বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেটে বিদেশি অর্থায়নের গুরুত্ব নতুন কিছু নয়। কিন্তু আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রস্তাবিত আকার ও অর্থায়নের ধরন দেখে বোঝা যাচ্ছে, বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা আবারও বড়ভাবে সামনে আসছে। একসময় বিদেশি সহায়তাকে উন্নয়ন কার্যক্রমের সহায়ক শক্তি হিসেবে দেখা হলেও এখন তা অনেক ক্ষেত্রেই বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান ভরসায় পরিণত হয়েছে। এতে উন্নয়নকাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও ঋণ পরিশোধের চাপও দিন দিন ভারী হয়ে উঠছে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য পরিকল্পনা কমিশন ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি চূড়ান্ত করেছে। এর মধ্যে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা আসবে বিদেশি উৎস থেকে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে, যার বড় অংশই ঋণ। বাকি ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা জোগান দেওয়ার কথা দেশীয় উৎস থেকে। বর্তমান অর্থবছরের ২ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মসূচিতে বিদেশি প্রকল্প সহায়তার পরিমাণ ছিল ৭২ হাজার কোটি টাকা, আর অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থায়ন ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা।
এই তুলনা স্পষ্ট করে যে সরকার উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে আবারও বিদেশি ঋণের দিকে ঝুঁকছে। আগামী উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রকল্প সহায়তার লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩৮ হাজার কোটি টাকা বেশি, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় ৫৩ শতাংশ বেশি। এত বড় বৃদ্ধি শুধু বাজেটের আকার বাড়ানোর বিষয় নয়; এটি দেশের অর্থায়ন কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দেয়।
গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে সতর্কতা দেখা গিয়েছিল। আগের প্রশাসন টানা দুই বছর প্রকল্প সহায়তার বরাদ্দ কমিয়ে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু নতুন পরিকল্পনায় দেখা যাচ্ছে, সেই সতর্ক অবস্থান থেকে সরকার আবার বড় উন্নয়ন ব্যয় ও বিদেশি অর্থায়নের পথে হাঁটতে চাচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ জরুরি। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, রেল, নগর যোগাযোগ, বন্দর ও শিল্প অবকাঠামোর মতো খাতে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হয়। দেশীয় রাজস্ব দিয়ে এসব প্রকল্পের সম্পূর্ণ ব্যয় মেটানো কঠিন। তাই বিদেশি ঋণ অনেক সময় প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ঋণের টাকা কতটা উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার হচ্ছে এবং সেই বিনিয়োগ ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সুফল দেবে কি না।
আগে প্রকল্প ঋণ বরাদ্দে বড় উল্লম্ফন দেখা গিয়েছিল ২০১৬-১৭ অর্থবছরে। সে সময় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও মেট্রোরেলের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। এসব প্রকল্প দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলোর অর্থায়ন কাঠামো ভবিষ্যতের জন্য বড় ঋণ পরিশোধের দায় তৈরি করেছে। এখন সেই দায় ধীরে ধীরে বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
২০২৫ অর্থবছরে সরকার বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে ৫০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। এটি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ঋণ পরিশোধের অঙ্ক। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৬১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। এই পরিসংখ্যান দেখায়, বিদেশি ঋণের বোঝা এখন আর ভবিষ্যতের কোনো দূরবর্তী বিষয় নয়; এটি বর্তমান বাজেট ব্যবস্থাপনার বড় বাস্তবতা।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, নতুন বিদেশি ঋণের প্রবাহের তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত বাড়ছে। অর্থাৎ সরকার বিদেশি উৎস থেকে যত অর্থ পাচ্ছে, তার বড় অংশ আবার পুরোনো ঋণ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য ঋণ নেওয়া হলেও বাজেটের একটি বড় অংশ ঋণের দায় মেটাতেই ব্যয় হচ্ছে। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নেওয়া রুশ ঋণের পরিশোধও শিগগির শুরু হওয়ার কথা। এটি শুরু হলে বছরে আরও ৪ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধের দায় যোগ হবে। শুধু রূপপুর নয়, আরও কয়েকটি বড় প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের সময় সামনে আসছে। ফলে আগামী কয়েক বছরে ঋণ পরিশোধ বাবদ বাজেটের চাপ আরও বাড়তে পারে।
আইএমইডির সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণেও দেখা যাচ্ছে, গত পাঁচ অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয়ে বিদেশি ঋণ ও অনুদানের ওপর সরকারের নির্ভরতা বেড়েছে। অন্যদিকে দেশীয় উৎসের অবদান তুলনামূলকভাবে কমেছে। এটি একটি কাঠামোগত দুর্বলতার দিক নির্দেশ করে। যদি রাজস্ব আহরণ শক্তিশালী না হয়, তাহলে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য সরকারকে আরও বেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। এতে উন্নয়ন চলবে ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে সুদ ও আসল পরিশোধের দায়ও বাড়বে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হচ্ছে ঋণের শর্ত। আগে বাংলাদেশ তুলনামূলক সহজ শর্তে ও কম সুদে বিদেশি ঋণ পেত। কিন্তু এখন সেই সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার মতো উন্নয়ন অংশীদাররা আগের তুলনায় কঠোর শর্তে অর্থায়নের দিকে যাচ্ছে। অনুদানের পরিমাণও কমে গেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিতরণ করা বৈদেশিক সহায়তার ৯০ শতাংশের বেশি ছিল ঋণ।
এর অর্থ হলো, বিদেশি সহায়তা এখন আর আগের মতো সহজ আর্থিক সমর্থন নয়। এটি ক্রমেই বাজারভিত্তিক ঋণের চরিত্র নিচ্ছে। সুদের হার, পরিশোধের সময়সীমা ও শর্ত কঠিন হলে ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও জটিল হয়ে পড়ে। ফলে শুধু ঋণ পাওয়া নয়, কোন প্রকল্পে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, সেই প্রকল্প কত দ্রুত অর্থনৈতিক সুফল দেবে এবং তা দেশের আয় বাড়াতে কতটা সহায়ক হবে—এসব প্রশ্ন এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের উন্নয়ন থেমে থাকতে পারে না। অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও নগর সুবিধা বাড়াতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু সেই উন্নয়নের ভিত্তি যদি অতিরিক্ত ঋণনির্ভর হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বড় আর্থিক দায় বহন করতে হতে পারে। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনায় এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো অগ্রাধিকার ঠিক করা। যেসব প্রকল্প সরাসরি উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, রপ্তানি সক্ষমতা শক্তিশালী করবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং সরকারের আয় বাড়াতে সাহায্য করবে—সেসব প্রকল্পেই ঋণের অর্থ ব্যবহার করা উচিত।
একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্বল তদারকি এবং অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণের সংস্কৃতি কমাতে হবে। কারণ ঋণের অর্থ দিয়ে নেওয়া কোনো প্রকল্প যদি সময়মতো শেষ না হয় বা প্রত্যাশিত আয় তৈরি করতে না পারে, তাহলে সেই ঋণ জাতীয় অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। উন্নয়ন তখন দৃশ্যমান হলেও আর্থিকভাবে টেকসই থাকে না।
সব মিলিয়ে আগামী উন্নয়ন কর্মসূচি বাংলাদেশের সামনে এক দ্বিমুখী বাস্তবতা তুলে ধরছে। একদিকে উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিকে গতিশীল রাখার চেষ্টা আছে, অন্যদিকে বিদেশি ঋণের ওপর বাড়তি নির্ভরতা ও ঋণ পরিশোধের চাপ রয়েছে। এখন নীতিনির্ধারকদের প্রধান দায়িত্ব হবে ঋণ নেওয়ার আগে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিচার করা, প্রকল্প বাছাইয়ে কঠোর হওয়া এবং প্রতিটি টাকা যেন উৎপাদনশীল কাজে ব্যয় হয় তা নিশ্চিত করা।
উন্নয়ন দরকার, কিন্তু সেই উন্নয়ন হতে হবে হিসাবি, ফলপ্রসূ ও টেকসই। ঋণের টাকায় উন্নয়নের গতি আনা যায়, কিন্তু ঋণের দায় এড়ানো যায় না। তাই আজকের উন্নয়ন পরিকল্পনায় যদি সতর্কতা না থাকে, তাহলে আগামী দিনের বাজেট আরও বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে।

