৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশজুড়ে নতুন পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করার কথা থাকলেও, রাজধানী ঢাকার বাস্তবতা দ্রুত অন্য রূপ নেয়। স্বাধীনতার পর থেকে ঢাকার রাস্তা, ফুটপাত ও জনপরিসর নিয়ন্ত্রণে থাকা দখলদাররা ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর জাতি স্বপ্ন দেখেছিল—দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অনিয়মমুক্ত একটি শহর। কিন্তু সেই স্বপ্ন খুব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
৬ আগস্টের ভোরে, ঠিক আগের দিনের শূন্যতার ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র আবার সক্রিয় হয়। তারা আগের স্থানগুলো পুনরায় দখল করতে শুরু করে।
একটি বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার ফুটপাতের ভ্রাম্যমান দোকানের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ। দৈনিক গড়ে এই দোকানগুলো থেকে ২০০ টাকা করে চাঁদাবাজি হয়। হিসাব করলে প্রতি মাসে রাজধানীতে প্রায় ১৮০ থেকে ২০০ কোটি টাকার চাঁদা আদায় হয়।
কারা এই দখলদার? কেন তারা আবার সক্রিয় হলো? আর কীভাবে পুরো ব্যবস্থা পুনর্দখল করা হলো? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে মাঠে নামে আরটিএনএন টিম। রাজধানীর চারটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ঘেঁটে এক মাস ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে প্রতিবেদকরা চিহ্নিত করেছেন দখলদার চক্র এবং তাদের নেপথ্য নিয়ন্ত্রক। আজ প্রকাশিত হচ্ছে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রথম অংশ।
রাজধানীর অন্যতম বাণিজ্যিক এলাকা গুলিস্তান এখন চাঁদাবাজির জন্য পরিচিত। ফুটপাতের দোকানি, ছোট-বড় ব্যবসায়ী এবং পরিবহনশ্রমিকদের একটি বড় অংশ প্রতিদিন চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। চাঁদা দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও প্রতিকার ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, গুলিস্তানের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে একটি রাজনৈতিক বলয়।
গুলিস্তানের গোলাপশাহ মাজার, জিরো পয়েন্ট, সিটি করপোরেশন মার্কেটসংলগ্ন এলাকা, কাপ্তানবাজার, মুরগিপট্টি, ফলপট্টি ও বায়তুল মোকাররমে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এলাকাভিত্তিক চাঁদা আদায় করছে। কোথাও দৈনিক, কোথাও সাপ্তাহিক, আবার কোথাও মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা নেওয়া হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দোকান বসানোতে বাধা, হুমকি বা মারধরের অভিযোগও রয়েছে। ৫ আগস্টের পর কিছু মার্কেটে দোকান দখলের ঘটনাও ঘটেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তালতলা এলাকার ফুটপাতে দোকান বসানোকে কেন্দ্র করে মো. বাবলু নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। এ ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা রাজধানীতে প্রায় নিয়মিত।
সিটি করপোরেশন মার্কেটের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বংশাল–ফুলবাড়িয়া এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করেন ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার মামুন আহমেদ মামুন। নবাবপুরও তার নিয়ন্ত্রণে। গালিব, মনা, জুম্মন ও ডালিমসহ তার দল নিয়মিত চাঁদা আদায় করে। এসব এলাকায় দোকান বসানো তাদের অনুমতি ছাড়া সম্ভব নয়।
এক ব্যবসায়ী, নাম প্রকাশ না করার শর্তে, জানিয়েছেন, সিটি করপোরেশন মার্কেট থেকে মাসে প্রায় এক লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। ফুটপাতের দোকান থেকে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক) ও বঙ্গবাজার এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করেন ২০ নম্বর ওয়ার্ডের টিটু ও সুফিয়ান। তাদের পেছনে ওই ওয়ার্ডের একটি রাজনৈতিক দলের নেতা স্বপনের ‘শেল্টার’ রয়েছে। পরিবহন খাতেও ‘সিটি টোল’ নামে চাঁদাবাজি চালানো হয়।
গুলিস্তানকে রাজনৈতিক পরিচয়ে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। জাতীয় স্টেডিয়াম, ভাসানী স্টেডিয়াম ও আউটার স্টেডিয়াম এলাকায় নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এস এম আব্বাস ও বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত মিজানুর রহমান টিপুর হাতে। বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেট থেকে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের বন্ধন কাউন্টারের মধ্যবর্তী এলাকা একই নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে। নাট্যমঞ্চ পার্ক ও পাশের ফলপট্টি যুবদলের নামে নিয়ন্ত্রিত। দক্ষিণ গেটের ফুটপাতের প্রায় ২০০ দোকান থেকে কাদের ও খোকন চাঁদা আদায় করেন। মুক্তাঙ্গন, পল্টন মোড় ও লিংক রোড এলাকাতেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। এখানে যুবদল ইউনিটের জিয়া, শহীদ ও লুচ্চা কামালের আধিপত্য রয়েছে।
চাঁদাবাজিতে ক্ষুব্ধ হয়ে সম্প্রতি ব্যবসায়ী মজিবর হোসেন ডিএমপি কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। অভিযোগে উল্লেখ, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পরও রাজধানীতে একটি সংঘবদ্ধ চক্র চাঁদাবাজির রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছে।
গুলিস্তানের ফুটপাত, পুরান বাজার মার্কেট, গুলিস্তান শপিং কমপ্লেক্স, ফুলবাড়িয়া, বঙ্গবাজার মার্কেট ও বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি চলছে। ২০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মনির হোসেন টিটু, যুগ্ম আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান ও নুরুল হক হাদীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিটি দোকান থেকে সম্প্রতি ৮,০০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। খালি রাস্তা বা প্রশস্ত গলিতে চৌকি বসিয়ে প্রায় ২০০ অবৈধ দোকান স্থাপন করা হয়েছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মারধরের ঘটনাও ঘটেছে।
গোলাপশাহ মাজার এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেছেন, প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা দিতে হয়। না দিলে জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলতে বলে। পুলিশ এলে সবাই সরিয়ে যায়, পরে আবার ফিরে আসে।
পরিবহনশ্রমিকরা জানান, বাস ও লেগুনা থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়। দিনে একাধিকবার টাকা দিতে হয়, যার প্রভাব যাত্রী ভাড়ার ওপর পড়ে। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যায়। দলবদ্ধভাবে অবস্থান নিয়ে কিছু লোক চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, ফলে নিরাপত্তাহীনতা বেড়ে যায়। সূত্র: বিডি টুডে

