ঘরে ডাকাত পড়লে করণীয় কী হতে পারে? হ্যাঁ, সহজ এই প্রশ্নের খুব সহজ উত্তর দিয়েছেন ইরানের নারী ফুটবল দলের চার খেলোয়াড়। নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা প্রদান এবং সেই সঙ্গে সুন্দর এক জীবন কাটানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া অভিবাসন প্রলোভনের বুকে লাথি মেরে ডাকাতদের ধরিয়ে দেওয়া আগুনে পুড়তে থাকা মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি তাঁরা এখন নিচ্ছেন।
তাঁদের এই অনেকটা নীরব, অথচ বলিষ্ঠ অঙ্গীকার আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, ঘরে ডাকাতের হামলা হলে ঘর থেকে দূরে থাকা অবস্থাতেও ঘরে ফিরে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সাহসী ও যুক্তিসংগত পদক্ষেপ। কেননা সেই ঘরই তো হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে বড় আর নির্ভরশীল আশ্রয়, এমনকি ডাকাতের আগুনে তা আপাতত পুড়ে গেলেও।
অস্ট্রেলিয়ায় হয়ে গেল নারী ফুটবলের এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের চূড়ান্ত পর্যায়ের খেলা। আমাদের নারী ফুটবল দল এই টুর্নামেন্টে প্রত্যাশামাফিক ফলাফল দেখাতে পারেনি। তবে এই আলোচনার বিষয়বস্তু সেটা নয়। একই প্রতিযোগিতায় জায়গা করে নেওয়া আরেকটি দল হচ্ছে ইরান এবং আমাদের মতোই প্রায় একই রকম ফলাফল সেই দেশের নারীরাও করেছেন। তবে ভিন্ন এক কারণে আন্তর্জাতিক সংবাদের শিরোনামে দলটি জায়গা করে নেয়, যে কারণটি রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, ফুটবলের সঙ্গে নয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রতিযোগিতার সব খেলাই সাধারণত শুরু হয় প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলের দেশের জাতীয় সংগীত বাজানোর মধ্যে দিয়ে। জাতীয় সংগীত বাজতে থাকা অবস্থায় খেলোয়াড়েরা কী রকম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন, পশ্চিমের সংবাদমাধ্যম সেটাকেও নিজেদের সংকীর্ণ অবস্থান থেকে বিশ্লেষণ করে নিতে পছন্দ করে। ফলে জাতীয় সংগীত বাজার সময় পশ্চিমের দেশের খেলোয়াড়েরা অনেকটা খ্রিষ্টীয় চেতনার অনুভূতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বলে বিবেচিত ডান হাত তুলে বুকের বাঁ দিক স্পর্শ করে দাঁড়িয়ে থাকেন—এ রেওয়াজকে ধর্মীয় মৌলবাদ হিসেবে দেখা না হলেও জাতীয় সংগীত শেষ হয়ে যাওয়ার পর খেলোয়াড়দের মোনাজাত করতে দেখলে সেটা হয়ে ওঠে ধর্মীয় চেতনার প্রকাশ।
অনেকটা প্রায় একই রকমভাবে জাতীয় সংগীত বাজতে থাকা অবস্থায় কেউ কণ্ঠ না মেলালে সে রকম ‘সবজান্তা’ সাংবাদিকদের অনেকেই ধরে নেন যে এটা হচ্ছে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণার প্রকাশ। তবে এ ক্ষেত্রেও নিজেদের দেশের খেলোয়াড়দের বেলায় এ রকম মূল্যায়ন প্রযোজ্য নয়, বরং সে রকম কোনো দেশের বেলাতেই এটাকে সেভাবে দেখা হয় যে দেশকে তাঁরা সরকারের দমন-পীড়ন চলতে থাকা দেশ হিসেবে গণ্য করেন।
তবে আমি নিশ্চিত যে ‘অগ্রসর দেশ’ হিসেবে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে যারা পছন্দ করে, সে রকম অনেক দেশের সব খেলোয়াড় জাতীয় সংগীত বাজতে থাকার সময় মুখে যে কণ্ঠ মেলাচ্ছেন, তা কিন্তু সব সময় দেখা যায় না। তবে সে রকম অবস্থায় সেই খেলোয়াড়দের রাষ্ট্রদ্রোহী কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করা খেলোয়াড় হিসেবে দেখা হয় না।
অস্ট্রেলিয়ায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় খেলতে যাওয়া ইরানের নারী ফুটবল দলের কতিপয় খেলোয়াড়ের বেলাতেও ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। জাতীয় দলের বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় দেশের জাতীয় সংগীত বাজতে থাকা অবস্থায় কণ্ঠ মেলাননি বলে বিজ্ঞ সাংবাদিকেরা ধরে নিয়েছিলেন যে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই দলটি অস্ট্রেলিয়া গিয়েছে, খেলায় অংশ নিতে নয়।
আর খেলার আয়োজন যেহেতু করা হয়েছে ডাকাত সরদারের দুর্বল এক মিত্রদেশে, ফলে সেই সংবাদ ফলাও করে প্রচার করার মধ্য দিয়ে ডাকাতের কৃপার দৃষ্টি লাভ করার মোক্ষম এক সুযোগ হিসেবে দুর্বল সেই মিত্রদেশের সংবাদমাধ্যম ধরে নেয়। অন্যদিকে সেই সংবাদ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হওয়ায় অস্ট্রেলিয়ার সরকারের সামনেও নিজের বদান্যতা তুলে ধরার এক সুযোগ হিসেবে সেটা দেখা দিয়েছিল এবং সেই সূত্র ধরে অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করে বসে যে ইরানের নারী ফুটবল দলের সব সদস্যের জন্য সহজ অভিবাসন লাভের সুযোগ তারা করে দিচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার সরকার হয়তো ভেবে থাকবে যে তাদের দেশে বৈধভাবে থেকে যাওয়ার মতো এক স্বপ্নের এতটা সহজ বাস্তবায়নে প্রলুব্ধ হয়ে দলের সবাই অস্ট্রেলিয়ার সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সেই সুযোগ গ্রহণ করবেন এবং দলের সদস্যদের পশ্চিমের সংবাদমাধ্যম ইরানবিরোধী প্রচারযুদ্ধে কাজে লাগাতে সক্ষম হবে।
তবে তাদের সেই ধারণা যে পুরোটাই ছিল বায়বীয় হিসাব–নিকাশ থেকে উঠে আসা, দলের সদস্যদের সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার আনুপাতিক হার শুরুতেই তা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরলেও আমরা যারা সংবাদের গ্রাহক, সেই সত্য আমাদের সামনে তুলে না ধরে অনেকটা একপক্ষীয়ভাবে এ রকম বলা হয় যে ইরানের নারী ফুটবল দল দেশে ফিরে যেতে অস্বীকার করে অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যাচ্ছে। অবশ্য পরে আমরা জানতে পারি যে নারী ফুটবল দল নয়, বরং দলের সাতজন সদস্য সেই অভিবাসন টোপ গিলতে রাজি হয়েছেন। তবে এরপর আরও কিছু নাটকীয়তা ক্রমশ আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়, যে বিষয়টিতে যাওয়ার আগে হিসাবের মারপ্যাঁচের দিকে কিছুটা হলেও নজর দেওয়া যাক।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়া পুরুষ কিংবা নারী ফুটবল দল কম-বেশি ৩০ থেকে ৪০, কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে ৫০ সদস্য নিয়ে গঠিত। মূল ১১ খেলোয়াড়ের বাইরে আরও থাকে কম করে হলেও সমসংখ্যক রিজার্ভ, মূল দলের খেলোয়াড়েরা আঘাত পেয়ে পরবর্তী খেলায় অংশ নিতে না পারলে যাঁরা তাঁদের স্থলাভিষিক্ত হন।
এর বাইরে আরও আছে ম্যানেজার থেকে শুরু করে কোচের এক বড় লটবহর ও চিকিৎসক দল। ফলে চূড়ান্ত হিসাবে সংখ্যা দাঁড়ায় ১১ সদস্যের দলের তিন গুণ কিংবা তারও বেশি। সেই দল থেকে সাতজন শুরুতে অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যেতে সম্মত হয়েছিলেন। তাঁদের সেই রাজি হওয়ার পেছনে যে হিসাব কাজ করেছে বলে আমরা ধরে নিতে পারি, তা হচ্ছে ডাকাতের লাগিয়ে দেওয়া আগুনে পুড়তে থাকা দেশে জীবনের অনিশ্চয়তার বিপরীতে ঝামেলাহীন অভিবাসন লাভ করার মধ্য দিয়ে ‘অগ্রসর’ একটি দেশে থেকে যাওয়ার মতো বিরল এক সুযোগ অনেকটা যেন না চাইতেই হাতে পেয়ে যাওয়া। তবে তা সত্ত্বেও পুরো দল কিন্তু নয়, বরং দলের সাতজন সেই সুযোগ গ্রহণে শুরুতে রাজি হয়েছিলেন। এর পর থেকে অবশ্য ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিতে শুরু করে।
আমরা জানি, ডাকাত সরদার চাইছে ইরানকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে হলেও পদানত করতে। ফলে দেশজুড়ে তীব্র হয়ে উঠেছে দস্যু সরদার আর মিত্র চোরের বাহিনীর সম্মিলিত হামলা। সে রকম অবস্থায় তো ইরানের নারী ফুটবল দলের আরও বেশি সদস্যের অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যাওয়া সম্ভবত ছিল স্বাভাবিক। তবে তা হয়নি, বরং দলের যে সাতজন শুরুতে বলেছিলেন অস্ট্রেলিয়ায় তাঁরা থেকে যাবেন, তাঁদের মধ্য থেকে চারজন ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন যে তাঁদের সিদ্ধান্ত থেকে তাঁরা সরে এসেছেন এবং দেশে তাঁরা ফিরে যাবেন।
ফলে পশ্চিমের সংবাদমাধ্যমের হাতে এখন রয়ে গেছে হারাধনের তিন সদস্য। কে জানে দস্যু সরদার এখন হয়তো বলে বসবে—জোর করে হলেও তাঁদের রেখে দিতে হবে। শুধু তা–ই নয়, রেখে দিয়ে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য তাঁদের তৈরি করতে হবে, যেন সেই পুরস্কার হাতে নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো এক সময় দেশে ফিরে গিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার হাল তাঁরা ধরতে পারেন।
- মনজুরুল হক: জাপানপ্রবাসী শিক্ষক ও সাংবাদিক। সূত্র: প্রথম আলো

