মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই অনিশ্চয়তা বাড়ছে দেশের প্রবাসী আয়ের প্রবাহ নিয়ে! কারণ, বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশ আসে উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ থেকে। যদিও এখনো পর্যন্ত প্রবাসী আয়ের প্রবাহ পুরোপুরি ব্যাহত হয়নি, তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, তেলসমৃদ্ধ ছয়টি উপসাগরীয় দেশ—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইন ও কুয়েত—থেকেই দেশের সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় আসে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) মোট রেমিট্যান্সের ৪৫ শতাংশ এই দেশগুলো থেকে এসেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ শতাংশে। যদিও করোনাকালে এই হার ৬০ শতাংশে পৌঁছেছিল, এরপর থেকে তা ধীরে ধীরে কমেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশে মোট ৮৬৭ কোটি মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৮০ কোটি ডলার এসেছে শুধু এই ছয়টি দেশ থেকে, যা মোট আয়ের ৪৭ শতাংশ।
দেশভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি অর্থ এসেছে সৌদি আরব থেকে—১৩১ কোটি ডলার। এরপর রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যেখান থেকে এসেছে ১১৮ কোটি ডলার। এছাড়া ওমান থেকে ৫১ কোটি, কাতার থেকে ৪২ কোটি, কুয়েত থেকে ৪৪ কোটি এবং বাহরাইন থেকে ২৩ কোটি ডলার প্রবাসী আয় দেশে প্রবাহিত হয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো থেকে। মোট আয়ের ১৯ দশমিক ৬১ শতাংশ বা প্রায় ১৭০ কোটি ডলার এসেছে এই অঞ্চল থেকে। এছাড়া এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে এসেছে ১৫ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ। বাকি প্রায় ১০ শতাংশ প্রবাসী আয় বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে এসেছে।
প্রবাসী আয়ের বড় উৎস হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থানের পেছনে প্রধান কারণ হলো এই অঞ্চলে বাংলাদেশি শ্রমিকের উচ্চ উপস্থিতি। গত বছর প্রায় ১১ লাখ ১৬ হাজার শ্রমিক বিদেশে গেছেন, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি—৭ লাখ ৪৩ হাজার—গেছেন সৌদি আরবে। এছাড়া কাতারে ১ লাখ ৭ হাজার, কুয়েতে ৪০ হাজার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৩ হাজার শ্রমিক কাজের জন্য গেছেন।
বর্তমানে উপসাগরীয় ছয় দেশে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। সৌদি আরবে প্রায় ২০ লাখ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১০ লাখ, ওমানে ৭ লাখ, কাতারে ৪ লাখ ৫০ হাজার, বাহরাইনে ১ লাখ ৫০ হাজার এবং কুয়েতে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশি কর্মরত আছেন।
এদিকে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনায় হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এ পর্যন্ত এই সংঘাতে পাঁচজন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
তবে যুদ্ধের মধ্যেও ঈদকে ঘিরে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কিছুটা ইতিবাচক ছিল। চলতি মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে দেশে এসেছে প্রায় ২২০ কোটি ডলার, যার মধ্যে দ্বিতীয় সপ্তাহেই এসেছে ১১৩ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। সংঘাত দ্রুত শেষ হলে প্রভাব সীমিত থাকবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ চললে রেমিট্যান্স কমে গিয়ে দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

