বাংলাদেশে ব্যবহৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ৭১ শতাংশ আসে দেশীয় উৎস থেকে। বাকি ২৯ শতাংশ আমদানি করা হয়। এই মুহূর্তে মজুত ও পাইপলাইনে থাকা এলএনজি নিয়ে বিশেষ কোনো সমস্যা নেই, তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশ্লিষ্টরা শঙ্কা প্রকাশ করছেন।
বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির বড় অংশীদার মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার। চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘর্ষ, এলএনজি সরবরাহে ঝুঁকি তৈরি করেছে। গত দু’দিনে ইরানের প্রধান গ্যাসক্ষেত্র সাউথ পার্স-এ ইসরায়েলের হামলা হয়েছে।
এই গ্যাসক্ষেত্র থেকে ইরানের মোট গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে। ইরান অভ্যন্তরীণ চাহিদার ৯০ শতাংশ গ্যাস সাউথ পার্স থেকে পায়।
ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি-তে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে রাস লাফান গ্যাসক্ষেত্রের ওপর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশ্বে এলএনজি সরবরাহের ২০ শতাংশ আসে এই গ্যাসক্ষেত্র থেকে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক ও প্রকৌশলী মানজারে খোরশেদ আলম বলেন, “রাস লাফান বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্র। এখন হামলার পর উৎপাদন কখন শুরু হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বাংলাদেশের জন্য এখন বিকল্প উৎস খুঁজে বের করা জরুরি।
গ্যাস ছাড়া বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদন ব্যাহত হবে। বিদ্যুৎ না হলে শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর সার না থাকলে কৃষি উৎপাদন ধ্বংসের পথে যাবে। তাই গ্যাস সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
বাংলাদেশ যে ২৯ শতাংশ এলএনজি আমদানি করে, তার ৬৫-৭০ শতাংশ আসে কাতার থেকে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইন) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম জানান, “বর্তমান মজুত ও পাইপলাইন থেকে আগামী এক মাস পর্যন্ত এলএনজি নিয়ে কোনো বিশেষ চিন্তা নেই। কাতার থেকে না পেলে আমরা স্পট মার্কেট এবং অন্যান্য দেশের এলএনজি সংগ্রহ করবো। আমেরিকা ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, অ্যাঙ্গোলা ও নাইজেরিয়া থেকে এলএনজি আনার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।”
বৈশ্বিক জ্বালানি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলার জানায়, বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি কাতার থেকে ৭০ শতাংশ। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় কাতারের রাস লাফান থেকে বোঝাই করা ৬২ হাজার টন এলএনজিবাহী ট্যাংকার ‘লিব্রেথা’ পারস্য সাগরে আটকা পড়েছে।
আরপিজিসিএল (রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে এলএনজি আমদানি হয়েছে ৫৮ লাখ ৮ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ৫১ লাখ ৩৭ হাজার মেট্রিক টন।
জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে কাতার থেকে ২৪ লাখ ৬০ হাজার টন এবং ওমান থেকে ৮ লাখ ৬ হাজার টন এলএনজি আনা হয়েছে। একই সময়ে ২৪ লাখ ৯০ হাজার টন এলএনজি স্পট মার্কেট থেকে আমদানি করা হয়েছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে ২৫ লাখ ৮৬ হাজার টন এলএনজি আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে কাতার থেকে এসেছে ১৬ লাখ ৫২ হাজার টন, যা মোট আমদানির ৬৪ শতাংশ। স্পট মার্কেটে আমেরিকা থেকে এসেছে ৪ লাখ ৩৬ হাজার টন।
২০২৫ সালের জুন মাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার: বিদ্যুৎ কেন্দ্র ৫৭.৯৯%, সার কারখানা ৬.৩০%, শিল্পে ১৮.৯১%, বাণিজ্যিক গ্রাহক ০.৬৩%, চা-বাগান ০.১২%, সিএনজি ৫.১৯%, গৃহস্থালি গ্রাহক ১০.৮৭%।
বর্তমানে মহেশখালী এফএসআরইউতে এলএনজি মজুত নিয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। তবে একটি ঊর্ধ্বতন আরপিজিসিএল কর্মকর্তা জানায়, “যে সব ট্যাংকার আসে, সেগুলো থেকে এলএনজি মহেশখালীতে দুটি এফএসআরইউ-তে নেয়া হয়, প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপান্তর করে গ্রিড লাইনে সরবরাহ করা হয়। বর্তমান মজুত এবং স্পট মার্কেট থেকে কেনা গ্যাস দিয়ে আগামী ২০ এপ্রিল পর্যন্ত চলা সম্ভব।”
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ১ মার্চ থেকে ১৯ মার্চ পর্যন্ত মহেশখালী এফএসআরইউতে এলএনজির পাঁচটি জাহাজ এসেছে। ২০ মার্চ আরও একটি আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া থেকে ৭৪ হাজার টন এলএনজি নিয়ে আসা ‘প্রাচি’ ট্যাংকার খালাস চলছে। এছাড়া অ্যাঙ্গোলা থেকে ৭০ হাজার টন এলএনজি নিয়ে আসা ‘সোনাগুল ব্যাঙ্গোলা’ আজ (২০ মার্চ) বার্থিং করবে।
বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৯০টির বেশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার প্রায় ৫৩ শতাংশ। গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশে গড়ে দৈনিক দুই থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ১৬ মার্চ, দৈনিক ২৫২৫ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে ৮০৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে।
ইউরিয়া সার উৎপাদনে ব্যবহার হয় প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশে ছয়টি বড় সার কারখানা রয়েছে: ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার, শাহজালাল ফার্টিলাইজার, যমুনা ফার্টিলাইজার, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার, আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার এবং কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার (কাফকো)। বর্তমানে শুধুমাত্র সিলেটের শাহজালাল ফার্টিলাইজার চালু আছে।
সরকারের উদ্যোগে সামনের বোরো মৌসুমে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সার আমদানিতেও জোর দেওয়া হচ্ছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ছয় সার কারখানায় ৩২৯ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে মাত্র ৫৬.৯ মিলিয়ন ঘনফুট।
বাংলাদেশের এলএনজি খাত বর্তমানে আপাতত স্থিতিশীল হলেও মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে সংকটের সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ঝুঁকি বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

