দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য যখন একের পর এক চাপের মুখে, তখন ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন এফবিসিসিআই নিজেই নেতৃত্ব সংকটে পড়ে আছে। যে সংগঠনের কাজ ছিল সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দাবি, সমস্যা ও নীতি-প্রস্তাব নিয়ে কার্যকর দরকষাকষি করা, সেই সংগঠন গত ২০ মাস ধরে নির্বাচিত নেতৃত্ব ছাড়াই চলছে। ফলে দেশের ছোট, মাঝারি ও বড়—সব ধরনের ব্যবসায়ীর মধ্যেই এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
প্রশাসকের মাধ্যমে সংগঠনের নিয়মিত দাপ্তরিক কার্যক্রম কোনোভাবে চললেও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার মতো রাজনৈতিক ও নীতিগত নেতৃত্ব সেখানে অনুপস্থিত। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এফবিসিসিআই শুধু একটি সংগঠন নয়; এটি সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতের যোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেতু। সেই সেতু দুর্বল হয়ে পড়লে ক্ষতি শুধু ব্যবসায়ীদের নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও তার প্রভাব পড়ে।
বর্তমানে দেশের অর্থনীতি নানা চাপের মধ্যে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। ব্যাংকঋণের সুদ ১৪-১৫ শতাংশে পৌঁছানোয় নতুন বিনিয়োগ ও চলতি ব্যবসা চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতিতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্র খোলার জটিলতাও অনেক ব্যবসায়ীকে বিপাকে ফেলেছে। এর সঙ্গে প্রতি বছর কর ও ভ্যাটের বাড়তি চাপ ব্যবসার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এমন অবস্থায় ব্যবসায়ীদের প্রয়োজন ছিল শক্তিশালী, নির্বাচিত ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এফবিসিসিআই ভবনে আগের মতো ব্যবসায়ীদের সরব উপস্থিতি নেই। অনেকেই মনে করছেন, নির্বাচিত কমিটি না থাকায় সংগঠনটি তার স্বাভাবিক প্রাণশক্তি হারিয়েছে। সংকটের সময়ে যেখানে ব্যবসায়ীদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান দরকার ছিল, সেখানে নেতৃত্বশূন্যতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই দীর্ঘ অচলাবস্থার শুরু মূলত রাজনৈতিক পরিবর্তন ও বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা সংশোধনকে কেন্দ্র করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর এফবিসিসিআইয়ের তৎকালীন সভাপতি মাহবুবুল আলম পদত্যাগ করেন। পরবর্তী সময়ে ১১ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে প্রশাসক নিয়োগ দেয়।
এরপর এফবিসিসিআই বৈষম্যবিরোধী সংস্কার পরিষদের দাবির মুখে সংগঠনের কাঠামোতে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসংখ্যা ৮০ থেকে কমিয়ে ৪৬ জন করা হয়। মনোনীত পরিচালকের সংখ্যাও কমানো হয়। আগে সর্বশেষ পর্ষদে ৮০ জন পরিচালকের মধ্যে ৩৪ জন ছিলেন মনোনীত। নতুন বিধিমালায় চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে ৫ জন করে মোট ১০ জন মনোনীত পরিচালক রাখার কথা বলা হয়। এর বাইরে নারী চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে ১ জন করে মোট ২ জন মনোনীত পরিচালক যুক্ত হওয়ার বিধান রাখা হয়।
সংস্কারের এসব উদ্যোগ প্রথমে অনেক ব্যবসায়ীর কাছে ইতিবাচক মনে হলেও পরে একটি শর্ত ঘিরে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। নতুন বিধিমালায় বলা হয়, কেউ টানা দুই মেয়াদের বেশি পরিচালনা পর্ষদে থাকতে পারবেন না। এরপর এক মেয়াদ বিরতি দিয়ে আবার নির্বাচন করার সুযোগ থাকবে। তবে সমস্যার জায়গা হলো, এই নিয়ম শুধু ভবিষ্যতের জন্য নয়, অতীতের মেয়াদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়। এর ফলে সর্বশেষ দুই পর্ষদে থাকা অনেক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা হারান।
এই বিধান নিয়ে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয় এবং বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। একাধিক রিটের কারণে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থমকে যায়। যারা নির্বাচন ঘিরে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তাঁদের অনেকেই পরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ফলে সংস্কারের মাধ্যমে নির্বাচনের পথ খুলে যাওয়ার বদলে পুরো প্রক্রিয়াই আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে যায়।
নতুন বিধিমালা জারির দুই সপ্তাহের মধ্যেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্বাচনী বোর্ড গঠন করেছিল। ১৮ জুন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ওই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর সরাসরি ভোটে সভাপতি, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি, ২ জন সহসভাপতি ও ৩০ জন পরিচালক নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল। পরে বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠনের দাবির মুখে নির্বাচন ৪৫ দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোট আর হয়নি।
এই অচলাবস্থার প্রভাব শুধু এফবিসিসিআইতেই সীমাবদ্ধ নেই। এর ঢেউ পড়েছে অন্যান্য বাণিজ্য সংগঠনেও। এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচন আটকে থাকায় ঢাকা চেম্বার, মেট্রোপলিটন চেম্বারসহ দেশের ৪০১টি পণ্যভিত্তিক সংগঠন এবং ৮৩টি জেলা চেম্বারের নির্বাচনও ঝুলে আছে। অর্থাৎ একটি কেন্দ্রীয় সংগঠনের সংকট পুরো ব্যবসায়ী সংগঠন কাঠামোর ওপর চাপ তৈরি করেছে।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন মনে করেন, ফেডারেশন ক্ষুদ্র ও বড়—সব ধরনের ব্যবসায়ীর স্বার্থ রক্ষার জায়গা। দীর্ঘদিন নির্বাচিত পর্ষদ না থাকায় ব্যবসায়ীরা তাঁদের কথা বলার কার্যকর ফোরাম পাচ্ছেন না। তাঁর মতে, দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থে দ্রুত বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা সংশোধন করে নির্বাচন দেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসানের বক্তব্যও একই ধরনের। তাঁর মতে, এফবিসিসিআইয়ের মূল কাজ হলো সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে দেনদরবার করা। কিন্তু দীর্ঘদিন পরিচালনা পর্ষদ না থাকায় ব্যবসায়ী নেতৃত্বে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। তাই সংস্কার শেষ করে দ্রুত ভোটের মাধ্যমে প্রকৃত ব্যবসায়ী প্রতিনিধি নির্বাচিত করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে এফবিসিসিআইয়ের সহায়ক কমিটির সাবেক সদস্য আবুল কাশেম হায়দার মনে করেন, সংগঠন থেকে পুরোনো প্রভাব দূর করার চেষ্টা করা হলেও এখন সেটি নেতৃত্বহীন অবস্থায় পড়ে আছে। তাঁর মতে, বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা সংশোধনের কাজ চাইলে দ্রুত করা সম্ভব। অর্থমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রী বিষয়টি জানেন বলেও ব্যবসায়ী মহলের ধারণা। তবু কেন সংশোধনের কাজ ধীরগতিতে চলছে, সেটিই তাঁদের প্রশ্ন।
এফবিসিসিআইয়ের নেতৃত্ব সংকটের পেছনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা রয়েছে। বহু বছর ধরেই সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে সাধারণ ব্যবসায়ীদের স্বাধীন ভূমিকা সীমিত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। যখন যে দল ক্ষমতায় থেকেছে, তখন তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী নেতারাই সাধারণত সভাপতির পদে এগিয়ে এসেছেন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এ প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়। ২০১৯ ও ২০২১ সালে ভোট ছাড়াই সভাপতি হন যথাক্রমে শেখ ফজলে ফাহিম ও মো. জসিম উদ্দিন। সর্বশেষ ২০২৩ সালে অ্যাসোসিয়েশন অংশে ভোট হলেও সভাপতি হন বিনা ভোটে মাহবুবুল আলম।
এ কারণে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক ব্যবসায়ী নেতা এফবিসিসিআইয়ে সংস্কারের দাবি তোলেন। তাঁরা মনোনীত পরিচালক প্রথা বাতিল, পর্ষদের আকার ছোট করা এবং প্রকৃত ভোটভিত্তিক নেতৃত্ব ফিরিয়ে আনার দাবি জানান। এসব দাবির কিছু অংশ নতুন বিধিমালায় রাখা হলেও অতীত মেয়াদ গণনার শর্ত পুরো প্রক্রিয়াকে নতুন বিতর্কে ফেলে দেয়।
বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নিলেও তা শেষ করে যেতে পারেনি। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠন করার পর ব্যবসায়ী মহলে নতুন আশার সঞ্চার হয়। কিন্তু এখনো প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি। প্রথমে এক বছরের জন্য এবং পরে গত নভেম্বরে অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খানকে চার মাসের জন্য প্রশাসক করা হলেও ইতিমধ্যে ৬ মাস পেরিয়ে গেছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের চলতি দায়িত্বে থাকা এবং এফবিসিসিআইয়ের বর্তমান প্রশাসক আবদুর রহিম খান জানিয়েছেন, সংশোধিত বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা চলতি সপ্তাহেই অংশীজনদের মতামতের জন্য অনলাইন পাতায় প্রকাশ করা হবে। এরপর ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে তা চূড়ান্ত করা হবে। বিধিমালা চূড়ান্ত হলে নির্বাচনের পথে আর বাধা থাকবে না বলে তাঁর আশা।
তবে ব্যবসায়ীদের মধ্যে এখনো উদ্বেগ কাটেনি। কারণ দীর্ঘদিন ধরে একই প্রতিশ্রুতি শোনা গেলেও বাস্তব অগ্রগতি ধীর। তাঁদের মতে, অর্থনীতির বর্তমান অবস্থায় এফবিসিসিআইয়ের মতো সংগঠনকে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রেখে দীর্ঘ সময় চালানো উচিত নয়। নির্বাচিত নেতৃত্ব ছাড়া ব্যবসায়ী সমাজের প্রকৃত সমস্যা সরকার পর্যন্ত পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
সব মিলিয়ে এফবিসিসিআইয়ের সংকট এখন শুধু একটি সংগঠনের নির্বাচন-সংকট নয়; এটি দেশের ব্যবসায়িক প্রতিনিধিত্ব, নীতি প্রভাব এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। দ্রুত বিধিমালা সংশোধন, আইনি জটিলতা নিরসন এবং স্বচ্ছ ভোটের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য পর্ষদ গঠন করা এখন সময়ের দাবি। কারণ ব্যবসায়ীদের কণ্ঠস্বর যতদিন অনুপস্থিত থাকবে, ততদিন অর্থনীতির সংকট মোকাবিলায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও দুর্বল থাকবে।

