দেশের নির্মাণসামগ্রীর বাজারে হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। রড, সিমেন্ট, অ্যাঙ্গেল ও শিট—প্রায় সব ধরনের উপকরণের দাম গত এক থেকে দুই সপ্তাহে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এতে আগে থেকেই চাপে থাকা নির্মাণ খাতে নতুন করে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। আবাসন ব্যবসায়ী ও জমির মালিকদের মধ্যে বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দাম বাড়ার পেছনে দৃশ্যমান কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। তাদের মতে, বর্তমানে বাজারে যে পণ্য বিক্রি হচ্ছে, সেগুলোর কাঁচামাল আগেই আমদানি করা। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধকে কারণ হিসেবে দেখানোকে তারা প্রশ্নবিদ্ধ মনে করছেন। অনেকেই অভিযোগ করছেন, একটি প্রভাবশালী চক্র সমন্বিতভাবে দাম বাড়াচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অল্প সময়ের ব্যবধানে রডের দাম টনপ্রতি ছয় থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এসএস স্টিলের রড এখন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায়, যা দুই সপ্তাহ আগেও ছিল প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে।
অ্যাঙ্গেলের দামও টনপ্রতি প্রায় ১০ হাজার টাকা বেড়ে ৯২ হাজার থেকে ৯৭ হাজার টাকায় উঠেছে। একইভাবে শিটের দাম বেড়ে এখন ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সিমেন্টের বাজারেও একই প্রবণতা। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বস্তাপ্রতি দাম ১৫ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে শাহ সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে ৫৪০ থেকে ৫৫০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে।
নির্মাণসামগ্রীর এই ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে অন্যান্য উপকরণেও। ইট, বালু ও খোয়ার বিক্রি কমে গেছে। এক নম্বর ইটের দাম প্রতি হাজার ১২ হাজার টাকায় উঠেছে, যা দুই সপ্তাহ আগে ছিল ১১ হাজার টাকা। দুই নম্বর ইট বিক্রি হচ্ছে ৯ হাজার ৫০০ থেকে ১০ হাজার টাকায়। প্লাস্টার বালু প্রতি গাড়ি ৩ হাজার ৫০০ টাকা, ভিটি বালু ৩ হাজার টাকা এবং সিলেটের লাল বালু প্রতি বস্তা ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিক্রিতে। ব্যবসায়ীরা জানান, গত দুই সপ্তাহ ধরে ক্রেতারা অনেকটাই কেনাকাটা বন্ধ রেখেছেন। বড় ডেভেলপারদের পাশাপাশি ছোট নির্মাণকাজ করা সাধারণ মানুষও অপেক্ষার অবস্থানে রয়েছেন। এতে বাজারে লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
চট্টগ্রামের পটিয়ার এক ব্যবসায়ী জানান, এক মাস আগে যে রড ৭৮ হাজার টাকায় বিক্রি হতো, সেটি এখন ৯৩ হাজার টাকায় উঠেছে। অন্য একটি পণ্যের দাম ৮০ হাজার থেকে বেড়ে ৯৫-৯৬ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
বাজারের খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তারা বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। উৎপাদনকারীরা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির প্রভাবের কথা বললেও, ব্যবসায়ীদের দাবি—কাঁচামাল আগেই আমদানি হওয়ায় এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
অন্যদিকে আবাসন খাতের উদ্যোক্তারাও মনে করছেন, হঠাৎ এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে স্বাভাবিক বাজার প্রভাবের চেয়ে অন্য কোনো উদ্দেশ্য কাজ করছে। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, একটি গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বাজার অস্থির করছে।
উৎপাদনকারীদের একাংশ বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি ডিজেলের সংকট, গ্যাসের ঘাটতি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ট্রাক সংকটের কারণে সরবরাহেও বিলম্ব হচ্ছে, যার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ছে।
আবাসন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাজারে কঠোর নজরদারি জরুরি। তাদের মতে, নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়লে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আবাসন খাতে। এতে মধ্যবিত্তের নিজস্ব বাসস্থানের স্বপ্ন আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

