আবাসন খাতে স্থবিরতা কাটাতে নতুন অর্থায়নের পথে হাঁটছে সরকার। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি)-কে এক হাজার কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি এই তহবিল করপোরেশনের ঋণ বিতরণ কার্যক্রম সচল রাখা এবং গৃহায়ন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই অর্থ ২০ বছর মেয়াদে বার্ষিক ৪ শতাংশ সুদে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিষয়টি অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলছে। এর আগে তহবিল সংকটের কথা তুলে ধরে অতিরিক্ত অর্থায়নের জন্য আবেদন করেছিল বিএইচবিএফসি।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালের আদেশ (সংশোধিত) অনুসারে করপোরেশনটির পরিশোধিত মূলধন ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১১৫ কোটি টাকা সরকার পরিশোধ করেছে। বর্তমানে ১২টি ঋণ পণ্যের মাধ্যমে বহুতল আবাসন নির্মাণে অর্থায়ন করে প্রতিষ্ঠানটি। তুলনামূলক কম সুদের কারণে এই প্রতিষ্ঠানের ঋণের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।
তবে তহবিল সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঋণ অনুমোদন দেওয়া হলেও প্রায় ৩৮৪ কোটি টাকা বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। এতে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষও তৈরি হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন তহবিল সহায়তা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বিএইচবিএফসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল মান্নান জানান, সরকারের কাছে এক হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তা চাওয়া হয়েছে এবং প্রস্তাবটি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন। তিনি বলেন, অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গৃহঋণের সুদ ১৫ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত হলেও তাদের ক্ষেত্রে ঢাকায় ১০ শতাংশ এবং দেশের অন্যান্য এলাকায় ৮ থেকে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। ফলে গ্রাহকদের আগ্রহ বেশি।
তিনি আরও বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এখন অন্যান্য ব্যাংকের সীমাবদ্ধতার কারণে বিএইচবিএফসির দিকে ঝুঁকছেন। এতে প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ বাড়ছে। নতুন এই তহবিল পেলে ঋণ বিতরণ সহজ হবে এবং আরও বেশি মানুষকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে।
বিএইচবিএফসি দীর্ঘদিন ধরে গৃহায়ন খাতে রাষ্ট্রীয় বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। ৭৩টি শাখার মাধ্যমে শহরের পাশাপাশি উপজেলা ও গ্রোথ সেন্টারেও ঋণ কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ৮ থেকে ১০ শতাংশ সুদে এবং সর্বোচ্চ ২৫ বছর মেয়াদে গৃহঋণ দিচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঋণ মঞ্জুরি ও বিতরণ বাড়লেও তহবিল ঘাটতির প্রভাব স্পষ্ট।
২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৪৬ কোটি টাকা মঞ্জুর করে ৬৯৬ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। পরের অর্থবছরে মঞ্জুরি বেড়ে ১ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা হলেও বিতরণ হয় ৯১৬ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মঞ্জুরি দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা, বিপরীতে বিতরণ হয় ৯২২ কোটি টাকা।
ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। একই সময়ে শ্রেণীকৃত ঋণের হার ৩ দশমিক ৮০ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশে নেমেছে।
তবে মুনাফার একটি অংশ ডিভিডেন্ড হিসেবে সরকারকে দেওয়ায় তহবিলের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৩ কোটি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫০ কোটি টাকা ডিভিডেন্ড দেওয়া হয়। কর পরিশোধের পর মুনাফা যথাক্রমে ১০৭ কোটি, ৯৮ কোটি এবং ৯৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে, আবাসন খাতে বাড়তে থাকা চাহিদা সামাল দিতে এবং ঋণ বিতরণ কার্যক্রম সচল রাখতে এই নতুন অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

