সমাজের ভেতরে নীরবে যে ব্যাধিগুলো শিকড় গেড়ে বসে মানবিক শক্তিকে ক্ষয় করে, মাদক তার অন্যতম ভয়ংকর রূপ। সময়ের সঙ্গে সভ্যতা যেমন এগিয়েছে, তেমনি অপরাধও বদলেছে তার কৌশল। প্রযুক্তির উন্নতির সুযোগ নিয়ে অপরাধ চক্র এখন আরও সংগঠিত, আরও অভিযোজিত। ফলে মাদকবিরোধী অভিযান যত কঠোরই হোক, চোরাকারবারিরা নতুন পথ খুঁজে নিতে সময় নেয় না।
সম্প্রতি ফেনসিডিল নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ির পর দেশের বাজারে নতুন নামে একাধিক সিরাপের বিস্তার এই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। ফেয়ারডিল, উইন কোরেক্স, ব্রনোকফ সি, চকোপ্লাসসহ বিভিন্ন নামে কোডিনযুক্ত এসব সিরাপ ঢুকছে বাজারে। বিষয়টি শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়, বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সম্মিলিত চ্যালেঞ্জ।
একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় একাধিক কারখানায় কোডিনযুক্ত সিরাপ উৎপাদন হচ্ছে। নাম পরিবর্তন করে সেগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হচ্ছে, যাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজর এড়ানো যায়। এতে স্পষ্ট হয়, মাদক ব্যবসা একটি চলমান ও পরিবর্তনশীল অপরাধব্যবস্থা, যা পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে নতুন রূপে হাজির করতে পারে।
ফেনসিডিলের ওপর নজরদারি জোরদার হওয়ায় এর সরবরাহ কিছুটা কমলেও বিকল্প সিরাপের বাজার দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। সমস্যার মূল কোনো একটি নির্দিষ্ট মাদক নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ অবৈধ বাজারব্যবস্থা। এসব সিরাপ তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায় বলে নতুন ব্যবহারকারী তৈরির ঝুঁকিও বাড়ছে। বাস্তবতা হলো, যেখানে চাহিদা থাকে, সেখানে সরবরাহ নতুন পথ খুঁজে নিতেই পারে।
বাংলাদেশের সীমান্তভিত্তিক ভৌগোলিক বাস্তবতা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। অসংখ্য সীমান্তপথ, বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক যোগাযোগ মাদক প্রবেশের ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে শুধু কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতাও একই ইঙ্গিত দেয়। যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে মাদকবিরোধী যুদ্ধে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। মেক্সিকো সীমান্তে কঠোর নজরদারি, আধুনিক প্রযুক্তি ও শক্তিশালী গোয়েন্দা ব্যবস্থার পরও মাদক প্রবাহ পুরোপুরি ঠেকানো যায়নি। অর্থাৎ সাময়িক সাফল্য এলেও দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ চক্র নতুন কৌশলে ফিরে আসে।
এই প্রেক্ষাপটে মাদক সমস্যার সামাজিক দিকটি সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত থেকে যায়। বেকারত্ব, হতাশা, পারিবারিক ভাঙন ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অনেক মানুষকে নেশার পথে ঠেলে দেয়। সমাজে ইতিবাচক মূল্যবোধ দুর্বল হলে মাদক সহজেই জায়গা করে নেয়। তাই রাষ্ট্রীয় নীতি কেবল অপরাধ দমনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; সামাজিক শক্তি পুনর্গঠনও সমান জরুরি।
মাদক ব্যবসায়ীরা পরিকল্পিতভাবে বাজার তৈরি করে। নতুন নাম, কম দাম ও সহজলভ্যতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ব্যবহারকারী বাড়ানো হয়। সীমান্তের দুই পাশের নীতিগত দুর্বলতা ও সমন্বয়ের অভাবকে কাজে লাগায় অপরাধ চক্র। এজন্য দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় ও সমন্বিত অভিযান অপরিহার্য। পাশাপাশি প্রয়োজন জনসচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ, কারণ নীরব সহনশীলতাই অপরাধকে টিকে থাকার সুযোগ দেয়।
সব মিলিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই একটি দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা। এখানে রাষ্ট্রের সক্ষমতা, সমাজের সচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বয় জরুরি। নতুন নামে সিরাপের আগমন আবারও মনে করিয়ে দেয়, সমস্যার বাহ্যিক রূপ বদলালেও মূল সংকট থেকেই যায়। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু একটি নির্দিষ্ট মাদক নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সেই সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক পরিবেশ পরিবর্তন করা, যেখান থেকে মাদকের জন্ম হয়। ইতিহাস বলে, লক্ষণ দমন করলে রোগ ফিরে আসে; কিন্তু মূল কারণ মোকাবিলা করলেই টেকসই সমাধানের পথ তৈরি হয়।

