বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা জোরদারে এবার স্পষ্ট ও সময়সীমা নির্ধারিত পরিকল্পনা দেখতে চায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে এ সংক্রান্ত একটি লিখিত রোডম্যাপ জমা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।
গতকাল বুধবার (২৫ মার্চ) বাংলাদেশ সফররত আইএমএফের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে দেশের আর্থিক খাতের চলমান সংস্কার, সামষ্টিক অর্থনীতির পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন।
আলোচনায় বাংলাদেশের আর্থিক খাত সংস্কারে অগ্রগতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও, আইএমএফ মনে করছে এই প্রক্রিয়াকে আরও কাঠামোবদ্ধ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ জরুরি। এ কারণে সংস্থাটি পুরো পরিকল্পনাটি লিখিত আকারে জমা দিতে বলেছে।
আইএমএফের মতে, একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকলে তা সংস্কার কার্যক্রমে দিকনির্দেশনা দেবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি বাড়বে এবং ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।
বৈঠকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতিও ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। বিশেষ করে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা আনতে সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো কার্যকর বলে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র ও পরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানান, ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামী এপ্রিলে আইএমএফের স্প্রিং মিটিংয়ের পর নেওয়া হবে। এর আগে একটি রিভিউ মিশন বাংলাদেশে এসে সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা ও সংস্কারের অগ্রগতি মূল্যায়ন করবে। সেই পর্যালোচনার ভিত্তিতেই পরবর্তী অর্থ ছাড়ের সিদ্ধান্ত হবে।
আগামী ১৩ থেকে ১৮ এপ্রিল ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এতে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেবে। এ দলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ও অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ সংশ্লিষ্টরা থাকার কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের জুনে ৮০ কোটি ডলার বাড়িয়ে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৫০ কোটি ডলারে। এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলার। বাকি রয়েছে ১৮৬ কোটি ডলার। গত ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তি পাওয়ার কথা থাকলেও তা পাওয়া যায়নি।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অর্থনৈতিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক এই সফরকে একদিকে সৌজন্য সাক্ষাৎ, অন্যদিকে কারিগরি আলোচনার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, আইএমএফের ইতিবাচক মূল্যায়ন বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক। তবে পরবর্তী ঋণ কিস্তি পেতে হলে সংস্কারের গতি ধরে রাখা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

