ঈদ সামনে রেখে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থের প্রবাহ বেড়েছে। পরিবারের বাড়তি খরচ মেটাতে তারা বেশি করে টাকা পাঠাচ্ছেন।
এর প্রভাব পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। চলতি মাসের প্রথম দুই সপ্তাহেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে, যা রিজার্ভকে শক্ত অবস্থানে নিতে সহায়তা করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৬ মার্চ পর্যন্ত দেশের মোট (গ্রোস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে রিজার্ভের পরিমাণ ২৯ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার।
এক বছর আগে, গত বছরের মার্চে মোট রিজার্ভ ছিল ২৫ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার। বিপিএম-৬ হিসাবে তা ছিল ২০ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। সেই হিসেবে এক বছরে রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার।
তবে মোট রিজার্ভের পুরোটা ব্যবহারযোগ্য নয়। স্বল্পমেয়াদি দায় ও অন্যান্য বাধ্যবাধকতা বাদ দিলে যে নিট রিজার্ভ থাকে, সেটিই অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অভ্যন্তরীণভাবে ‘ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ’ হিসাব করে থাকে, যদিও এই তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয় না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার। প্রতি মাসে গড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় ধরা হলে, এই রিজার্ভ দিয়ে প্রায় পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। সাধারণভাবে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ রিজার্ভকে নিরাপদ ধরা হয়।
অতীতে রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হলে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ১৪ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল। তখন বৈদেশিক ঋণ ও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার সংগ্রহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি কমিয়ে দেন। একই সঙ্গে হুন্ডি ও অর্থপাচার ঠেকাতে এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা জোরদারে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
বিভিন্ন উৎস থেকে ডলার সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়। এর ফলে রিজার্ভ ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। তবে আগের দায় পরিশোধের চাপ থাকায় বর্তমানে রিজার্ভ ৩৩ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, ঈদ উপলক্ষে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বেড়েছে। বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে। এর ফলে রিজার্ভও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ডলারের দর অতিরিক্ত কমে গেলে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালের আগস্টে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, যা ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। সে সময় প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকা ২০ পয়সা। পরে ঋণসংক্রান্ত অনিয়ম ও অর্থপাচারসহ নানা কারণে রিজার্ভে চাপ তৈরি হয় এবং তা কমতে থাকে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় রিজার্ভ নেমে আসে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে। আইএমএফের হিসাবে তখন তা ছিল ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ডলারের দাম ১২০ টাকার ওপরে উঠে যায়, যা আগের তুলনায় প্রায় ৩৬ টাকা বেশি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আমদানিতে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার ডলারের বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়। পাশাপাশি প্রবাসী আয় বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। আমদানির বিধিনিষেধও ধাপে ধাপে শিথিল করা হয়। এর ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে শুরু করে।
চলতি মার্চের প্রথম ১৪ দিনেই দেশে এসেছে ২২০ কোটি ডলারের প্রবাসী আয়, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে এসেছে ৩০২ কোটি ডলার, জানুয়ারিতে ৩১৭ কোটি এবং ডিসেম্বরে ৩২২ কোটি ডলার।
প্রবাসী আয় বাড়ায় বাজার থেকে ডলার সংগ্রহ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো থেকে সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে রিজার্ভ আবারও শক্ত অবস্থানে ফিরছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় ধরনের নতুন বিনিয়োগ না থাকায় আমদানির চাপ তুলনামূলক কম ছিল, যা রিজার্ভ বাড়তে সহায়তা করেছে। তবে সামনে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে বিনিয়োগ বাড়তে পারে। এতে মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি বাড়বে, ফলে ডলারের চাহিদাও বাড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে এবং নতুন বিনিয়োগ থেকে রপ্তানি আয় বাড়লে ভবিষ্যতে ডলার সংকট বড় আকার নেবে না।

