রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সড়কে বাস, ট্রাক, সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও টেম্পো-লেগুনা চালকদের কাছ থেকে প্রতিদিন প্রায় শতকোটি টাকা চাঁদা আদায় হচ্ছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ চাঁদাবাজি, অর্থাৎ ভয়ভীতি দেখিয়ে বা জোরপূর্বক টাকা নেওয়া হচ্ছে।
চাঁদা আদায়ে সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি, শ্রমিক সংগঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও কিছু রাজনৈতিক নেতাকর্মী জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। দেশের প্রায় ৩ হাজার স্পট থেকে প্রতিদিন এভাবে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। এসব তথ্য যুগান্তরের প্রতিনিধিদের সরাসরি প্রতিবেদনের পাশাপাশি বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পাওয়া গেছে।
এই বিষয়ে সড়ক পরিবহণ, সেতু, রেল ও নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম গত শনিবার কথা বলেন। তিনি বলেন, “আমি চাঁদাবাজি সমর্থন করি না। চাঁদা স্বেচ্ছায় নেওয়া হয়, আর চাঁদাবাজি হলো জোরপূর্বক। চাঁদাবাজি একটি ফৌজদারি অপরাধ, এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আমার মন্ত্রণালয়ের অধীনে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।” মন্ত্রী জানান, প্রয়োজন হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সমবায় মন্ত্রণালয় এবং তার মন্ত্রণালয় মিলে একটি যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন সড়কে চাঁদা আদায় করা হয় বিভিন্ন আড়ম্বরের আড়ালে। কোথাও তা টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার নামে, কোথাও পার্কিং ফি হিসেবে, আবার কোথাও পৌর টোলের সঙ্গে অতিরিক্ত জোরপূর্বক টাকা নেওয়া হয়। এমন চাঁদাবাজিতে সড়কে দায়িত্বপালন করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা এবং থানা পুলিশের কিছু অসাধু সদস্য জড়িত।
পরিবহণ চালক ও মালিকরা বছরের পর বছর ধরে এই চাঁদা দিতে বাধ্য। অভিযোগ অনুযায়ী, চাঁদাবাজির ফলে পরিবহণ ভাড়া বাড়ে, সবজি ও অন্যান্য পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। সবশেষে এই অতিরিক্ত খরচ সাধারণ মানুষকে বহন করতে হয়। সমঝোতার আড়ালে আদায়কৃত চাঁদা মধ্যবিত্তের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে। সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের এই চাঁদাবাজি থামেনি।
শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের কল্যাণের নামে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ থাকলেও বাস্তবে তা জোরপূর্বক নেওয়া হয়। এ ধরনের চাঁদার প্রায় ৯০ শতাংশ চালক-কন্ডাকটরদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আদায় করা হয়। চাহিদামাফিক টাকা না দিলে গাড়ি ভাঙচুর, মারধরসহ নানা হুমকি দেওয়া হয়। মাঠপর্যায়ে এই চাঁদার টাকা কোথায় যায় এবং কারা ভাগ পায় তা গোপন রাখা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মালিক-শ্রমিকরা জানিয়েছেন, স্বাধীনতার পর এক শ্রেণির মালিক-শ্রমিক নেতারা এই চাঁদার ওপর ভর করে জিরো থেকে হিরো বনে গেছেন। কেউ কেউ এমপি বা মন্ত্রীও হয়েছেন। সরকার বদল হলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতারা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা বজায় রেখে এই চক্রকে চলমান রাখেন। দেশের লাখ লাখ সাধারণ পরিবহণ শ্রমিকদের ঘামঝরা পরিশ্রমকে রাজনীতি ও ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। এর বিনিময়ে শ্রমিকরা ন্যায্য বেতন-ভাতা পান না।
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী নেতারা সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কঠোর আইন কার্যকর করতেও বাধা দেন। প্রতিটি রাজনৈতিক সরকার নানা কারণে এই চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। ফলে চাঁদাবাজি কার্যত বৈধতার আড়ালে চলে, সাধারণ মানুষের ওপর এর চাপই সবচেয়ে বেশি পড়ে।
গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক মতবিনিময় সভা শেষে পরিবহণ খাতের চাঁদাবাজি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহণ, সেতু, রেল ও নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, “সড়কে যেটা পরিবহণের চাঁদা বলা হয়, আমি সেটাকে চাঁদা হিসেবে দেখি না। মালিক ও শ্রমিক সমিতি তাদের কল্যাণে এটি ব্যবহার করে। এটা প্রায় অলিখিত বিধির মতো। চাঁদা হলো সেই টাকা, যা কেউ দিতে চায় না বা বাধ্য হয়ে দিতে হয়। মালিক সমিতি নির্দিষ্ট হারে টাকা তুলে মালিকদের কল্যাণে ব্যবহার করতে চায়। কতটা ব্যবহার হয়, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তারা সমঝোতার ভিত্তিতে এ কাজটি করে।” মন্ত্রীর এই মন্তব্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচনার ঝড় বইছে।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির সূত্রে জানা গেছে, দেশে সিটি বাসের সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার। এসব বাস থেকে দৈনিক গড়ে ৮০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। এর মানে, সিটি বাস থেকে প্রতিদিন মোট চাঁদা হয় প্রায় ৬৪ লাখ টাকা। একই সময়ে, দেশের দূরপাল্লার বাসের সংখ্যা ৬০ হাজারের বেশি। এসব বাস থেকে দৈনিক গড়ে ৫০০ টাকা করে চাঁদা আদায় হয়। অর্থাৎ দূরপাল্লার বাস খাত থেকে প্রতিদিন মোট চাঁদা হয় প্রায় ৩ কোটি টাকা।
রাজধানী ঢাকায় সিএনজি অটোরিকশার সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার। এ থেকে দৈনিক গড়ে ১৫০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়, অর্থাৎ প্রতিদিন ২৭ লাখ টাকা। চট্টগ্রামে ১৫ হাজার সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করে, সেখান থেকে দৈনিক গড়ে ৮০ টাকা করে চাঁদা আদায় হয়, যা দাঁড়ায় ১২ লাখ টাকা। ঢাকায় চলাচলকারী প্রায় ১০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে দৈনিক ১৫০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়, অর্থাৎ ১৫ কোটি টাকা। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে চলাচল করা ৫০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে দৈনিক ৮০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়, যা দাঁড়ায় ৪০ কোটি টাকা।
সবচেয়ে বেশি চাঁদা আদায় করা হয় ট্রাক থেকে। সারা দেশে দৈনিক চলাচলকারী ৪ লাখ ট্রাক থেকে গড়ে ১ হাজার টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়, অর্থাৎ ৪০ কোটি টাকা। এছাড়া টেম্পো, লেগুনাসহ অন্যান্য যানবাহন ৮ হাজারের বেশি। এ থেকে দৈনিক গড়ে ৮০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়, যা দাঁড়ায় ৬৪ লাখ টাকা। সব খাত মিলিয়ে প্রতিদিন পরিবহণ সেক্টর থেকে আদায় হয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, “সড়কে চাঁদা ও চাঁদাবাজি দুটোই রয়েছে। মালিক ও শ্রমিক সমিতি নামে-বেনামে চাঁদা নেওয়া হয়। হাইওয়ে পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, থানা পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থার কিছু সদস্য এই চাঁদাবাজিতে জড়িত। রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাকর্মীও এতে অংশ নেন।”
মহাসচিব জানান, “সব পরিবহণে চাঁদাবাজি হয় এমনটা বলা যাবে না। কোনোটিতে হচ্ছে, কোনোটিতে হচ্ছে না। আমাদের সমিতি সময়-সময় গড় হিসাব করে চিত্র প্রকাশ করে। তবে বেশির ভাগ পরিবহণকে একাধিক খাত থেকে চাঁদা দিতে হয়। চালকরা সব কথা প্রকাশ্যে বলতে সাহস পান না।” তিনি আরও বলেন, “ডিজিটাল ভাড়া পরিশোধ ও ক্যামেরা ভিত্তিক মামলা ব্যবস্থা চালু করলে সড়কে চাঁদাবাজি কমবে। বিগত সরকারগুলোকে আমরা বারবার জানিয়েছি, কিন্তু তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। উল্টো আমাদের সংগঠন ও সদস্যদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে।”

এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, “পরিবহণ খাত থেকে সমঝোতার নামে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে, চাঁদাবাজি নয়। তবে সরকার তথা সড়ক মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে বিষয়টি তদন্ত করা। যারা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য বের করতে পারবে, তাদের দিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটির প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত, এবং প্রমাণ পেলে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।” তিনি আরও বলেন, “বর্তমান সড়ক পরিবহণ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাই এখন তার কোনো দায় নেই। তবে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে নিকট ভবিষ্যতে তার ওপর চাঁদাবাজির দায় আসতে পারে।”
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আব্দুর রহিম বক্স দুদু বলেন, “২৪-এর ৫ আগস্টের পর থেকে শ্রমিক ফেডারেশনের নামে সরাসরি কোনো চাঁদা আদায় করা হয় না। তবে সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি এখনো চাঁদা তুলছে। শ্রমিক ফেডারেশন শ্রমিকদের কল্যাণের নামে আগে চাঁদা তুলত, এখন তা বন্ধ। কিন্তু নানা নামে, নানা খাতে চাঁদা নেওয়া এখনও বন্ধ হয়নি। পুলিশসহ বিভিন্ন খাতে পরিবহণ মালিকদের চাঁদা দিতে হচ্ছে। এটি বন্ধ হবে সেদিনই, যেদিন পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠবে।”
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, “পরিবহণ মালিক সমিতি টার্মিনালকেন্দ্রিক পরিবহণ ব্যবস্থাপনার জন্য সমঝোতা চুক্তির ভিত্তিতে কিছু টাকা আদায় করে। পরিবহণ মালিকরা তা স্বেচ্ছায় দিচ্ছেন। এই টাকা টার্মিনালকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বেতন ও অন্যান্য খরচ বহনের জন্য ব্যয় হয়। এটাকে আমরা চাঁদা বলি না, এটি একটি ব্যবস্থাপনা খরচ। সড়ক পরিবহণ মন্ত্রীও এটাকে চাঁদা হিসেবে দেখেননি।” তবে তিনি স্বীকার করেন, “পরিবহণ মালিকরা সমিতির আলোচনার ভিত্তিতে টাকা দিচ্ছেন। কিন্তু এর বাইরেও সড়কে বিভিন্ন স্থানে পরিবহণকে চাঁদা দিতে হয়। বিশেষ করে পণ্যবাহী ট্রাকগুলোর কাছ থেকে পৌরকরের সঙ্গে অতিরিক্ত টাকা জোরপূর্বক আদায় করা হচ্ছে।”
বাংলাদেশ পুলিশের অ্যাডিশনাল আইজি (হাইওয়ে পুলিশ) মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা বলেন, “মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি। গত দেড় বছরে মহাসড়কে চাঁদাবাজি নেই বললেই চলে। এরপরও কোথাও কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে এখন মহাসড়ক নয়, টার্মিনালকেন্দ্রিক কিছু চাঁদাবাজি হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে।”
চট্টগ্রাম ব্যুরোর প্রতিবেদনে জানা গেছে, জেলার পরিবহণ খাত থেকে একটি শক্তিশালী চক্র বিগত ১৬ বছরে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। শাহজাহান নামে এক পরিবহণ শ্রমিকের বায়েজিদ বোস্তামী থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারে এ তথ্য উঠে এসেছে। মামলার এজাহারে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে, কোন রুট থেকে কত টাকা চাঁদা আদায় করা হয়েছে এবং কারা তা আদায় করেছেন। যদিও মামলার পরেও চট্টগ্রামের পরিবহণ খাতে চাঁদাবাজি চলমান রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের নামে একটি সিন্ডিকেট ২০০ জনের একটি চক্র হিসেবে বাস, টেম্পো, ট্যাক্সি, মিনিবাসসহ বিভিন্ন যানবাহন থেকে চাঁদা আদায় করে। তারা লাইন পরিচালনা, প্রশাসন ম্যানেজ করা এবং শ্রমিক কল্যাণের নামে চাঁদা সংগ্রহ করে, কিন্তু এক কানিক চাঁদা শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় হয়নি।
চট্টগ্রামে বাস-মিনিবাসের ১৮টি রুটে বৈধ ও অবৈধ গাড়ির সংখ্যা ১,৯৪১টি। প্রতিটি গাড়ি থেকে দৈনিক ১৫০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। এর হিসাব অনুযায়ী, বছরে মোট ১০ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার টাকা এবং ১৬ বছরে ১৬৭ কোটি ৭০ লাখ ২৪ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরের হিউম্যান হলারের রুটেও ১৮টি রুটে ১,৮৬৬টি গাড়ি রয়েছে। প্রতিটি গাড়ি থেকে দৈনিক ২০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। বছরে তা দাঁড়ায় ১ কোটি ১১ লাখ ৯৬ হাজার টাকা এবং ১৬ বছরে ১৬৭ কোটি ৭০ লাখ ২৪ হাজার টাকা। সেখানকার ম্যাক্সিমা গাড়ি রয়েছে ২,১০০টি। প্রতিটি গাড়ি থেকে দৈনিক ৫০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। বছরে এটি দাঁড়ায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং ১৬ বছরে মোট ৬০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পণ্য পরিবহণ মালিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন জানান, “৫ আগস্টের পর থেকে চট্টগ্রামের কোথাও কোনো চাঁদা নেওয়া হয় না। মালিকরা সাংগঠনিকভাবে লাইন পরিচালনার জন্য নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে। পরিবহণ সেক্টর নেতৃত্বশূন্য থাকলে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব নয়।”
রাজশাহীতে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নামে চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মহানগরীর শিরোইল বাস টার্মিনাল এবং ভদ্রা কাউন্টার থেকে দুই সংগঠনের নেতারা এ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক মালিক ও শ্রমিক জানিয়েছেন, রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নামে বাসপ্রতি ৬২০ টাকা, আর মালিকদের সংগঠন রাজশাহী সড়ক পরিবহণ গ্রুপ বাসপ্রতি ২২০ টাকা আদায় করে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, শ্রমিক কল্যাণের নামে নেওয়া ৬২০ টাকার মধ্যে মাত্র ৩০০ টাকা ফান্ডে জমা হয়। দুর্ঘটনা ফান্ডে জমা হয় একশ টাকা, বাকি ২২০ টাকা তছরুপ করেন শ্রমিক নেতারা। রাজশাহীতে প্রবেশ করা বাইরের বাসের ২৫০ টাকার চাঁদার কোনো হিসাব রাখা হয় না।
রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম পাখি জানিয়েছেন, “চাঁদাবাজির অভিযোগ ভিত্তিহীন। বাস থেকে নেওয়া টাকা বাসের সার্ভিস, কলার বয় এবং শ্রমিক কল্যাণসহ নানা খাতে ব্যয় হয়।” খুলনায় গণপরিবহণে সমিতির নামেই চাঁদাবাজি চলছে। খুলনার সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ৪৫০–৫০০টি বাস বিভিন্ন রুটে চলাচল করে। প্রতিটি বাস নামালে মালিক সমিতিকে দিতে হয় ৩৫০–৫২০ টাকা। এর বাইরে বিভিন্ন পয়েন্ট ও রুটভিত্তিক আলাদা চাঁদা রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক মালিক জানিয়েছেন, বেনাপোল থেকে কুয়াকাটা রোডে গাড়ি নামালে বিভিন্ন সমিতির নামে কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। শুধু খুলনার সোনাডাঙ্গা কাউন্টারেই বিভিন্ন সেক্টরে চাঁদা দেওয়া লাগে ৫০০ টাকা। খুলনা থেকে বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসেও একই চিত্র দেখা যায়। পরিবহণ মালিক সমিতির সভাপতি মোকাম্মেল হোসেন জানান, “১৫ বছর আগে প্রকৃত মালিকদের বের করে দিয়ে সমিতি দখল করা হয়। এখন আমরা শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এবং কাউন্টার ভাড়া বাবদ সামান্য কিছু টাকা আদায় করি।”
সিলেটে পরিবহণ শ্রমিক সংগঠনের চাঁদাবাজি চলছেই। সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রচেষ্টা থাকলেও, কেবল নাম পরিবর্তন এবং রশিদের রঙ বদলানোর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার ‘চাঁদা বাণিজ্য’ চালু রয়েছে। মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নামে আদায় করা অর্থের বড় অংশ চলে যাচ্ছে প্রভাবশালী চক্রের পকেটে। সাধারণ চালকরা জানান, চাঁদা না দিলে গাড়ি থামিয়ে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়।
সিলেট নগরের প্রবেশমুখে অন্তত ৫টি প্রধান পয়েন্টে প্রকাশ্যে এই টাকা আদায় করা হয়। সবচেয়ে বেশি সক্রিয় সিলেট জেলা সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়ন এবং সিলেট জেলা ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপ শ্রমিক ইউনিয়ন। কদমতলী ও কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিটি দূরপাল্লার বাসকে ‘শ্রমিক কল্যাণ তহবিল’ বা ‘পরিচালনা ব্যয়’ বাবদ ৫০–১০০ টাকার রসিদ দিতে হয়।
হুমায়ুন রশীদ চত্বর ও তেমুখী বাইপাস থেকে পণ্যবাহী ট্রাক ও আন্তঃজেলা বাস থামিয়ে ২০–৫০ টাকা করে ‘লাইনম্যান খরচ’ বা ‘জিপি’ (গেট পাশ) নেওয়া হয়। সিলেট-তামাবিল রুটের পাথর ও বালুবাহী ট্রাককে ‘লোডিং-আনলোডিং’ বা ‘সিরিয়াল ফি’র নামে প্রতিটি ট্রাক থেকে ২০০–৫০০ টাকা নেওয়া হয়। রসিদে ‘শ্রমিক কল্যাণ’ লেখা থাকলেও শ্রমিকরা এর সুবিধা পান না। এর বাইরে ‘মাসিক টোকেন’ পদ্ধতিও রয়েছে। বিশেষ করে রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজি অটোরিকশা ও ছোট পিকআপগুলোকে নির্দিষ্ট সংগঠনের স্টিকার বা টোকেন ব্যবহার করতে হয়। বিনিময়ে মাসে ১,০০০–২,০০০ টাকা নির্দিষ্ট লাইনম্যানদের দিতে হয়। এই টোকেন থাকলে ট্রাফিক পুলিশের ঝক্কি কমে।
পরিবহণ সংশ্লিষ্টদের তথ্যানুযায়ী, সিলেট বিভাগজুড়ে প্রতিদিন ৫–৭ হাজার পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী যানবাহন চলাচল করে। প্রতিটি গাড়ি থেকে গড়ে ১০০ টাকা আদায় করলে দৈনিক ৫–৭ লাখ টাকা হয়। মাসে এটি দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি টাকার ওপরে। সিলেট জেলা সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়নের এক নেতা দাবি করেন, তারা কোনো চাঁদা নিচ্ছেন না। ইউনিয়নের সদস্যদের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর জন্য সামান্য ‘লেভি’ বা ‘চাঁদা’ নেওয়া হয়, যা শ্রম আইন অনুযায়ী বৈধ।
বরিশাল ব্যুরো জানায়, বরিশালের দুই বাস টার্মিনাল থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ চাঁদা আদায় অব্যাহত আছে। গণ-অভ্যুত্থান থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বিএনপি পর্যন্ত ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই দুই টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ টাকা চাঁদা আদায় হয়। এছাড়া পর্দার আড়ালে চলে নানা পদ্ধতির চাঁদাবাজি, যা বছরে কোটি টাকারও বেশি। ক্ষমতায় থাকা দলের নেতা-কর্মীর পকেটেই এই অর্থ চলে যায়।
পরিবহণ মালিক সমিতির সভাপতি জিয়াউদ্দিন সিকদার বলেন, “টার্মিনালে যারা কাজ করে, তাদের বেতন দেওয়ার জন্য মালিকরা নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দেয়। এর আয়-ব্যয়ের হিসাব সমিতির অফিসেই থাকে। যদি কেউ প্রমাণ দিতে পারে যে অবৈধভাবে এক টাকা নেওয়া হয়েছে, তবে আমি মালিক সমিতির সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করব।”
রংপুর ব্যুরো জানায়, রংপুর জেলায় মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের মাধ্যমে ছোট-বড় যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাক পরিবহণ থেকে প্রতিবছর ৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা আদায় করা হয়। প্রতিদিন যাত্রীবাহী বাস থেকে দুর্ঘটনা তহবিল ৭০ টাকা, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল ২০ টাকা, অফিস ব্যয় ৬০ টাকা, টার্মিনাল টোল ১০০ টাকা এবং প্রতিটি ট্রাক থেকে ২৫ টাকা শ্রমিক তহবিল হিসেবে নেওয়া হয়। রংপুর জেলায় প্রতিদিন প্রায় ১৩শ গাড়ি চলাচল করে। এতে দৈনিক চাঁদা দাঁড়ায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা, মাসে প্রায় ৫৮ লাখ এবং বছরে ৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
রংপুর জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি হাফিজুর রহমান জানান, “শ্রমিক ও মালামালের নিরাপত্তার জন্য ২৫ টাকা করে প্রতিটি ট্রাক থেকে নেওয়া হয়।” রংপুর মেট্রোপলিটন ট্রাফিক পুলিশের এসি সফিকুল ইসলাম বলেন, “পরিবহণ খাতে কোনো টাকা আদায় হয় কিনা, যারা আদায় করেন তারাই বলতে পারেন। আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।”
বগুড়া ব্যুরো জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম কয়েকদিন সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও বগুড়ার পরিবহণ খাতে চাঁদাবাজি এখনো চলছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মালিক ও শ্রমিক সমিতির উদ্যোগে প্রতিদিন চার লাখ টাকা চাঁদা আদায় হয়। তবে সমিতির দায়িত্বশীল নেতারা দাবি করেন, যা চাঁদা নেওয়া হয়, তার থেকে বেশি অর্থ মালিক ও শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় হয়।
বগুড়া জেলা বাস, মিনিবাস ও কোচ পরিবহণ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হামিদুল হক হিরু চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের সময় চাঁদা বেশি আদায় হতো। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সেনাবাহিনী বাসপ্রতি ১২৫ টাকা ধার্য করেছিল। এখন দিনে গড়ে ৮৮ হাজার টাকা চাঁদা নেওয়া হয়। এতে চেইন মাস্টার, টার্মিনাল ফি, শ্রমিক কল্যাণ এবং সমিতির অন্যান্য ফি অন্তর্ভুক্ত। অধিকাংশ টাকা মালিক-শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় হয়, তাই কোনো নেতার চাঁদা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে না।”
কুমিল্লা ব্যুরো জানায়, কুমিল্লায় সমঝোতার নামে নয়, মালিক-শ্রমিকদের ওপর জিম্মি করে পরিবহণ খাতে চাঁদাবাজি চলছে। জেলার সব বাসটার্মিনাল, বাসস্ট্যান্ড, যাত্রীবাহী বাস, মিনিবাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। সাধারণ মালিক ও শ্রমিকরা অভিযোগ করেছেন, সরকারদলীয় প্রভাবশালীদের শেলটারে কিছু অসাধু মালিক ও শ্রমিক নেতারা জিপির নামে এসব অর্থ আদায় করেন। সরকারের পরিবর্তন হলেও চাঁদা বন্ধ হয় না; শুধু হাতবদল হয়। মালিক সমিতির নামে নেওয়া জিপি থেকে সাধারণ মালিক ও শ্রমিকরা কোনো সুবিধা পান না।
ফারজানা পরিবহণের চালক আনিসুর রহমান বলেন, “প্রতি ট্রিপে কুমিল্লা টার্মিনাল ছাড়ার আগে ২৮০ টাকা জিপি দিতে হয়। মালিক ও শ্রমিকরা এই টাকার কোনো সুবিধা পান না।” কুমিল্লা বাস মালিক সমিতির সভাপতি কবির আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, “পরিবহণ থেকে কোনো চাঁদা নেওয়া হয় না। জিপির টাকা সার্ভিসের মেইনটেন্যান্সে খরচ হয়। তবে সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে কিছু চাঁদাবাজি হয়, যা প্রভাবশালী এবং প্রশাসনের লোকজন ভাগাভাগি করে নেন।”
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সম্প্রতি সড়ক পরিবহণ, রেল ও নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ‘সমঝোতার’ নামে চাঁদাবাজিকে কার্যত বৈধতা দিয়েছেন। তিনি বলেন, এটি অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত ও অনৈতিক। তিনি তীব্র নিন্দা ও কঠোর প্রতিবাদ জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
জুবায়ের আরও বলেন, “চাঁদাবাজি একটি ফৌজদারি অপরাধ। এটি সমাজ, অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকি। একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর বক্তব্যে যদি এমন বার্তা যায় যে অবৈধ অর্থ আদায় বা অনৈতিক সমঝোতা গ্রহণযোগ্য, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য কলঙ্ক। এতে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে, জনগণ ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থেকে বঞ্চিত হবে।
”জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানও ফেসবুকে লিখেছেন, “নবগঠিত সরকারের সড়ক পরিবহণমন্ত্রীর মাধ্যমে চাঁদাকে জাতীয়করণের ঘোষণা দেওয়া হলো কি? প্রিয় জনগণ, চাঁদার কালো থাবা থেকে বাঁচতে হলে লড়তে হবে। এই লড়াইয়ে আমরা আপনার সঙ্গে আছি, ইনশাআল্লাহ।”
দেশের বিভিন্ন জেলা ও শহরে পরিবহণ খাতের চাঁদাবাজি একটি স্থায়ী সমস্যা। সমিতি ও স্থানীয় নেতারা অর্থ আদায় করে, কিন্তু তা সাধারণ মালিক ও শ্রমিকদের কল্যাণে পৌঁছায় না। সরকারের পরিবর্তন হলেও চক্রটি স্থিতিশীল, শুধু প্রভাবশালীদের হাতবদল হয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, “সমঝোতার নামে চাঁদা বৈধ করার মতো বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা, সড়ক নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সাধারণ জনগণ ন্যায্য সুযোগ ও স্বচ্ছতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।”

