দেশে ভোজ্যতেলের বড় অংশই এখনো আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এতে প্রতি বছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। এই নির্ভরতা কমাতে দীর্ঘদিন ধরেই বিকল্প পথ খোঁজা হচ্ছে। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে খুলনা বিভাগের লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখী চাষ বাড়ানোর চেষ্টা ইতোমধ্যে আশার আলো দেখাচ্ছে।
বাংলাদেশে সরিষা, ধানের কুঁড়া, সয়াবিন ও সূর্যমুখী এই চার ধরনের ভোজ্যতেল বেশি ব্যবহৃত হয়। উৎপাদন বাড়াতে সরকার সব ক্ষেত্রেই উদ্যোগ নিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় খুলনাঞ্চলের পতিত জমিতে সরকারি সহায়তায় সূর্যমুখীর আবাদ বাড়ানো হচ্ছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে সূর্যমুখী তেল আমদানি হয়েছে ১৪ হাজার ৪০৬ টন। বিপরীতে স্থানীয় উৎপাদন বছরে গড়ে ১০ থেকে ১২ হাজার টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘পার্টনার’ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের সূর্যমুখী চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় দেওয়া হচ্ছে বীজ, সার, কীটনাশক এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ। এতে আগে বছরের পর বছর পতিত থাকা লবণাক্ত জমিতেও এখন সূর্যমুখীর আবাদ শুরু হয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নড়াইল, সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট—এই চার জেলার প্রায় ৫৭ শতাংশ জমি লবণাক্ত। আমন ধান কাটার পর খরিপ-১ মৌসুমে প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। এই জমিকে চাষের আওতায় আনতেই সূর্যমুখীকে সম্ভাবনাময় ফসল হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।

লবণাক্ততা এ অঞ্চলের প্রধান সমস্যা। সাধারণত ৮ ডিএস পার মিটার লবণাক্ততা হলে জমি চাষের জন্য অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তবে সূর্যমুখী ১৫ ডিএস পার মিটার পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। এ কারণেই কৃষি কর্মকর্তারা এটিকে উপকূলের জন্য উপযোগী ফসল হিসেবে দেখছেন। প্রথমদিকে কৃষকদের আগ্রহ কম থাকায় ক্যান্টনমেন্ট ও পুলিশ লাইন্সের মতো এলাকায় পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করা হয়। ভালো ফলন দেখে এখন সাধারণ কৃষকদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে জানান ফুলতলা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আরিফ হোসেন।
নড়াইল সদর উপজেলার চাঁচড়া গ্রামের কৃষক কামরুল ইসলাম জানান, আগে আমন ধান কাটার পর তার জমি ফাঁকা পড়ে থাকত। লবণাক্ততার কারণে কিছু আবাদ করার সাহস পেতেন না। এবার কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে সূর্যমুখী চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছেন, যা তাকে বিস্মিত করেছে। খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল ও বাগেরহাটের বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ জমিতে হলুদ সূর্যমুখী ফুলের সমারোহ। দূর থেকে মনে হয় যেন হলুদ গালিচা বিছানো। কাছ থেকে দেখা যায়, বাতাসে দুলছে হাজারো ফুল। স্থানীয়দের মতে, আগে কয়েক মাস পতিত থাকা জমিতে এখন বারি সূর্যমুখী-৩ জাতের আবাদ হচ্ছে। এটি শুধু জমির ব্যবহার বাড়াচ্ছে না, গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত এসব জমি সাধারণত অনাবাদি থাকে। সেখানে সূর্যমুখী চাষে এক একর জমিতে খরচ হয় প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা। বিপরীতে লাভ হতে পারে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। কোথাও কোথাও একটি বীজের চাকতির ওজন এক কেজির বেশি পাওয়া যাচ্ছে। চলতি বছরে ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগের ফলে একদিকে যেমন অনাবাদি জমি কমবে, অন্যদিকে ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
খুলনার ফুলতলার আলকা গ্রামে দুই একর জমিতে ছয়জন কৃষক একসঙ্গে সূর্যমুখী চাষ করেছেন। কৃষক রেজাউল করিম বলেন, এটি তার প্রথম অভিজ্ঞতা। ফলন ভালো হলে ধানের তুলনায় দ্বিগুণ লাভের আশা করছেন। তার মতে, এই ফসলে সেচের পানির প্রয়োজনও কম। একই গ্রামের আনিছুর রহমান জানান, এলাকায় আগে এমন ফসল দেখা যায়নি। তাই আগ্রহ নিয়ে তিনিও এক বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছেন।
বাগেরহাটের মোল্লারহাট উপজেলার আটজুড়ী ইউনিয়নেও একই চিত্র। সেখানে কয়েকজন কৃষক দুই একর জমিতে সূর্যমুখী চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছেন। একটি ফুলের পরিধি ১৫ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়েছে এবং এক কেজির বেশি বীজ পাওয়া গেছে, যা চাষিদের জন্য লাভজনক বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কৃষি বিভাগ বলছে, এ বছরই প্রথমবারের মতো অনেক কৃষক সূর্যমুখী চাষে যুক্ত হয়েছেন। সফলতা অব্যাহত থাকলে আগামীতে এ চাষ আরও বিস্তৃত হবে।
খরচ কম, লাভ বেশি—এই হিসাবেই এখন উপকূলীয় অঞ্চলে সূর্যমুখী চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা। কৃষি কর্মকর্তাদের হিসাবে, বারি-৩ জাতের সূর্যমুখী চাষে এক বিঘা জমিতে বীজ বাবদ প্রায় চার হাজার টাকা লাগে। অন্যান্য খরচসহ মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার মধ্যে।
ফলন ভালো হলে বিঘাপ্রতি সাড়ে ৭ থেকে ৮ মণ পর্যন্ত বীজ পাওয়া যায়। প্রতি কেজি বীজ থেকে অন্তত ৪০০ গ্রাম তেল উৎপাদন সম্ভব। সে হিসাবে এক বিঘায় প্রায় ১৩০ লিটার তেল মিলতে পারে। বাজারদর কেজিপ্রতি ২৫০ টাকা ধরলে এর মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩২ হাজার টাকা। এর সঙ্গে খৈল ও গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের বাড়তি সুবিধা থাকায় আর্থিক লাভ আরও বাড়ে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নড়াইল, সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট এই চার জেলায় গঠিত খুলনা অঞ্চলের প্রায় ৫৭ শতাংশ জমি লবণাক্ত। আমন ধান কাটার পর খরিপ-১ মৌসুমে প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, সাধারণত ৮ ডিএস পার মিটার লবণাক্ততাকে চাষের জন্য অনুপযোগী ধরা হলেও সূর্যমুখী ১৫ ডিএস পর্যন্ত সহ্য করতে পারে। ফলে এটি এ অঞ্চলের জন্য সম্ভাবনাময় ফসল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সূর্যমুখীর আরেকটি বড় সুবিধা হলো এর স্বল্প জীবনকাল। মাত্র ৮৫ থেকে ১০৫ দিনের মধ্যে ফসল তোলা যায়। ফলে আমন ও বোরো ধানের মাঝামাঝি সময়ে এই ফসল আবাদ করা সম্ভব। পরে একই জমিতে পাট, তিল, মুগডালসহ অন্যান্য ফসল চাষ করা যায়।
‘পার্টনার’ প্রকল্পের সিনিয়র মনিটরিং অফিসার মো. মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, উপকূলের লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ বাড়াতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে অনাবাদি জমি কমবে এবং ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা হ্রাস পাবে। তিনি জানান, বর্তমানে দেশে ভোজ্যতেলের মাত্র ১৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়, বাকি ৮৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। বছরে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার তেল আমদানির চাপ কমাতে সূর্যমুখী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তার মতে, পতিত জমি, পুকুরের পাড়, ক্ষেতের আইল ও বাড়ির আঙিনাসহ উঁচু প্রায় সব জায়গায় সূর্যমুখী চাষ করা সম্ভব। সঠিকভাবে আবাদ বাড়ানো গেলে দেশের তেলের চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানীয়ভাবে পূরণ করা সম্ভব হবে। কৃষি কর্মকর্তারা আরও জানান, সূর্যমুখী চাষ জমির উর্বরতাও বাড়ায়। ধানের শিকড় যেখানে ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি গভীরে থাকে, সেখানে সূর্যমুখীর শিকড় প্রায় ১৫ ইঞ্চি পর্যন্ত প্রবেশ করে। ফলে এটি কম সেচেও টিকে থাকে এবং মাটির গুণাগুণ উন্নত করে। গাছের পাতা পড়ে প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজ করে, যা পরবর্তী ফসলের জন্য উপকারী।
সরকারি সহায়তার অংশ হিসেবে কৃষকদের এক বিঘা জমির জন্য এক কেজি বীজ ও প্রয়োজনীয় সার সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে সরকারের ব্যয় প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা হলেও ওই জমি থেকে ন্যূনতম ২৬ হাজার টাকার ফসল পাওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
এ পর্যন্ত ১০ হাজার ৩৫০ জন কৃষককে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। ‘পার্টনার’ প্রকল্পের আওতায় ৪০টি ব্লকে দুই একর করে জমিতে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হচ্ছে। পাশাপাশি ৩০টি উপজেলায় আটটি তেল নিষ্কাশন মেশিন দেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, আমন কাটার পর পতিত থাকা জমি ধীরে ধীরে আবাদে আনা গেলে শুধু সূর্যমুখী নয়, মুগডাল ও সবুজ সারজাতীয় ফসলের উৎপাদনও বাড়বে। একজন কৃষক যদি প্রায় ১০০ কেজি সূর্যমুখীর বীজ পান, তাহলে সেই তেল দিয়েই একটি পরিবারের সারা বছরের চাহিদা পূরণ সম্ভব।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় অঞ্চলে সূর্যমুখী চাষ একটি টেকসই সমাধান হতে পারে। উৎপাদন বাড়লে একদিকে যেমন তেলের দাম কমবে, অন্যদিকে এটি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেও আসবে।

