষা ও আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। সমাজে অসহিষ্ণুতার অন্যতম বড় উৎস হয়ে উঠেছে রাজনীতির কটু ও উসকানিমূলক ভাষা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা গড়ে উঠেছে। নির্বাচনের সময় এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়। নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্য মাঠপর্যায়ে সহিংসতার জন্ম দেয়, যার খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। এবারের নির্বাচনেও এই চিত্র স্পষ্ট।
নতুন সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হওয়া উচিত রাজনৈতিক ভাষাকে সংযত করা। ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব যদি বিরোধী মতকে সহ্য করার বার্তা দেয় এবং প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয়, তাহলে তার প্রভাব সমাজের নিচের স্তর পর্যন্ত পৌঁছায়। রাজনীতি যখন সহনশীল হয়, সমাজও ধীরে ধীরে শান্তির পথে এগোয়।
চার, বাংলাদেশে সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতার মূল কারণ হিসেবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চিহ্নিত করা যায়। মানুষ যখন দেখে, রাজনৈতিক পরিচয় থাকলে অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়, তখন সহিংসতা স্বাভাবিক রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়। নতুন সরকার যদি সত্যিই এই চক্র ভাঙতে চায়, তাহলে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—অপরাধীর কোনো দল নেই। রাজনৈতিক হামলা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, ভাঙচুর বা প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ক্ষেত্রে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শুধু মামলা দায়ের নয়, বিচার ও শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতেই হবে। আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ছাড়া সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি কমানো সম্ভব নয়।
পাঁচ, নতুন সরকারের উচিত সংখ্যালঘু নিরাপত্তাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগাম নিরাপত্তা ব্যবস্থা, হামলার পর দ্রুত পুনর্বাসন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে এই ধরনের ঘটনা অস্বীকার বা ছোট করে দেখার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। রাষ্ট্র যদি স্পষ্টভাবে ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ায়, তবে সমাজে আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়।
ছয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উদ্যমহীন ও আতংকিত হয়ে পড়েছেন। তাদের মনোবল ভেঙে গেছে। নতুন সরকারের দায়িত্ব হবে এই মনোবল ফিরিয়ে আনা। সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটি হতে হবে পেশাদার ও নিরপেক্ষ। রাজনৈতিক চাপ বা পক্ষপাতমূলক আচরণ বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, বাহিনী আইন অনুযায়ী কাজ করবে, অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করবে না এবং মানবাধিকার রক্ষা করবে। বাহিনীর ভিতরে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বাড়ানো না হলে সহিংসতা সাময়িকভাবে কমলেও স্থায়ী শান্তি আসবে না।
সাত, আজকের বাংলাদেশে অসহিষ্ণুতার একটি বড় অংশ জন্ম নিচ্ছে গুজব ও ভুয়া তথ্য থেকে, বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে। ধর্মীয় অনুভূতি, রাজনৈতিক পরিচয় বা জাতিগত বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে মুহূর্তের মধ্যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। নতুন সরকারের করণীয় হবে গুজব মোকাবিলায় দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য দেওয়া। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে, যাতে ঘৃণামূলক প্রচার ঠেকানো যায়। কণ্ঠরোধ নয়, সত্যের প্রচারই রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত। পাশাপাশি নাগরিকদের ডিজিটাল সচেতনতা বৃদ্ধি করাও জরুরি।
আট, বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সংলাপের সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। যেখানে সংলাপ নেই, সেখানে সংঘাত অনিবার্য। নতুন সরকার যদি বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও সামাজিক নেতৃত্বের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ ও আলোচনার উদ্যোগ নেয়, তবে রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত হতে পারে। ভিন্নমতকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে না দেখে গণতন্ত্রের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হবে নতুন সরকারের পরিপক্বতার পরিচয়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সংলাপ সহিংসতার বিকল্প এবং সমঝোতা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি।
নয়, শিক্ষাঙ্গনেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট হয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে উগ্রতা ও সহিংসতার প্রবণতা বেড়ে গেছে। নতুন সরকারের প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে একটি হবে শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে ফিরিয়ে আনা এবং শিক্ষার পরিবেশ দ্রুত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। বিশ্লেষকরা বলছেন, শিক্ষাঙ্গনে শান্তি ফিরানো মানে শুধু শিক্ষা নয়, সমাজে সহনশীলতার সংস্কৃতিও শক্তিশালী করা।
দশ, মাদকমুক্ত সমাজ গড়া নতুন সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সামাজিক অবক্ষয়ের একটি বড় কারণ হলো মাদকের অবাধ বিস্তার। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাদক চক্রের সঙ্গে সবসময় ক্ষমতাসীনদের সম্পৃক্ততা থাকে। এই চেইন ভেঙে না ফেলা পর্যন্ত তরুণ প্রজন্মকে মাদক থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, তরুণ প্রজন্ম যদি সহনশীলতার চর্চায় বড় হয়, তাহলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ আরও শান্ত ও স্থিতিশীল হবে।
নির্বাচনের পর নতুন সরকার সমাজে অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতা বন্ধ করতে ব্যর্থ হলে, শুধু শক্ত হাতে শাসন যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন হবে ন্যায়বিচার, সংলাপ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার। শান্ত সমাজ কোনো একক সিদ্ধান্তে তৈরি হয় না; এটি গড়ে ওঠে রাষ্ট্রের আচরণ, রাজনীতির ভাষা এবং নাগরিকের আস্থার ওপর ভর করে। ইতিহাস প্রমাণ করে, সহিংসতা দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখা যায়, কিন্তু শান্তি ও ঐক্য ছাড়া কোনো জাতি এগোতে পারে না।

