বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করা ৫৭ শতাংশ জাপানি কোম্পানি আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
স্থানীয় বাজারে জাপানি পণ্য ও সেবার চাহিদা বৃদ্ধিই এই আগ্রহের মূল কারণ। তবে বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগও কম নয়। তারা রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, কর-সংক্রান্ত জটিলতা, সরকারি নীতিমালার অস্পষ্টতা এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।
এই তথ্য উঠে এসেছে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) পরিচালিত একটি জরিপে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জাপানি কোম্পানিগুলোর মধ্যে ২০২৫ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশে কার্যক্রম চালানো ৫৯টি প্রতিষ্ঠান এই জরিপে অংশ নেয়। সম্প্রতি এর ফলাফল জেট্রোর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।
জরিপে দেখা গেছে, গত বছর এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৬৭ শতাংশ জাপানি কোম্পানি লাভের আশা করেছিল। বিশেষ করে চীনে চার বছরের ব্যবধানে প্রথমবারের মতো লাভজনক জাপানি কোম্পানির সংখ্যা বেড়েছে। এর পেছনে দেশটিতে জাপানি পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি, উৎপাদন দক্ষতা উন্নতি এবং শ্রম খরচ কমার ভূমিকা রয়েছে। একই সঙ্গে, ভারতেও স্থানীয় চাহিদা বৃদ্ধির কারণে ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহ বেড়েছে জাপানি কোম্পানির মধ্যে।
যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ও মুনাফা:
জেট্রোর প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে জাপানি কোম্পানির অবস্থানও উল্লেখযোগ্য। জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ শতাংশের কম কোম্পানি পণ্য রপ্তানি করছে। যারা রপ্তানি করছে, তারা বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় মুনাফা কমার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। এ চাপ সামাল দিতে তারা উৎপাদন খরচ কমানো বা ব্যবসায়িক অংশীদারদের সঙ্গে দাম নিয়ে সমঝোতার পথ বেছে নিচ্ছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ জানান, বাংলাদেশে জাপানি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ লক্ষ্য করে এখন অনেক কোম্পানি একক বা যৌথ মালিকানায় কারখানা স্থাপন করছে। জরিপে দেখা গেছে, ৬৭ শতাংশ কোম্পানি স্থানীয় চাহিদা বৃদ্ধিকেই ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এছাড়া রপ্তানির সুযোগ, প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় ভালো অবস্থান, বিশেষ বা উচ্চমূল্যের পণ্যের প্রতি আগ্রহ এবং দক্ষ মানবসম্পদও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
জরিপে আরও দেখা গেছে, ৩৮ শতাংশ জাপানি কোম্পানি আগামী এক-দুই বছরে ব্যবসা বর্তমান অবস্থায় রাখার পরিকল্পনা করছে। আর ৫ শতাংশ কোম্পানি ব্যবসা কমানোর কথা বিবেচনা করছে। ব্যবসা সম্প্রসারণ বলতে মূলত পণ্যের বিক্রি ও উৎপাদন বৃদ্ধিকে বোঝানো হয়েছে। নতুন কোম্পানি খোলা বা গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম। এছাড়া উৎপাদন খাতের তুলনায় অ-উৎপাদন খাতে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বেশি দেখা গেছে।
বাংলাদেশে বড় পাঁচ ঝুঁকি:
জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে কাজ করা ৯৪ শতাংশ জাপানি কোম্পানি রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতাকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গত বছরও এ বিষয়টিই প্রধান উদ্বেগের তালিকায় ছিল। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পরিবর্তন ও এর পরের রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
তবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর অস্থিরতা কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া জাপানি বিনিয়োগকারীরা জানিয়েছেন, কর সংক্রান্ত প্রক্রিয়া অনেক সময়সাপেক্ষ; সরকারি নীতিমালা পরিষ্কার নয়; অনুমতি ও লাইসেন্স পেতে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়; আইন প্রয়োগ ও পরিচালনা স্পষ্ট নয়।
সুবিধা ও সুবিধাজনক দিক:
বাংলাদেশে ব্যবসা পরিবেশে জাপানি কোম্পানিগুলো যে সুবিধাগুলো দেখছে, সেগুলো হলো—সস্তা শ্রম, বাজার সম্ভাবনা, দক্ষ মানবসম্পদ সহজলভ্যতা, ভাষাগত সুবিধা এবং স্থানীয় দক্ষ কর্মী নিয়োগে সহজলভ্যতা।
জরিপে দেখা গেছে, ৭৭.৪ শতাংশ জাপানি কোম্পানি সস্তা শ্রমকে সুবিধার হিসাবে উল্লেখ করেছে এবং ৫৬.৬ শতাংশ বাজার সম্ভাবনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর সস্তা শ্রম আর সুবিধার জায়গায় থাকবে না।
জাপানি কোম্পানিগুলো ‘সস্তা শ্রমের’ জন্য বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তান, মিয়ানমার, লাওস ও কম্বোডিয়াকে প্রতিযোগিতামূলকভাবে বিবেচনা করছে। বাজার সম্ভাবনায় এগিয়ে আছে ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়া। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে সিঙ্গাপুর এবং উন্নত কর্মপরিবেশের জন্য থাইল্যান্ড ও তাইওয়ানকে পছন্দ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে কাজ করা জাপানি কোম্পানির মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ আশা করছে ২০২৬ সালে মুনাফা বাড়বে। ৪৫ শতাংশ আশা করছে মুনাফা স্থিতিশীল থাকবে এবং ৯.৫ শতাংশের শঙ্কা মুনাফা কমার। গত বছরের তুলনায় (২০২৫ বনাম ২০২৪), মুনাফার আশা করা কোম্পানির সংখ্যা বেড়েছে এবং লোকসানের আশঙ্কা থাকা কোম্পানির সংখ্যা কমেছে।
মাসরুর রিয়াজ বলেন, জাপান বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। দেশের সঙ্গে কেবল উন্নয়ন সহযোগিতা নয়, এখন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতেও জাপান গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে ব্যবসা সম্প্রসারণে ইতিবাচক মনোভাব মানেই তা বাস্তব বিনিয়োগে রূপ নেবে, এমনটি নয়। প্রকৃত বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে নীতিগত জটিলতা, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

