বাংলাদেশে জ্বালানি তেল সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি আশ্বাস ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে স্পষ্ট ফারাক দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাব ইতিমধ্যেই বাজারে পড়তে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও সরবরাহ বিঘ্ন—দুইয়ের সমন্বয়েই এই চাপ তৈরি হয়েছে।
অফিশিয়াল তথ্যে জানা যায়, জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসে দেশে জ্বালানি তেল আমদানি কমেছে প্রায় ৮৫ হাজার ৫০০ টন। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মার্চে নির্ধারিত ১৭টি জ্বালানিবাহী জাহাজের অর্ধেক দেশে পৌঁছাতে পারেনি। এতে আমদানিতে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সরকারি বক্তব্যে তেলের সংকট নেই বলা হলেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। অনেক জায়গায় অঘোষিতভাবে সীমিত সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। পাম্প মালিকদের দাবি, তারা চাহিদার তুলনায় কম তেল পাচ্ছেন। একই সঙ্গে ভোক্তাদের মধ্যে একধরনের উদ্বেগ কাজ করছে, যার ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহের প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের মার্চে জ্বালানি তেল আমদানি ছিল ৩ লাখ ৩১ হাজার টন। চলতি বছরের মার্চে তা নেমে এসেছে ১ লাখ ৬৯ হাজার টনে, অর্থাৎ প্রায় অর্ধেকে। মাসের শেষে আরও ৮০ হাজার টন তেল আসার কথা থাকলেও মোট আমদানির পরিমাণ গত বছরের তুলনায় কমই থাকবে।
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের মোট আমদানি হয়েছে ৭ লাখ ৬৯ হাজার টন, যেখানে গত বছর একই সময়ে ছিল প্রায় ৮ লাখ ৫৫ হাজার টন। জানুয়ারিতে আমদানি কিছুটা বাড়লেও ফেব্রুয়ারিতে আবার কমে যায়।
তবে বিপিসি কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। তাদের দাবি, সরবরাহ চাহিদা অনুযায়ীই দেওয়া হচ্ছে। মানুষের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা থেকেই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে বছরে গড়ে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে বড় অংশই ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল। মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল এনে তা দেশে পরিশোধন করা হয়। পাশাপাশি ভারত ও চীন থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়। পেট্রোল পুরোপুরি এবং অকটেনের বড় অংশ দেশেই উৎপাদিত হয়।
মজুত কত দিন চলবে
বর্তমানে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় ডিজেলের ওপর নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি। কৃষি, পরিবহন ও বিদ্যুৎ—সবখানেই এর ব্যবহার বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিজেলের বার্ষিক চাহিদা ধরা হয়েছে ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন।
২৩ মার্চ পর্যন্ত দেশে ডিজেলের মজুত ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার টন, যা দিয়ে প্রায় ১৪ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। অকটেনের মজুত রয়েছে প্রায় ৯ দিনের, আর পেট্রোলের মজুত দিয়ে চলবে প্রায় ১১ দিন।
ফার্নেস তেলের মজুত তুলনামূলক বেশি, যা প্রায় ২৯ দিনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। জেট ফুয়েল রয়েছে ২৩ দিনের, কেরোসিন ৪৬ দিনের এবং মেরিন ফুয়েল প্রায় ৪৪ দিনের চাহিদা পূরণ করতে পারবে।
অন্যদিকে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে, যা দিয়ে প্রায় ১৭ দিন উৎপাদন চালানো সম্ভব। তবে নতুন চালান সময়মতো না এলে উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
আমদানি পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা
চলতি মাসে ১৭টি জাহাজে তেল আসার কথা থাকলেও পৌঁছেছে মাত্র ৮টি। এতে প্রায় ২ লাখ টন তেল সরবরাহ পাওয়া গেছে। বাকি জাহাজগুলোর মধ্যে কিছু আসতে পারে, তবে কয়েকটির বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
একই সময়ে ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ১০ হাজার টন তেল এসেছে, আরও ৫ হাজার টন আসার কথা রয়েছে। তবে অপরিশোধিত তেলের একটি বড় চালান সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনালে আটকে যাওয়ায় নতুন সংকট তৈরি হয়েছে।
বিকল্প হিসেবে আগামী মাসে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যদিও এতে ব্যয় কিছুটা বেশি হবে।
এপ্রিল ও মে মাসের জন্য নতুন আমদানি সূচি তৈরি করেছে বিপিসি। এপ্রিল মাসে সমুদ্রপথে ১৪টি জাহাজ ও পাইপলাইনে কয়েকটি চালানের মাধ্যমে তেল আনার পরিকল্পনা থাকলেও এখনো পুরো সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি। একইভাবে মে মাসের পরিকল্পনাও রয়েছে, তবে সরবরাহকারীদের কাছ থেকে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
বিপিসি কর্মকর্তারা বলছেন, সাময়িক চাপ তৈরি হলেও বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নতুন সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে এবং আগামী মাসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে।

