রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংকের বিদেশে মাত্র দুটি এক্সচেঞ্জ হাউস কার্যক্রম চালাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই দুই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম অনিয়ম ও দুর্নীতিতে ভরা। ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সীমাবদ্ধতা শুধু অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের কাছ থেকে অর্থ উদ্ধারেই। ফলে রেমিট্যান্স আহরণে ব্যাংকটি কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সিঙ্গাপুরের এক্সচেঞ্জ হাউসের সাবেক সিইও আবু সূজা মো. শরিফুল ইসলামের কাছে চারটি আপত্তির ভিত্তিতে প্রায় ৫৯ হাজার ৩৩০ সিঙ্গাপুরি ডলার অনাদায়ী রয়েছে। গত বছরের নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন দফা তাগাদা দিলেও তিনি অর্থ পরিশোধ করেননি। অন্যদিকে, মালয়েশিয়ার এক্সচেঞ্জ হাউসে অডিট চলাকালীন কয়েকজন কর্মকর্তা অনাদায়ী অর্থ ফেরত দেন।
সম্প্রতি বিষয়টি অগ্রণী ব্যাংকের ইন্টারনাল অডিট কমপ্লায়েন্স ডিভিশনে চিঠি মাধ্যমে জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের অগ্রণী রেমিট্যান্স হাউস এসডিএন, বিডিএইচ, মালয়েশিয়া এবং অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউস প্রাইভেট লিমিটেড, সিঙ্গাপুরের ওপর পরিচালিত নিরীক্ষায় মোট ১৪টি অর্থসংক্রান্ত আপত্তি উঠে এসেছে। এর মধ্যে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ৭টি করে আপত্তি শনাক্ত করা হয়েছে।
নিরীক্ষার এই আপত্তিগুলো ইন্টারনাল কন্ট্রোল অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স (আইসিসি) পলিসি ও প্রোসিডিউর ২০২৪ অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যস্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। তবে এখনো দেখা যায়, কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যা ব্যাংকের বিদেশি রেমিট্যান্স ব্যবসাকে প্রভাবিত করছে।
ব্যাংকের সাম্প্রতিক নিরীক্ষায় উঠে এসেছে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের এক্সচেঞ্জ হাউসের কর্মকাণ্ডে অর্থের অপব্যবহার। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এখনও দেখা যায়নি।
মালয়েশিয়ার এক্সচেঞ্জ হাউসে ৭টি নিরীক্ষা আপত্তিতে জড়িত ছিলেন সুলতান আহমেদ, খালেদ মোরশেদ রিজভী, মো. লুৎফর রহমান ও মো. ওয়ালী উল্লাহ। নিরীক্ষায় দেখা গেছে, তারা বিভিন্ন খাতে তহবিল অপব্যবহার করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে:
- পরিবারের স্থানান্তর খরচ
- সিইওর ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য জ্বালানি ও টোল খরচ
- নতুন শাখা স্থাপনের জন্য অনুসন্ধানের খরচ
- বিভিন্ন শাখা পরিদর্শনের খরচ
- কর্মীদের ট্রেইনিং খরচ
- বোর্ড মিটিংয়ের সম্মানী
মোট অনিয়মিত অর্থ ছিল ১ লাখ ২৪ হাজার ১৬৮ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত। ইতোমধ্যে অভিযুক্তদের কাছ থেকে পুরো অর্থ আদায় করা হয়েছে। এর মধ্যে সুলতান আহমেদ অডিট শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগে ২০–২৫ হাজার রিঙ্গিত এবং অডিট চলাকালীন ৪৬ হাজার ৫৪১ রিঙ্গিত জমা দিয়েছেন।
সিঙ্গাপুরের এক্সচেঞ্জ হাউসে ৭টি আপত্তিতে জড়িত ছিলেন সাবেক সিইও আবু সূজা মো. শরিফুল ইসলাম, মীর মো. বায়জীদ হোসেন, মো. মনসুর আলী এবং মো. হুমায়ুন কবীর। আপত্তিকৃত অর্থের মোট পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬ হাজার ৪০৫ সিঙ্গাপুরি ডলার। এর মধ্যে অন্যান্য কর্মীরা অর্থ ফেরত দিয়েছেন, কিন্তু আবু সূজা মো. শরিফুল ইসলামের কাছে এখনও ৫৯ হাজার ৩৩০ ডলার অনাদায়ী রয়েছে। তার কাছে পাওনা ছিল মোট ৬৭ হাজার ৬২০ ডলার; তিনি এ পর্যন্ত মাত্র ৮ হাজার ২৯০ ডলার ফেরত দিয়েছেন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এক্সচেঞ্জ হাউসের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এমন গুরুতর অনিয়মের পরও সূজা মো. শরিফুল ইসলামকে তেমন কোনো জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। তিনি এখনও ব্যাংকের ফরেন রেমিট্যান্স ডিভিশনে দায়িত্বে রয়েছেন। এ নিয়ে ব্যাংকের কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
কর্মীরা বলছেন, এ ধরনের অনিয়ম দেশ-বিদেশে ব্যাংকের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তারা অভিযোগ করেছেন, এক্সচেঞ্জ হাউসের কিছু কর্মকর্তা নিয়ম ভেঙে তহবিল তছরুপের চেষ্টা করেছেন, যা ব্যাংকের নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ব্যাংকের তহবিল পকেটে রাখার কোনো সুযোগ নেই, তবুও এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি উদ্বেগজনক।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. শামস-উল ইসলাম এক্সচেঞ্জ হাউসের এসব অনিয়ম বন্ধে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেননি। অথচ, অন্যান্য ক্ষেত্রে ১০–২০ হাজার টাকা অনিয়মে অনেক কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। বিশেষভাবে, কয়েক বছর ধরে সিঙ্গাপুরের এক্সচেঞ্জ হাউস অডিট হয়নি। বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পাঠানো অডিট টিমের মাধ্যমে দুর্নীতি ও তহবিল তছরুপের বিষয় উদঘাটন সম্ভব হয়েছে। নিরীক্ষা অনুযায়ী, সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ পেলেও এখনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
যদিও ২০২৫ সালের ৩০ জুন অগ্রণী ব্যাংক এক নির্দেশনায় জানিয়েছিল, ব্যাংকে যেকোনো রকমের জালিয়াতি বা আর্থিক অনিয়ম উদ্ঘাটিত হলে জড়িত নির্বাহী/কর্মকর্তা/কর্মচারীকে প্রাথমিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা হবে এবং ব্যাংকের চাকুরি প্রবিধানমালা-২০০৮ অনুযায়ী শান্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সিঙ্গাপুর এক্সচেঞ্জ হাউস লেনদেনের জন্য “অগ্রণী রেমিট” সফটওয়্যার ব্যবহার করে। হাউসের ৫টি শাখা চালু রয়েছে। প্রতিটি শাখার টেলার শাখা ম্যানেজারের তত্ত্বাবধানে গ্রাহকের কাছ থেকে রেমিট্যান্স গ্রহণ করে। এরপর শাখা ম্যানেজার সিইওকে হিসাব প্রদান করেন এবং সিইও সেই অর্থ বাংলাদেশে পাঠানোর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে নিরীক্ষায় ধরা পড়ে, কিছু লেনদেনে কর্মকর্তা রেমিট্যান্সের অর্থ সঠিকভাবে নথিভুক্ত করেননি। ফলে প্রধান কার্যালয়কে রেমিট্যান্স বেনিফিশিয়ারির হিসেবে টাকা ওডি করে যথাসময়ে জমা দিতে হয়েছে। কভার ফান্ডের অর্থ সঠিক সময়ে প্রেরণ না করায় ব্যাংক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। কর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও তহবিল তছরুপ দেশের মধ্যে এবং বিদেশে ব্যাংকের সুনামকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক সিইও আবু সূজা মো. শরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, “আমার বিরুদ্ধে নিরীক্ষায় যেসব আপত্তি জানানো হয়েছিল, সেগুলো নিয়ে আমি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে লিখিতভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছি। ব্যাংক বিষয়টি নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে।”
অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোর পরিচালনা মুনাফা কমার পেছনে অনিয়মের প্রভাব তেমন নেই। করোনার কারণে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে অনিয়মের তদন্ত চলবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিশ্লেষণে দেখা যায়, মুনাফার ওঠাপড়ার মূল কারণ হলো বৈশ্বিক ও স্থানীয় অর্থনৈতিক ওঠাপড়া, পরিচালন খরচ এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের পরিবর্তন। অনিয়মের বিষয়গুলো তদন্তাধীন থাকায় ভবিষ্যতে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

