একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামো তখনই স্থিতিশীল থাকে, যখন তার আয়-ব্যয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকে। কিন্তু যখন ব্যয় আয়কে ছাপিয়ে যায়, তখন সেই ঘাটতি পূরণে রাষ্ট্রকে আশ্রয় নিতে হয় ঋণের উপর। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বিগত এক দশকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে সরকার বহু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণ করেছে। এই ঋণ একদিকে যেমন অবকাঠামোগত উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ ঋণ পরিশোধের দায় নিয়ে জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছে, মুদ্রার মান পড়ছে এবং ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধে চাপ বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় অনেকেই আশঙ্কা করছেন—এই ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত কি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাঁধেই বর্তাবে।
ঋণের সাম্প্রতিক চিত্র: বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে চোখে পড়ার মতো অগ্রগতি করেছে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, রেলসহ নানা অবকাঠামো খাতে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। যা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা দেয়। তবে এই উন্নয়নের পেছনে যে অর্থের যোগান এসেছে, তার বড় অংশই এসেছে ঋণ থেকে। ফলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি ক্রমেই বাড়ছে ঋণের চাপ—যা নিয়ে এখন চিন্তার ভাঁজ পড়ছে অর্থনীতিবিদদের কপালেও।
চলতি অর্থবছর ২০২৪-২৫-এর প্রথম দশ মাসে (জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত) বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণগ্রহণ এবং পরিশোধের চিত্র বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এই সময়ে সরকার বিদেশি ঋণ হিসেবে পেয়েছে ৫১৬ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১১০ কোটি ডলার কম। অথচ ঋণ পরিশোধের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। একই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে পরিশোধ করতে হয়েছে ৩৫০ কোটি ৭১ লাখ ডলার, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
গত অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিশোধের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮১ কোটি ডলার, আর পুরো অর্থবছরে পরিশোধ করা হয়েছিল ৩৩৭ কোটি ডলার। তুলনায় চলতি অর্থবছরের মাত্র দশ মাসেই পরিশোধের অঙ্ক পেরিয়ে গেছে আগের বছরের সম্পূর্ণ হিসাবকে। অর্থাৎ ঋণ ছাড় কমলেও ঋণ শোধ করতে হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি।
এই অর্থবছরে নতুন বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে ৪২৫ কোটি ডলার। যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ৭৬০ কোটি ডলার—মানে প্রায় অর্ধেকেরও কম। আর আগের বছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে ঋণ ছাড় হয়েছিল ৬২৮ কোটি ডলার, যা এই বছর কমে দাঁড়িয়েছে ৫১৬ কোটিতে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ERD) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ প্রায় ১০ লাখ কোটি টাকারও বেশি। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে ৮ লাখ কোটি টাকা। ফলে দু‘টি উৎস মিলিয়ে দেশের ঋণভার বেড়েই চলেছে।
তবে আশার কথা হলো, এখনো বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৩৪ থেকে ৩৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।যা আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত ৭০ শতাংশ ঝুঁকির সীমার অনেক নিচে। কিন্তু শুধু অনুপাত নয়, এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই ঋণ কতটা দক্ষভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে সরকার তা কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিশোধ করতে পারবে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নানা আলোচনা চলছে। ২০২১ সালের আগস্টে দেশের রিজার্ভ ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল—প্রায় ৪৮ দশমিক ০৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু এরপর থেকে রিজার্ভ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। বিশেষ করে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধের কারণে ২০২৫ সালের শুরুতে রিজার্ভ নেমে আসে ১৯ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে।
এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (আকু)-এর সদস্য দেশগুলোর কাছে আমদানি বিল পরিশোধ করতে হয়েছে, যা রিজার্ভ হ্রাসের অন্যতম বড় কারণ। তবে আশার কথা হলো, আকু দায় পরিশোধের পরও রিজার্ভ আবার কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিলের শেষে দেশের রিজার্ভ বেড়ে ২২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি স্বস্তির বার্তা বহন করে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো—ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা। কারণ যখন আয় কমে ও ব্যয় বাড়ে, তখন ঋণ শোধ করাই কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যেসব প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয় আসছে না বা সময়মতো বাস্তবায়ন হচ্ছে না, সেগুলোর খরচই এখন সরকারের কাঁধে বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঋণের উৎস ও ব্যবহারের খাত: বাংলাদেশ সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় উৎস থেকেই বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করছে। এই ঋণের বেশিরভাগই ব্যবহৃত হচ্ছে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতের বৃহৎ প্রকল্পে। পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকা মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং কর্ণফুলী নদীর নিচ দিয়ে নির্মিত বঙ্গবন্ধু টানেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর পেছনে রয়েছে বিপুল পরিমাণ ঋণ সহায়তা।
বৈদেশিক ঋণের একটি বড় অংশ এসেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB), বিশ্বব্যাংক, জাইকা, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (IDB) ও চীনসহ বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক উৎস থেকে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ উৎস হিসেবে ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র এবং বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই প্রকল্পগুলো থেকে আমরা কেমন ধরনের আর্থিক সুফল পাচ্ছি? প্রকল্পগুলো কি সময়মতো শেষ হচ্ছে? আর শেষ হলেও সেগুলো থেকে আয় বা রাজস্ব আসছে কী? বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক প্রকল্প এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি বা কাঙ্ক্ষিতভাবে রাজস্ব উৎপাদনে যেতে পারেনি। যেমন: পদ্মা সেতু চালু হলেও টোল আদায় দিয়ে এখনো প্রকল্প খরচ উঠিয়ে আনা অনেক দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। একইভাবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখনো বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেনি, অথচ তার জন্য নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধের সময় ঘনিয়ে আসছে।
এর ফলে ভবিষ্যতে ঋণের বোঝা বাড়ার পাশাপাশি সরকারের ওপর আর্থিক চাপও বাড়তে পারে। কারণ প্রকল্প থেকে যদি প্রত্যাশিত আয় না আসে, তাহলে সেই ঘাটতি মেটাতে সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপর নির্ভর করতে হবে।যা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপর কর বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্তে গড়াতে পারে।
তাই ঋণ গ্রহণের পাশাপাশি এখন জরুরি হয়ে পড়েছে—ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং কোন প্রকল্প বাস্তবিক অর্থে লাভজনক বা প্রয়োজনীয় তা যাচাই করে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া।
ঋণের দায় কার কাঁধে? বর্তমান সরকারের নেওয়া ঋণ দিয়ে যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলছে তার সুফল যেমন বর্তমান প্রজন্ম পাচ্ছে, তেমনি সেই ঋণের দায় গিয়ে পড়ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাঁধে। আজ যেসব শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে কিংবা যারা এখনো পৃথিবীর মুখ দেখেনি—একদিন তারাই হবে এই ঋণের প্রকৃত পরিশোধকারী। কারণ এসব ঋণ পরিশোধ করা হবে ভবিষ্যতের জাতীয় বাজেট থেকে। যা গঠিত হবে তখনকার জনগণের দেওয়া কর, রাজস্ব ও বৈদেশিক আয় দিয়ে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই ঋণগুলো কি যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন যদি এই ঋণ রাজস্ব উৎপাদনকারী খাতে সঠিকভাবে বিনিয়োগ না হয়, অথবা যদি প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি, সময়ক্ষেপণ ও অদক্ষতা দেখা দেয় তাহলে দেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তখন সরকারকে ঋণ শোধে অধিক কর আরোপ করতে হতে পারে। বাড়তে পারে নিত্যপণ্যের দাম, সৃষ্টি হতে পারে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়ন। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হবে।
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে সতর্ক করেছে—ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা না থাকলে ভবিষ্যতে দেশ ঋণ-সঙ্কটে পড়তে পারে। এখনই যদি সরকার প্রকল্প নিরীক্ষা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো বাস্তবায়নে কঠোর নজর না দেয় তাহলে আজকের উন্নয়ন কাল হতে পারে আগামী দিনের বোঝা।
তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অর্থনৈতিক সংকট থেকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন দায়িত্বশীল ঋণ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং এমন বিনিয়োগ যেখানে প্রকৃত উৎপাদন ও আয় সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা কী বলছে? বিশ্বে এমন বহু দেশের উদাহরণ রয়েছে, যারা অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ফলে অর্থনৈতিকভাবে চরম সংকটে পড়েছে। শ্রীলঙ্কা, লেবানন এবং ঘানা—এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য এক ধরনের সতর্কবার্তা। এই দেশগুলো শুরুতে যেমনভাবে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়, ঠিক তেমনি সময়ের ব্যবধানে দেখা যায়, এসব প্রকল্পের আয় না বাড়ায় ঋণ পরিশোধে ভীষণ চাপ তৈরি হয়। সেই সঙ্গে যোগ হয় দুর্নীতি, প্রকল্প ব্যয়ের অস্বচ্ছতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দুর্বল আর্থিক পরিকল্পনা। একসময় পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয় যে দেশের মুদ্রা মূল্যহীন হয়ে পড়ে, খাদ্য ও জ্বালানির সংকট দেখা দেয়, এমনকি বৈদেশিক ঋণ খেলাপির পরিস্থিতিও তৈরি হয়।
শ্রীলঙ্কার ‘হাম্বানটোটা বন্দর’ প্রকল্প এই ক্ষেত্রে অন্যতম আলোচিত উদাহরণ। চীনা ঋণের অর্থে নির্মিত এই বন্দর পর্যাপ্ত আয় না দেওয়ায় দেশটি শেষমেশ বন্দরের নিয়ন্ত্রণ ৯৯ বছরের জন্য চীনের কাছে দিতে বাধ্য হয়। এই ঘটনার মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কিভাবে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব হারাতে পারে—তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কিছু চীনা ঋণনির্ভর প্রকল্প যেমন বন্দর, রেললাইন ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদি এসব প্রকল্পে আয় না আসে বা সময়মতো কার্যকর না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতোমধ্যে বারবার বলছে—ঋণ নিলেই হবে না, দেখতে হবে সেই ঋণ উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে কি না এবং দেশের সামগ্রিক আর্থিক পরিকল্পনার সঙ্গে তার সামঞ্জস্য আছে কি না। এই কারণে এখনই প্রয়োজন দূরদর্শী আর্থিক কৌশল, সুশাসন, প্রকল্প বাছাইয়ে কঠোরতা এবং স্বচ্ছ ঋণ ব্যবস্থাপনা—যাতে বাংলাদেশ ‘ঋণ ফাঁদে’ পড়ার ঝুঁকি এড়িয়ে একটি টেকসই উন্নয়ন পথে এগোতে পারে।
প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা, ভবিষ্যতের শঙ্কা:ঋণনির্ভর উন্নয়ন পরিকল্পনায় সাফল্য আসবে কি না তা অনেকাংশে নির্ভর করে প্রশাসনিক দক্ষতা, আর্থিক স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়নের ওপর। কিন্তু বাংলাদেশে এই তিনটি ক্ষেত্রেই একাধিক দুর্বলতা রয়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় শঙ্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রথমতঃ প্রকল্প মূল্যায়নের দুর্বলতা। অনেক সময় উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে সঠিকভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয় না। যে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও খরচ নির্ধারিত ছিল একভাবে, বাস্তবে তা হয়ে পড়ে দ্বিগুণ বা ততোধিক। সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্প ব্যয় বাড়ে এবং কাঙ্ক্ষিত লাভ বা সেবা সাধারণ মানুষ পায় না।
দ্বিতীয়ত: দুর্নীতি ও অপচয়: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি একটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা। অনিয়ম, লেনদেন এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রকল্পের অর্থ অপচয় হয়, ফলে প্রকল্পের কার্যকারিতা অনেক সময়েই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। একই প্রকল্পে বারবার সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব পেশ করার প্রবণতা এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
তৃতীয়ত: ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব। সরকার কোথা থেকে, কত পরিমাণ ঋণ নিচ্ছে, কী সুদের হারে, কী শর্তে এবং কবে কোন খাতে এই অর্থ খরচ হচ্ছে—এসব তথ্য সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, অনেক সময় সংসদ সদস্যরাও জানেন না। এই স্বচ্ছতার অভাব শুধু গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতাকেই ক্ষুণ্ন করে না, বরং ভবিষ্যতে সঠিক ঋণ পরিকল্পনা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন এখনই যদি এই দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে দেশের ঋণভার বেড়ে গিয়ে তা আগামী প্রজন্মের ওপর ভয়াবহ চাপ তৈরি করতে পারে। প্রকল্পের শুরুতে সঠিক মূল্যায়ন, দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার কড়া প্রয়োগ এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হতে পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ।
কী হতে পারে সমাধান? ঋণের ভার যাতে ভবিষ্যতের জন্য বোঝা না হয়ে দাঁড়ায় সে জন্য এখন থেকেই প্রয়োজন সুপরিকল্পিত, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধানধর্মী প্রস্তাব তুলে ধরা হলো:
🔹 উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে:
শুধু বড় বড় অবকাঠামো নয় বরং কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও শিক্ষাখাতে ঋণ বিনিয়োগ করলেই তা সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং রাজস্ব আয় বাড়াবে। এতে দেশের অর্থনীতি টেকসই হবে এবং ঋণ শোধের সক্ষমতাও বাড়বে।🔹 দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন:
উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে, ঋণের একটি বড় অংশ অপচয় হয়ে যায়। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি, লেনদেন, অনিয়ম ও অদক্ষতার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকর করতে হবে।🔹 ঋণ ব্যবস্থাপনায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার:
কোন প্রকল্পে কত ঋণ নেওয়া হচ্ছে, তার শর্ত কী এবং কিভাবে তা পরিশোধ হবে—এসব বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা জরুরি। এই তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করলে জনগণের আস্থা যেমন বাড়বে, তেমনি প্রশাসনিক জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হবে।🔹 জনগণের সম্পৃক্ততা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি:
ঋণ পরিশোধ হয় জনগণের করের টাকায়। তাই নাগরিকদের এই বিষয়ে সচেতন ও সম্পৃক্ত করা দরকার। শিক্ষা পাঠ্যক্রমে এবং গণমাধ্যমে ঋণ ব্যবস্থাপনা, বাজেট ও অর্থনৈতিক বোঝাপড়া অন্তর্ভুক্ত করা উচিত যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও সচেতন নাগরিক হয়ে ওঠে।🔹 আন্তর্জাতিক ভালো চর্চা অনুসরণ করা যেতে পারে:
বিশ্বের অনেক দেশ যেমন দক্ষিণ কোরিয়া বা ভিয়েতনাম, ঋণ নিয়েও কৌশলগত বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করেছে। তাদের মতো দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাস করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য ঋণ একটি প্রয়োজনীয় হাতিয়ার হলেও তা ব্যবহারে চাই সর্বোচ্চ সতর্কতা, দক্ষতা ও দায়িত্ববোধ। বর্তমান সরকার যেসব বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেগুলোর লাভ যদি ভবিষ্যতে ফেরত না আসে, তাহলে এই ঋণের বোঝা বইতে হবে আগামী প্রজন্মকে—যারা এখনো জন্মই নেয়নি কিংবা বই-খাতা হাতে স্কুলে যাচ্ছে।
তাই এখনই সময় ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা, দুর্নীতি রোধ করা এবং আয়বর্ধক খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করার। পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতন ও সম্পৃক্ত করতে হবে, যেন তারা বুঝতে পারে—আজকের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত আগামী দিনের জীবনযাত্রাকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে। একটি সুপরিকল্পিত, টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি গড়ে তুললেই কেবল আমরা নিশ্চিত করতে পারি—ঋণের বোঝা নয়, বরং এক সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎই হোক আমাদের উত্তরসূরিদের প্রাপ্তি।

