দেশের অর্থনীতি যখন নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখকে ঘিরে বাজারে দেখা দিয়েছে নতুন গতি। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির সর্বজনীন এই উৎসব শুধু সাংস্কৃতিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও এবার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। বাজারে চাহিদা বেড়েছে, নগদ অর্থের প্রবাহও বেড়েছে, ফলে ব্যবসায়ীরা পেয়েছেন বাড়তি স্বস্তি।
বিভিন্ন সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, বৈশাখ কেন্দ্রিক লেনদেন এবার প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। যদিও এর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা এখনো হয়নি। তবুও পোশাক, খাবার, উপহার, মেলা, অনলাইন কেনাকাটা ও বিভিন্ন সেবাখাতে বড় ধরনের চাঙাভাব দেখা গেছে।
উৎসবকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি গতি এসেছে পোশাক খাতে। মোট বার্ষিক পোশাক বিক্রির প্রায় ২০ শতাংশই হয় বৈশাখে। দুই ঈদ মিলিয়ে যেখানে প্রায় ৬০ শতাংশ বিক্রি হয়, বাকি অংশ সারা বছর জুড়ে হয় বলে ব্যবসায়ীরা জানান। শাড়ি, পাঞ্জাবি ও ফতুয়ার চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
রাজধানীর বড় শপিংমলগুলো, বিশেষ করে যমুনা ফিউচার পার্কে ক্রেতাদের ব্যাপক ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। আড়ং, অঞ্জন’স, দেশী দশ, নবরূপা, মেট্রো, জেন্টালপার্ক, ইনফিনিটি, ক্যাটসআইসহ শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলো বৈশাখ উপলক্ষে বিশেষ পোশাক ও অফার নিয়ে এসেছে। অনেক পণ্যে ৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হচ্ছে।
শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটেও ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। সেখানে পাঞ্জাবি বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ২৫০০ টাকায়, ফতুয়া ৪০০ থেকে ৮০০ টাকায় এবং থ্রি-পিস ১২০০ থেকে ৩২০০ টাকায়। মেয়েদের জন্য গহনা, চুড়ি, দুল, ব্রেসলেট এবং কারুকাজ করা ব্যাগও বিক্রি হচ্ছে ব্যাপকভাবে।
বেইলি রোডের ফ্যাশন হাউজগুলোতেও উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। দোকানগুলো বৈশাখী সাজে সাজানো হয়েছে রঙিন আল্পনা, আলোকসজ্জা ও থিমেটিক ডিজাইনে। লাল-সাদা শাড়ি ১০০০ থেকে ৩০০০ টাকায় এবং লেডিস গ্রাউন্ড ২০০০ থেকে ৬০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে। ক্রেতাদের আগ্রহও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ার কারণে সামগ্রিক অর্থনীতিতে সাময়িক গতি তৈরি হয়েছে। তবে এর ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা বাড়তে পারে বলেও তারা সতর্ক করেছেন।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন, বৈশাখ ঘিরে দেশে বড় ধরনের চাহিদা তৈরি হয়। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে এই চাহিদা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্যান্য উৎসবের তুলনায় বৈশাখের কিছু ভিন্নতা রয়েছে। এটি ধর্মভিত্তিক নয়, বরং সর্বজনীন বাঙালির উৎসব। ঈদ বা অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবে যেখানে বিদেশি পণ্যের ব্যবহার বেশি হয়, সেখানে বৈশাখে প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্যই দেশীয়।
এছাড়া বৈশাখ শুধু ঘরোয়া পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়। হোটেল, রেস্তোরাঁ এমনকি পাঁচতারকা হোটেলগুলোতেও বিশেষ আয়োজন থাকে। ঈদের সময় মানুষ গ্রামে গেলেও বৈশাখে সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকেই উৎসব উদযাপন করেন।
উৎসব উপলক্ষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকও বিশেষ ছাড় দিচ্ছে। ভিসা, মাস্টারকার্ড ও আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ডে ছাড় থাকছে। বাটা ও অ্যাপেক্সের মতো জুতা ব্র্যান্ডে সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয়েছে। ইলেকট্রনিক পণ্য ও হোটেল-পর্যটন খাতেও বিভিন্ন অফার চলছে।
২০১৬ সালে সরকার পহেলা বৈশাখকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় এবং সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ২৫ শতাংশ বোনাস ঘোষণা করা হয়। সেই বোনাসের অর্থের বড় একটি অংশও বাজারে প্রবাহিত হয়ে থাকে। পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা ও করপোরেট কোম্পানিগুলোও বোনাস দিয়ে থাকে।
গ্রাম থেকে শহর—সব জায়গাতেই এখন বৈশাখী মেলা ও আয়োজন চলছে। পার্ক, উদ্যান ও পাড়া-মহল্লায় নানা অনুষ্ঠান হচ্ছে। বিভিন্ন জেলায় চলছে গ্রামীণ মেলা, শহরে শুরু হয়েছে বৈশাখী তাঁত মেলা।
নিত্যপণ্যের বাজারেও বৈশাখের প্রভাব পড়েছে। ফলের মধ্যে তরমুজের চাহিদা বেড়েছে। রাজধানীর বাজারগুলোতে তরমুজ বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ২০০ টাকায়। পাশাপাশি পান্তা-ইলিশ, ফুল, মৃৎশিল্প, ঘুড়ি, মিষ্টি, সরা আঁকা ও হাতে তৈরি পণ্যের বিক্রি বেড়েছে।
সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে মন্দার চাপের মধ্যেও পহেলা বৈশাখ ঘিরে দেশের বাজারে তৈরি হয়েছে বাড়তি প্রাণচাঞ্চল্য, যা সাময়িক হলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি যোগ করেছে।

