অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো মেয়াদ জুড়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা ছিল অস্থির ও অনিশ্চিত। অনেক বিশ্লেষক এই সময়কে ‘মব সন্ত্রাসের রাজত্ব’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে দলবদ্ধ হামলা, প্রতিশোধমূলক সহিংসতা ও আইন নিজের হাতে নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো একাধিক প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা হ্রাস পায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন এই অস্থিরতা কমানোর প্রত্যাশা তৈরি করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মব সন্ত্রাসের নামে মানুষ হত্যার ঘটনা ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ওই বছরে অন্তত ১২৮ জন গণপিটুনিতে নিহত হন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৫৭ জন, রাজশাহীতে ১৯ জন, চট্টগ্রামে ১৭ জন, খুলনায় ১৪ জন, বরিশালে ৭ জন, রংপুর ও ময়মনসিংহে ৫ জন করে এবং সিলেটে ৪ জন প্রাণ হারান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা সৃষ্টি করে। একইভাবে, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরাও গণপিটুনির শিকার হন। ৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি রাবি ছাত্রলীগের সাবেক সহকারী সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির প্রাক্তন সদস্য ছিলেন।
আসকের ২০২৫ সালের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, পুরো বছরজুড়ে মব সন্ত্রাস আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়। প্রমাণ বা আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সন্দেহ ও গুজবের ভিত্তিতে মানুষকে মারধর ও হত্যা করা হয়। ‘তওহিদি জনতা’ নামের কিছু গ্রুপ বেআইনিভাবে মব তৈরি করে শিল্প-সংস্কৃতি কেন্দ্র ভাঙচুর, বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনায় জড়িত থাকে।
মুক্তিযোদ্ধাসহ বিরোধী মতের মানুষদের নানা উপায়ে হেনস্তার অভিযোগও থাকে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয়তা এবং অপরাধীদের বিচার না করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতেও মব গঠন করে হত্যার ঘটনা ঘটে, যা আইনের শাসনের জন্য চরম হুমকি এবং সমাজে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলার ইঙ্গিত দেয়।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেশে ৭৫টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এতে ১১ জন নিহত ও অন্তত ৬১৬ জন আহত হন। ফেব্রুয়ারির প্রথম ১০ দিনে ৫৮টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ২ জন নিহত ও ৪৮৯ জন আহত হন। জানুয়ারির শেষ ১০ দিনে ৪৯টি সহিংসতায় ৪ জন নিহত ও ৪১৪ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ফেব্রুয়ারিতে সহিংসতার মাত্রা আরও বেড়ে গেছে।
আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন মানবাধিকার পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারেনি। পুরোনো নিপীড়ন-পদ্ধতির ধারাবাহিকতা নতুন আকারে অব্যাহত থাকে। জবাবদিহিতার অভাব ও বৈষম্যমূলক আচরণ মানবাধিকার পরিস্থিতিকে সার্বিকভাবে অস্থির ও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, ‘‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মব সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পায়। আইন নিজের হাতে নেওয়ার প্রবণতা সমাজে ‘নিজেই বিচার’ সংস্কৃতি তৈরি করে, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘কিছু মহল সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে মব কর্মকাণ্ডকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এর ফলে ব্যক্তিগত স্বার্থ, প্রতিপক্ষকে হেয় করা এবং সম্পদ দখলের ঘটনা বৃদ্ধি পায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যথাযথ পদক্ষেপের অভাব ও দায়িত্বহীন মন্তব্য অনেককে নীরব সমর্থন দিয়েছে।’’
ড. হক উল্লেখ করেন, ‘‘গত ১৮ মাস ধরে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ‘মব আতঙ্ক’ বিরাজ করেছে। আইন কার্যকর না হওয়ায় কিছু ব্যক্তি মবকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এটি মানবাধিকারবিরোধী ও দণ্ডনীয় অপরাধ, যা দমন করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’’
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কমিশনার নূর খান লিটন বলেন, ‘‘৫ আগস্টের পরও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। গুম বা ক্রসফায়ারের মতো ঘটনা না হলেও, মব সন্ত্রাস, মিথ্যা মামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।’’ তিনি যোগ করেন, সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা হলে মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িতদের কাছে কঠোর বার্তা যাবে এবং দেশে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।

