কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের মানসম্মত চামড়া রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো আধুনিক সংরক্ষণ কাঠামো। অথচ তৈরি পোশাকশিল্পের পরেই দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চামড়া শিল্পের অবস্থান।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয় হয়েছে ৪ হাজার ৮২৮ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের (২০২৩-২৪) তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। তখন রপ্তানি হয়েছিল ৩ হাজার ৯৩৪ কোটি ডলার।
তবে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা মনে করছেন, মান বজায় রেখে উৎপাদন করতে পারলে এ খাত আবারও ফিরে পেতে পারে আগের গৌরব। রপ্তানি বাড়বে, চাঙা হবে দেশের অর্থনীতি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ কারখানায় এখনো বিশ্বমানের পরিবেশ নেই। ফলে মানসম্মত কাঁচা চামড়া সংগ্রহে ব্যর্থ হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে রয়েছে চামড়া ব্যবসায়ীদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটও। কমছে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া ঋণের পরিমাণ। তুলনায় চীনের চামড়া শিল্প এগিয়ে, যার ফলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।
চামড়া খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, সংকট কাটাতে সরকারের উচিত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। উল্লেখযোগ্যভাবে, সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) দুই দশকেও পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি। এতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রক্ষা করা বেশিরভাগ কারখানার পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না। অর্থনীতিবিদদের মতে, চামড়া শিল্পে সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে কর্মসংস্থান বাড়বে। তবে প্রয়োজন স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা এবং মানসম্পন্ন অবকাঠামো। এতে উদ্যোক্তারা নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করতে পারবেন।
তবে বড় একটি বাধা হলো, লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (LWG)–এর পরিবেশগত সনদ না থাকায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ প্রায় ছিটকে পড়েছে বৈশ্বিক বাজার থেকে। এক সময় ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র ও কোরিয়ান ক্রেতারা বাংলাদেশমুখী থাকলেও এখন তারা ঝুঁকছেন চীনের দিকে। এরই মধ্যে চীনা ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে আবাসিক অফিস খুলে সরাসরি ট্যানারি ও আড়ত নিয়ন্ত্রণ করছেন। এতে করে দেশি ব্যবসায়ীরা পড়েছেন অসহায় অবস্থায়।
এর মধ্যেই গত ২৫ মে সরকার কাঁচা চামড়া ও ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছেন দেশীয় ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, এতে ট্যানারি মালিকদের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়বে। বাড়বে পরিবেশদূষণ, লোকসানে পড়বে পাদুকা ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। কাঁচা চামড়ার অভাবে উৎপাদন বন্ধ হলে মেশিন নষ্ট হবে, মূল্য সংযোজন কমে যাবে এবং রপ্তানি আয় ৩০–৪০ শতাংশ কমে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়বে শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের ওপর, যারা হয়ে পড়বেন বেকার।
বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ আউয়াল বলেন, “রপ্তানির অনুমতি না দিয়ে বরং কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। এতে বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে। পাশাপাশি পশু পালনে সরকারের মনোযোগ বাড়ানো দরকার। এতে মানসম্পন্ন চামড়ার জোগান বাড়বে, যা শিল্পের জন্য ইতিবাচক।”
তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পণ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণ নিশ্চিত না করা গেলে রপ্তানি ব্যাহত হবে। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে মানোন্নয়ন, আধুনিকায়ন এবং সংরক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে। তা হলে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—দুটিই অর্জন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারেও টিকে থাকা সহজ হবে। বিশ্লেষকদের আশা, সরকার চামড়া শিল্পকে ঘিরে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে এবং সম্ভাবনাময় এ খাতকে এগিয়ে নিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

