আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কড়া নজরদারি ও সীমান্তজুড়ে ধারাবাহিক অভিযানের পরও দেশে মাদক ব্যবসার গতি কমেনি। বরং দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনো প্রকাশ্যে চলছে মাদক কারবারি ও ক্রেতার লেনদেন। এর মধ্যেই বেশি লাভের আশায় কিছু কারবারি নিজেরাই মাদক উৎপাদনে নেমেছে। এতে দেশের ভেতরে মাদক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, এ ধরনের বেশির ভাগ মাদক ভেজাল উপাদান দিয়ে তৈরি হচ্ছে।
ভেজাল মদ পানে একাধিক মৃত্যুর ঘটনাও ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। প্রচলিত মাদকের বাইরে গত কয়েক মাসে দেশে ঢুকেছে নতুন ধরনের কয়েকটি মাদক। এর মধ্যে নতুন প্রজন্মের অপ্রচলিত মাদক ‘কুশ’ ও এমডিএমবির চালানসহ জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন নামে আরও কয়েকটি মাদক দেশে প্রবেশ করেছে।
এসব মাদকের চাহিদা বেশি বিত্তবানদের মধ্যে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হাতে ধরা না পড়া পর্যন্ত এসব মাদকের নাম প্রকাশ করতে চাইছে না সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আগে বিদেশ থেকে ইয়াবা, হেরোইন বা সিনথেটিক মাদক বড় চালানে আনা হতো। কিন্তু সীমান্তে নজরদারি, প্রযুক্তির ব্যবহার ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ায় এখন বড় চালান বেশি ধরা পড়ছে।
এতে ঝুঁকি ও ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ায় কারবারিরা পথ বদলাচ্ছে। নতুন পরিস্থিতিতে কিছু চক্র গোপনে স্থানীয়ভাবে ছোট ছোট ল্যাবরেটরি গড়ে তুলে মাদক উৎপাদন করছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে টঙ্গীতে একটি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভেজাল উপাদানে তৈরি ইয়াবা ও সংশ্লিষ্ট উপকরণ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে গত ৭ জানুয়ারি ভাটারা থানায় পৃথক দুটি অভিযানে ভেজাল মদের কারখানা ও উৎপাদনকারী চক্রের সন্ধান পায় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। একই দিনে রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় একটি আধুনিক ল্যাবরেটরিতে নতুন প্রজন্মের অপ্রচলিত মাদক ‘কুশ’ তৈরির বিষয়টি উদঘাটন করা হয়।
ঘটনাগুলো আলাদা হলেও উভয় ক্ষেত্রেই সংগঠিত মাদকচক্রের পরিকল্পিত কর্মকাণ্ড এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সামনে এসেছে। অন্যদিকে গত ১১ ডিসেম্বর দেশে প্রথমবারের মতো এমডিএমবির একটি চালান জব্দ করা হয়। ভেপ ই-সিগারেটের ভেতরে গোপনে এই মাদক সরবরাহ করা হতো। মালয়েশিয়া থেকে সংগ্রহ করা এই মাদকের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
যৌথ বাহিনীর দাবি, আন্তর্জাতিক চক্র অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও কুরিয়ার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নতুন প্রজন্মের সিনথেটিক মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরবরাহের কৌশল বদলে যাওয়ায় শুধু অভিযান বাড়ালেই হবে না। আইন, প্রযুক্তি ও জনস্বাস্থ্য—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বাজারে এখন কয়েক ধরনের মাদক সক্রিয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিনথেটিক মাদকের রাসায়নিক গঠন দ্রুত বদলে ফেলা হয়। এতে আইনগত তালিকাভুক্তি ও পরীক্ষাগারে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক সময় এসব মাদক ‘হারবাল’ বা ‘নিরাপদ’ নামে ছড়িয়ে দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়।
অভিযান চললেও মাদকচক্র দ্রুত কৌশল বদলাচ্ছে। সীমান্ত থেকে শুরু করে ডিজিটাল মাধ্যম পর্যন্ত সমন্বিত তৎপরতা প্রয়োজন। পাশাপাশি আইনের দ্রুত হালনাগাদ, আধুনিক পরীক্ষাগার সুবিধা, সচেতনতা বৃদ্ধি ও পুনর্বাসন—এই চার ক্ষেত্রে টেকসই অগ্রগতি জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দমনমূলক অভিযান গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা যথেষ্ট নয়। প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও সমানভাবে প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
অন্যদিকে সহজলভ্য ফেনসিডিল নামটি বেশি পরিচিত হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নজর এড়াতে কৌশল বদলেছে কারবারিরা। চাহিদার সুযোগ নিয়ে ভারত সীমান্তে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ল্যাব ও কারখানায় এটি ভিন্ন ভিন্ন নামে তৈরি হচ্ছে। পরে তা মাদক কারবারিদের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফেনসিডিল বিভিন্ন নামে দেশে ঢুকছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে এলে নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সারা দেশে পাঁচ লাখ ৭২ হাজার ৮৬৫ বোতল ও ৪১ লিটার ফেনসিডিল জব্দ করা হয়েছে। গত বছর ১১ মাসে উদ্ধার করা হয়েছে তিন লাখ ১২ হাজার ৫৫৫ বোতল ও ৮২ লিটার ফেনসিডিল।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রচলিত ফেনসিডিলের সরবরাহ কমায় উদ্ধারের পরিমাণও কমছে। তবে নাম পরিবর্তন করে আসা ফেনসিডিলের চালান বেশি ধরা পড়ছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক অভিযানে বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসা, পরিত্যক্ত গুদাম ও গ্রামাঞ্চলের নির্জন বাড়ি থেকে রাসায়নিক পদার্থ, ট্যাবলেট তৈরির যন্ত্র ও মাদক উৎপাদনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। বাইরে থেকে এসব জায়গা সাধারণ বাসা বা ছোট কারখানা মনে হলেও ভেতরে চলত অবৈধ উৎপাদন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয়ভাবে মাদক উৎপাদনের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত পাচারের ঝুঁকি কমানো। দ্বিতীয়ত কম খরচে বেশি লাভ। তৃতীয়ত দ্রুত বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করা। এ ছাড়া সিনথেটিক মাদক তৈরির কাঁচামাল অনেক সময় বৈধ শিল্প রাসায়নিক হিসেবে সহজেই পাওয়া যায়। ফলে নজরদারি এড়িয়ে উৎপাদন চালানো সহজ হয়।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা তথ্য বলছে, উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনলাইনভিত্তিক নেটওয়ার্কও সক্রিয় হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ ও গোপন সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে শহরের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের লক্ষ্য করে বাজার তৈরি করছে চক্রগুলো।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের গোয়েন্দা শাখার উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান বলেন, মাদক উৎপাদন ঠেকাতে শুধু অভিযান নয়, জনসচেতনতা ও তথ্য সহযোগিতাও প্রয়োজন। তথ্য পেলেই দ্রুত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত রয়েছে। নতুন মাদক নিয়েও কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, দেশে মাদক উৎপাদন শুরু হলে সহজলভ্যতা বাড়বে। দাম কমবে। নতুন ব্যবহারকারী তৈরি হবে। দীর্ঘমেয়াদে এতে অপরাধ বাড়বে। বাড়বে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সামাজিক অস্থিরতা। তাই দ্রুত কঠোর অভিযান চালানোর বিকল্প নেই।

