বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একাধিক চাপের মুখে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা আগামী সময়ে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বৈশ্বিক উত্তেজনা ও জ্বালানি বাজারের ঝুঁকি
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা বাড়ার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তীব্র হয়েছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
এদিকে কাতারে এলএনজি উৎপাদনে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তিতে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। এর প্রভাবে ইতালি, বেলজিয়াম, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের মতো দেশে গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে তেলের দাম বাড়তে পারে। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে পরিবহন ব্যয় ও নিত্যপণ্যের দামে।
দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে চাপ
দেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে সাম্প্রতিক সময়ে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনের খবর পাওয়া গেছে। অনেক চালক প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। পাম্প মালিকরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তবে সরকারের দাবি, দেশে জ্বালানির ঘাটতি নেই। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, অস্বাভাবিকভাবে তেল কেনার প্রবণতা বাড়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত মজুত করার প্রবণতার কারণেই কিছু পাম্পে আগেভাগে তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি অপ্রয়োজনীয় মজুত থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
সম্ভাব্য প্রভাব শিল্প, কৃষি ও বিদ্যুৎ খাতে
জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হলে তার প্রভাব অর্থনীতির প্রায় সব খাতে পড়তে পারে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাস ও তেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানি সংকট হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়ে লোডশেডিং বাড়তে পারে।
শিল্প খাতেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিমেন্ট, স্টিল ও সার কারখানার উৎপাদন কমে গেলে রফতানি আয় কমতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে।
পরিবহন খাতে জ্বালানির ঘাটতি হলে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হবে। এর ফলে বাজারে পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। কৃষি খাতও এর বাইরে নয়। সেচ ও কৃষিযন্ত্র চালাতে জ্বালানি প্রয়োজন হওয়ায় সংকট হলে খাদ্য উৎপাদন কমে যেতে পারে।
জ্বালানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচও বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে ভোক্তা পর্যায়ে। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বেশি দামে আমদানি করতে হয়, যা ডলারের চাহিদা বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করে।
রাজনৈতিক মহলেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির প্রভাবে তেলের দাম ও নিত্যপণ্যের বাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা দিতে পারে।
গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ ও শিল্পে শঙ্কা
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে যাবে। এতে শিল্প উৎপাদনে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। বিশেষ করে সার, টেক্সটাইল, সিরামিক, কাচ ও স্টিল শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
রফতানিমুখী শিল্প খাতের উদ্যোক্তারাও উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, গ্যাস সংকট হলে উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে এলএনজি আমদানি করতে হলে শিল্প খাতের ব্যয় আরও বাড়বে।
সামষ্টিক অর্থনীতির চার বড় চ্যালেঞ্জ
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, দেশের অর্থনীতি এখন বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে। তিনি চারটি বিষয়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন—সামষ্টিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো।
তার ভাষায়, জ্বালানি ও ব্যাংক খাত অর্থনীতির দুই প্রধান ভিত্তি, কিন্তু বর্তমানে এই দুই খাতই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে কিছুটা স্বস্তি এলেও মূল্যস্ফীতি আবার বাড়ার প্রবণতা দেখাচ্ছে, যা সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে চাপ
উচ্চ সুদহার বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। গত এক বছরে ঋণপ্রবাহ কমেছে। কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়া, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের দুর্বলতা এবং কিছু উদ্যোক্তার বিদেশমুখী হওয়ায় কর্মসংস্থানের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
ব্যাংক খাত ও রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতা
দেশের ব্যাংকিং খাতে অনাদায়ী ঋণের উচ্চমাত্রা অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। সুশাসনের ঘাটতি ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যাকে জটিল করেছে।
অন্যদিকে, অর্থনীতির আকারের তুলনায় রাজস্ব আয় এখনও কম। ফলে উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আগামী বাজেটে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা এবং বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে হবে। পাশাপাশি সাশ্রয়ী উৎস থেকে এলএনজি আমদানি এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।
সব মিলিয়ে বৈশ্বিক অস্থিরতার সঙ্গে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা যুক্ত হয়ে অর্থনীতিতে চাপ বাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর নীতি ও সমন্বিত পদক্ষেপই হতে পারে একমাত্র পথ।

