দেশের বৃহত্তম ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ। প্রতিদিন এখানে কোটি কোটি টাকার পণ্য কেনাবেচা হয়। দেশের ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় এই বাজারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই বাজারকেন্দ্রিক একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নুরজাহান গ্রুপ।
নথি ও আদালতের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খাতুনগঞ্জকে কেন্দ্র করে ব্যাংকগুলোর দুর্বল তদারকি এবং একাধিক নামমাত্র অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নুরজাহান গ্রুপ হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। পরে সেই ঋণ পরিশোধ না করায় গ্রুপটির বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের অভিযোগ তৈরি হয়। আদালত, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বিভিন্ন ব্যাংকের নথিতে উঠে এসেছে, এই অর্থের পরিমাণ আট হাজার কোটি টাকারও বেশি। আর্থিক অঙ্কের দিক থেকে এটি দেশের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
নুরজাহান গ্রুপের উত্থান মূলত খাতুনগঞ্জের ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা থেকে। একসময় মাররিন ভেজিটেবল অয়েলস লিমিটেড, নুরজাহান সুপার অয়েল লিমিটেড এবং জাসমির ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেডসহ গ্রুপটির প্রায় ২০টি প্রতিষ্ঠান ছিল। ব্যাংক ঋণ গ্রহণের উদ্দেশ্যে এসব কোম্পানি একের পর এক গড়ে তোলা হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে তদন্তে দেখা গেছে, কয়েক বছরের মধ্যেই এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বাস্তবে তাদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, চলমান মামলাগুলোতে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপি হিসেবে নুরজাহান গ্রুপকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে জহির উদ্দিন রতনের নাম উঠে এসেছে। ব্যাংকগুলোর দাবি অনুযায়ী, এই বিপুল অর্থ পরিশোধে তার পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
এই পরিস্থিতিতে ছয় হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত একাধিক মামলায় জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর ঢাকার বাড্ডা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানা পুলিশ। পরে তিনি কারাগারে ছিলেন। গত বছরের জুন মাসে তিনি জামিনে মুক্তি পান। বিশ্লেষকদের মতে, নুরজাহান গ্রুপের এই ঋণ কেলেঙ্কারি দেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বল তদারকি ব্যবস্থাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। খাতুনগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারকে ব্যবহার করে কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে ঋণ অনিয়ম চলতে পারে, তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
নুরজাহান গ্রুপকে ঘিরে ঋণ অনিয়মের অভিযোগ শুধু ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির উদ্দিন রতনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে তার দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধেও। পারিবারিকভাবে পরিচালিত এই গ্রুপের একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি ও আর্থিক অনিয়মের মামলার তথ্য উঠে এসেছে আদালত ও ব্যাংক নথিতে।
২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশান এলাকা থেকে ঋণখেলাপি মামলায় গ্রুপের আরেক পরিচালক ও জহির উদ্দিনের ভাই টিপু সুলতানকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তবে ঋণ পরিশোধ না করেই তিনি পরে কারাগার থেকে মুক্তি পান। এই ঘটনা ব্যাংকঋণ আদায়ের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।
একই পরিবারের আরেক সদস্য ফরহাদ মনোয়ারের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। জনতা ব্যাংকের ৩২৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আদালত তার বিরুদ্ধে পাঁচ মাসের আটকাদেশ জারি করেন কিন্তু আইনের সেই আদেশ কার্যকর হওয়ার আগেই তিনি বিদেশে চলে যান। ফলে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে পড়ে।
এদিকে জহির উদ্দিন রতনের স্ত্রী আসমিন মনোয়ারা, যিনি তাসমিন আহামেদ নামেও পরিচিত, সন্তানদের নিয়ে কানাডায় বসবাস করছেন বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, পরিবারের একাধিক সদস্য দেশের বাইরে অবস্থান করায় ঋণ আদায় ও আইনি প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, নুরজাহান গ্রুপের এই ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নামে ঋণখেলাপি সংক্রান্ত ২০টি মামলার পাশাপাশি চেক প্রতারণা, দুর্নীতি এবং ভেজাল খাদ্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মোট ৪৪টি মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার বিভিন্ন থানায় মোট ৬৪টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এর মধ্যে ২৮টি মামলায় সাজা হয়েছে এবং ৩৩টি মামলা এখনও বিচারাধীন। সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ঝুলে রয়েছে চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানায়, যেখানে মামলার সংখ্যা ২৭টি। কোতোয়ালি থানায় রয়েছে ২৪টি পরোয়ানা। খুলশী ও পাহাড়তলী থানায় পাঁচটি করে এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানায় তিনটি পরোয়ানা জারি রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে নুরজাহান গ্রুপের বর্তমান অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন গ্রুপটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ফ্যাক্টরি) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি। খেলাপি ঋণগুলো এখনও পরিশোধ করা যায়নি। তবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে এবং ঋণ পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
গ্রেপ্তার হওয়া দুই পরিচালক সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, খেলাপি ঋণের মামলায় আটক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ২০২৫ সালের জুন মাসে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তার ভাই ও গ্রুপের পরিচালক টিপু সুলতান ২০২৩ সালে জেল থেকে ছাড়া পান। আর পাঁচ মাসের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকা ফরহাদ মনোয়ার বর্তমানে বিদেশে রয়েছেন। তিনি কোথায় আছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি। তবে গ্রুপটি আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নুরজাহান গ্রুপের বিরুদ্ধে থাকা বিপুলসংখ্যক মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট করে তুলে ধরছে। একই সঙ্গে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া কার্যকর করতে যে ঘাটতি রয়েছে, এই ঘটনাগুলো তা আরও পরিষ্কার করে দিচ্ছে। খাতুনগঞ্জের ঋণ অনিয়মকে শুধু কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর দায় হিসেবে দেখলে বাস্তব চিত্র আড়াল হয়ে যায়।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রচার, প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক ফরিদুল আলমের মতে, এই সংকটের জন্য পুরো ব্যবস্থাই দায়ী। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকাররা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে যথাযথ অনুসন্ধান বা যাচাই-বাছাই ছাড়াই নামমাত্র কোম্পানির অনুকূলে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদন দিয়েছেন। এই কাঠামোগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো সহজে ঋণ পেয়েছে এবং পরে তা খেলাপিতে পরিণত করেছে। তার ভাষায়, যদি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শুরুতেই কঠোর যাচাই থাকত, তাহলে এত বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ তৈরি হওয়ার সুযোগ হতো না। ফলে দায় শুধু ব্যবসায়ীদের নয়, বরং পুরো ঋণ অনুমোদন ও তদারকি কাঠামোর ওপরই বর্তায়।
এই প্রসঙ্গে আরও বিস্তৃত বিশ্লেষণ তুলে ধরেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ঋণ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীও আর্থিক সুবিধা নিয়েছে। তার মতে, গত ১৫ থেকে ১৬ বছরে দেশের প্রায় সব প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন কার্যত পঙ্গু অবস্থায় রয়েছে।
ড. সাইফুল ইসলাম আরো বলেন, এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সময় প্রয়োজন ছিল কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষ করার আগেই নির্বাচনে যেতে বাধ্য হয়। শত আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও তারা অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে পারেনি। তিনি বলেন, অর্থনীতি এমনভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল এবং এতটাই ভঙ্গুর অবস্থায় রেখে যাওয়া হয়েছিল যে, সততা ও নিষ্ঠা থাকা সত্ত্বেও এবং উপদেষ্টা পরিষদে অর্থনীতি বিষয়ে তত্ত্ব ও বাস্তবতা জানা একাধিক অর্থনীতিবিদ থাকা সত্ত্বেও অর্থনীতি আর স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে পারেনি।
তার মতে, সংস্কারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় আসবে, তারা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারবে না। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান নিয়মকানুন যদি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা যেত, তাহলে এসব আর্থিক কেলেঙ্কারি প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু একটি প্রভাবশালী শ্রেণির কারণে সেই নিয়ম প্রয়োগ করা যাচ্ছে না।
ড. সাইফুল ইসলামের ভাষায়, এই শ্রেণিটি রাজনীতিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে এবং ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগায়। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান নীতিমালা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারছে না। এর ফলেই একের পর এক বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি দেশের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলছে।
নুরজাহান গ্রুপের ব্যবসার শুরু তেল আমদানি, পরিশোধন, উৎপাদন ও বাজারজাতের মাধ্যমে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই খাতে তারা কিছুটা সাফল্যও অর্জন করে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রুপটি ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে ঋণ নিয়ে অর্থ আত্মসাতের প্রবণতায় জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার উদ্দেশ্যে একের পর এক নতুন কোম্পানি খোলা হয়, যেগুলোর বড় একটি অংশ ছিল কাগুজে বা নামমাত্র প্রতিষ্ঠান।
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এসব কোম্পানির বেশির ভাগই কয়েক বছরের মধ্যে কার্যক্রম হারিয়ে ফেলে। বাস্তবে তাদের অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, মূলত ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যেই এসব অঙ্গপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছিল। এভাবে নুরজাহান গ্রুপের নামে অন্তত ২০টি কোম্পানি খোলা হয়।
এই তালিকায় রয়েছে নুরজাহান সুপার অয়েল লিমিটেড, ম্যারিন ভেজিটেবল অয়েলস লিমিটেড, জাসমির ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড, জামিয়া এডিবল অয়েল লিমিটেড, জামিয়া সুপার অয়েল লিমিটেড, জামিয়া ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড, নুরজাহান সিনথেটিক লিমিটেড, সাগরিকা বোতল অ্যান্ড প্যাকিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, তাসমিন ফ্লাওয়ার মিলস লিমিটেড, নুরজাহান স্পাইসিস লিমিটেড, নুরজাহান ব্রিকস লিমিটেড, তাসমিন প্রপার্টিজ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড, নুরজাহান ট্যাঙ্ক টার্মিনাল লিমিটেড, আহমেদ ট্রেডার্স, আরওয়াই শিপিং লাইনস লিমিটেড, নুরজাহান সিএনজি রি-ফুয়েলিং স্টেশন লিমিটেড, সুফি অ্যান্ড ব্রাদার্স ও লাহিড়ি এন্টারপ্রাইজ।
পুরোনো ব্যাংক ও আদালতের নথি বিশ্লেষণে আরও গুরুতর তথ্য উঠে এসেছে। নুরজাহান গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান জাসমির ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড জনতা ব্যাংকের লালদীঘি শাখা থেকে ১১২ কোটি ৪৭ লাখ ৬২ হাজার ৮০১ টাকা ঋণ নেয়। সময়মতো এই ঋণ পরিশোধ না করায় সুদ ও দণ্ড সুদ যুক্ত হয়ে ২০২২ সালেই মোট পাওনা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকায়। এই অর্থ আদায়ের লক্ষ্যে ওই বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি অর্থঋণ আদালত পাঁচ মাসের কারাদণ্ডাদেশ দেন।
একই সময়ের নথিতে দেখা যায়, সাউথইস্ট ব্যাংক লিমিটেডের জুবিলী রোড শাখা থেকে নুরজাহান গ্রুপের দুটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান প্রায় ২৯৭ কোটি টাকা ঋণ নেয়। অথচ এই ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তির আনুমানিক মূল্য ছিল মাত্র ৪০ কোটি টাকা। ফলে ঋণ অনুমোদন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠে।
এদিকে নুরজাহান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির আহমদ রতন মেসার্স আহমদ ট্রেডার্সের নামে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ১১৮ কোটি ৫০ লাখ ৫১ হাজার ৮৮৩ টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। এ ঘটনায় ২০২০ সালে মামলা দায়ের করা হয়। মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে, এই ঋণের বিপরীতে কোনো স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রাখা হয়নি। ফলে বাদীপক্ষ তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন করে। আদালত ২০২১ সালের ৮ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
একের পর এক নামমাত্র প্রতিষ্ঠান খুলে বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ এবং পরবর্তীতে সেই ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ার ঘটনা নুরজাহান গ্রুপকে ঘিরে গড়ে ওঠা ঋণ কেলেঙ্কারির গভীরতা স্পষ্ট করে তুলে ধরে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর তদারকি ও ঝুঁকি মূল্যায়ন ব্যবস্থার দুর্বলতাও এই ঘটনায় প্রকাশ পেয়েছে।
নুরজাহান গ্রুপের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংকের দায়ের করা মামলাগুলো পর্যালোচনা করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নথি অনুযায়ী, সাউথইস্ট ব্যাংকের চারটি মামলায় গ্রুপটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। ন্যাশনাল ব্যাংকের ছয়টি মামলায় এই অঙ্ক দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের চারটি মামলার মধ্যে তিনটির রায় হয়েছে, যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। এছাড়া জনতা ব্যাংকের দুটি মামলায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ঋণ খেলাপির তথ্য রয়েছে। সব মিলিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের মামলায় নুরজাহান গ্রুপের খেলাপি ঋণের পরিমাণ আট হাজার কোটি টাকারও বেশি।
ব্যাংকঋণ অনিয়মের পাশাপাশি বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে নুরজাহান গ্রুপের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির বিপরীতে নুরজাহান গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ম্যারিন ভেজিটেবল অয়েলস লিমিটেড অগ্রণী ব্যাংক থেকে ঋণের নামে ২৫৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। এই ঘটনায় কয়েক বছর আগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নুরজাহান গ্রুপের দুই সদস্য ও তিনজন ব্যাংক কর্মকর্তাসহ মোট পাঁচজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে। এর আগে ২০১৯ সালের ৩ এপ্রিল দুদকের সহকারী পরিচালক নিয়ামুল আহসান গাজী বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।
দুদকের তদন্তে উঠে আসে, ২০১১ সালের ১০ মার্চ ম্যারিন ভেজিটেবল অয়েলস লিমিটেড অগ্রণী ব্যাংকের চট্টগ্রামের একটি শাখায় ৩৫ হাজার মেট্রিক টন ক্রুড পামওলিন আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার আবেদন করে। আবেদন অনুযায়ী, ২০ শতাংশ মার্জিনে ১২০ দিন মেয়াদে প্রায় ৩২৭ কোটি ৪ লাখ টাকার ঋণপত্র এবং ২৬১ কোটি ৬৩ লাখ টাকার টিআর ঋণের অনুমোদন চাওয়া হয়। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংক শর্ত দেয়, নুরজাহান গ্রুপের আরেক অঙ্গপ্রতিষ্ঠান জাসমির ভেজিটেবল অয়েলস লিমিটেডের নামে অগ্রণী ব্যাংকের আছদগঞ্জ শাখায় থাকা ৮৫ কোটি ৯৭ লাখ ৭৭ হাজার ১৮ টাকার অনাদায়ী ঋণ ২০১২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।
তবে দুদকের তদন্তে পরে দেখা যায়, এই শর্ত মানা হয়নি। বরং অগ্রণী ব্যাংকের আগ্রাবাদ জাহান ভবন শাখা থেকে ২০১১ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ম্যারিন ভেজিটেবল অয়েলস লিমিটেডের অনুকূলে মোট ২৮০ কোটি ৭২ লাখ ৩৮ হাজার ৩৭৩ টাকা ঋণ ছাড় করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো শর্ত পূরণ না করেই এই অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে। এই অনিয়মের জন্য অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের আগ্রাবাদ শাখার তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক বেলায়েত হোসেনকে দায়ী করেছে দুদক।
দুদকের অনুসন্ধান সূত্রে আরও জানা যায়, ২০১১-১২ অর্থবছরে নেওয়া ওই ২৮০ কোটি ৭২ লাখ টাকার ঋণের বিপরীতে মাত্র ২২ কোটি ১৬ লাখ ২২ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। বাকি ২৫৮ কোটি ৫৬ লাখ ১৬ হাজার ৩৭৩ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়।
এই তথ্যগুলো একত্রে পর্যালোচনা করলে নুরজাহান গ্রুপকে ঘিরে ঋণ কেলেঙ্কারির ব্যাপকতা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার তদারকির দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর যোগসাজশে কীভাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ দীর্ঘদিন ধরে হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
২০২৪ সালের ১৬ জানুয়ারি চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতে নুরজাহান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির উদ্দিন রতনকে হাজির করা হয়। ছয় হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয়। ওইদিন যুগ্ম জেলা জজ মুজাহিদুর রহমানের এজলাসে রতনের পক্ষে তার আইনজীবী এবং পাওনা আদায়ে মামলা করা একাধিক ব্যাংকের আইনজীবীরা নিজ নিজ বক্তব্য উপস্থাপন করেন। শুনানি শেষে আদালত যেসব মামলার রায় ইতোমধ্যে হয়েছে, সেগুলোতে রতনকে সাজা ভোগের নির্দেশ দেন। এ আদেশের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ঋণখেলাপি মামলাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় অতিক্রম করে বিচার প্রক্রিয়া।
সেদিনের শুনানি প্রসঙ্গে অর্থঋণ আদালতের বেঞ্চ সহকারী রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে জানান, বিচারক রতনের উদ্দেশে বলেন—আদালতে তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোতে ব্যাংকগুলোর মোট দাবি প্রায় আট হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সাউথইস্ট ব্যাংকের চারটি মামলায় প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ছয়টি মামলায় প্রায় এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের চারটি মামলার মধ্যে তিনটির রায়ে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা এবং জনতা ব্যাংকের দুটি মামলায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা দাবি রয়েছে।
বিচারক আরও উল্লেখ করেন, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এসব ঋণের বিপরীতে কোনো মর্টগেজ নেই। মামলাগুলোর মধ্যে দায়ের পরিমাণের দিক থেকে রতনের দায়ই সবচেয়ে বেশি বলে আদালত পর্যবেক্ষণে উঠে আসে। এ সময় বিচারক রতনের কাছে জানতে চান, এই বিপুল অঙ্কের টাকা পরিশোধে তার কোনো বাস্তব পরিকল্পনা আছে কি না। এর জবাবে আদালতে রতন বলেন, তিনি ঋণ পরিশোধ করতে চেয়েছিলেন। তবে ব্যাংকগুলোর আচরণের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
এদিকে, ২০২৩ সালে দেশের প্রথম সারির কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নুরজাহান গ্রুপের পরিচালক ও রতনের ভাই টিপু সুলতানের কারাভোগ নিয়েও ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়। প্রতিবেদনে উঠে আসে, বিভিন্ন কারাগারে তিনি বিলাসী জীবনযাপন করছিলেন। এক চিকিৎসকের সঙ্গে লাখ টাকার চুক্তির মাধ্যমে প্রায় এক বছর তিনি কারা হাসপাতালে স্বচ্ছন্দ সময় কাটান—এমন অভিযোগও প্রকাশ পায়।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১ অক্টোবর কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই টিপু সুলতান চট্টগ্রামের ১০০ শয্যার বিভাগীয় কারা হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। শারীরিকভাবে গুরুতর অসুস্থ না থাকা সত্ত্বেও রোগী সেজে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় দীর্ঘদিন আরামদায়ক পরিবেশে কারাভোগ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব ঘটনা কারা ব্যবস্থাপনা ও প্রভাবশালী আসামিদের প্রতি বিশেষ সুবিধা প্রদানের অভিযোগকে নতুন করে সামনে আনে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব তথ্য নুরজাহান গ্রুপকে ঘিরে ঋণখেলাপি কেলেঙ্কারির পাশাপাশি বিচার ও কারা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

