দেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প সংকটের মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব কাঁচামাল সরবরাহে সমস্যা সৃষ্টি করেছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে, সক্ষমতার ব্যবহার কমেছে, এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
চট্টগ্রামের শিপইয়ার্ডে চলতি বছরের ১৭ মার্চ পর্যন্ত মাত্র ১৫টি স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৩৩টি। পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি ও খরচ বৃদ্ধির কারণে ইয়ার্ডগুলোর কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে চট্টগ্রামের গ্রিন শিপইয়ার্ডে কাটার জন্য সৈকতে নামানো হয়েছে ১৫টি স্ক্র্যাপ জাহাজ, যার সম্মিলিত ওজন ১ লাখ ৪০ হাজার ৮১৩.৬৮ টন। জানুয়ারি মাসে এসেছে ৮টি জাহাজ (৬৩,১২৬.৩১ টন), ফেব্রুয়ারিতে ৪টি (৩৮,১৮০.৬৫ টন), এবং মার্চের ১৭ তারিখ পর্যন্ত ৩টি (৩৯,৫০৬.৭২ টন)।
বিগত বছরের তুলনায় আমদানি অর্ধেকেরও কম হয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে মোট ৩৩টি জাহাজ আমদানি হয়েছিল (২ লাখ ২৯,৩১৩ টন), ২০২৪ সালে একই সময়ে ৩৮টি (২ লাখ ৯১,৫৬২ টন), এবং ২০২৩ সালে ৫০টি (৩ লাখ টন)। এর আগের বছরগুলোতেও আমদানি উল্লেখযোগ্য ছিল।
চলতি বছরে জাহাজ আমদানিতে হ্রাসের পেছনে গ্রিন শিপইয়ার্ড বাস্তবায়নও একটি কারণ। বর্তমানে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ১৭টি ইয়ার্ড গ্রিন শিপইয়ার্ডে রূপান্তরিত হয়েছে, আরও ছয়টি শেষ পর্যায়ে। কিছু ব্যবসায়ী আশঙ্কা করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে এবং বৈশ্বিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির কারণে আমদানি আরও কমে যাবে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীর বন্ধ থাকার প্রভাবও পড়েছে। জাহাজ ভাড়া বেড়েছে, স্ক্র্যাপের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক মাসে স্ক্র্যাপের দাম টনপ্রতি ৪–৫ হাজার টাকা বেড়েছে। বর্তমানে জাহাজের স্ক্র্যাপ টনপ্রতি ৫৯–৬০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে এক মাস আগে ছিল ৫৫ হাজার টাকা। স্ক্র্যাপ প্লেটের দাম বেড়েছে ৬৫ থেকে ৬৯–৭০ হাজার টাকায়।
বিএসবিআরএর সদস্য ও আরেফিন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী হোসাইনুন আরেফিন জানাচ্ছেন, “গ্রিন শিপইয়ার্ডে জাহাজ কাটার কাজ সম্পূর্ণ মেশিনারিজের মাধ্যমে হয়। প্রতিদিন প্রচুর জ্বালানি প্রয়োজন, কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাচ্ছি না।” তিনি আরও বলেন, যদি কোনো কারণে জাহাজ কাটতে না পারে, বড় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১১৬টি শিপইয়ার্ড রয়েছে। এর মধ্যে ১০৫টির প্রাথমিক অনুমোদন রয়েছে, ২৩টি গ্রিন শিপইয়ার্ড তালিকাভুক্ত, কিন্তু বাজেট সংকটের কারণে অধিকাংশ আধুনিকায়ন শুরু করতে পারেনি।
সংক্ষিপ্তভাবে, দেশের জাহাজ ভাঙার খাত এখন অত্যন্ত চাপের মধ্যে রয়েছে। সরবরাহ সংকট, জ্বালানি ঘাটতি এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

