রাজধানীর বিমানবন্দর থেকে কুড়িল বিশ্বরোড হয়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার পিতলগঞ্জ ও কমলাপুর পর্যন্ত পাতাল ও উড়ালপথের মেট্রোরেল প্রকল্প (এমআরটি-১)-এর ব্যয় ৭৫ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশি উন্নয়ন সংস্থা থেকে পিএ খাতে ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা ঋণ পাওয়া গেছে। তবে ব্যয় বাড়লে প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে আনুমানিক ২ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা খরচ হতে পারে। গতকাল রবিবার (১৭ আগস্ট) রাতেই এমআরটি-১ প্রকল্পের পরিচালক মো. আবুল কাসেম ভূঁঞা এই তথ্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন।
ঢাকার প্রথম পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণের লক্ষ্যে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) বাস্তবায়ন করছে ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-১)। অনুমোদিত প্রাক্কলিত ব্যয় ৫৩ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
এমআরটি-১ পাতাল ও উড়াল রুট মিলিয়ে মোট ৩১ দশমিক ২৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ। এটি ১২টি প্যাকেজে বাস্তবায়িত হবে। ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়ন (প্যাকেজ সিপি-০১) ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ১১টি প্যাকেজের ক্রয়-প্রক্রিয়া বিভিন্ন ধাপে অগ্রসর।
প্রকল্প কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যয় বৃদ্ধিতে মূল দায় ঠিকাদারদের। ১২টি প্যাকেজের মধ্যে এখন পর্যন্ত আটটির দরপত্র জমা পড়েছে। একটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। এর মধ্যে চারটি জাপানি, দুটি চীনা ও দুটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে। তিনটি প্যাকেজে বাংলাদেশি কন্ট্রাক্টর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সহযোগী হিসেবে যুক্ত রয়েছে। ঠিকাদাররা যে দর চাচ্ছেন, তা ডিপিপি অনুমানের তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমান বাস্তবায়িত ও চলমান প্যাকেজের দর এবং প্রাক্কলন অনুযায়ী প্রকল্প ব্যয় এখন ৫৯ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা। নির্মাণ খরচ কিলোমিটারপ্রতি ১ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা।
প্রকল্প কর্মকর্তারা ব্যয় বৃদ্ধির দুটি মূল কারণ ব্যাখ্যা করেছেন:
- প্রথমত, অর্থনৈতিক ও বাজারভিত্তিক কারণে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ৪২ শতাংশ বেড়েছে (প্রতি ডলার ৮৪.৫০ টাকা থেকে ১২০ টাকা)। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি নির্মাণ উপকরণের দাম বাড়িয়েছে। একই সময়ে শ্রম মজুরি, পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যয়ও বেড়েছে।
- দ্বিতীয়ত, প্রকৌশল ও নকশাভিত্তিক কারণে। প্রাথমিক সমীক্ষার ভিত্তিতে তৈরি ডিপিপির তুলনায় বাস্তব নির্মাণের জন্য নকশায় একাধিক সংযোজন, পরিবর্তন ও পরিমার্জন অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকায় পাতাল রেল নির্মাণের ঝুঁকি বিবেচনায় ফিজিক্যাল ও প্রাইস কন্টিজেন্সি খাতে যথাযথ সংস্থান রাখা হয়েছে।
ব্যয় বৃদ্ধির পরও প্রকল্প কর্মকর্তারা ডিপিপি সংশোধনে আপত্তি জানাচ্ছেন। তারা বলছেন, বর্তমান সময়ে ডিপিপি সংশোধন করলে চূড়ান্ত ব্যয় প্রতিফলিত হবে না। ভবিষ্যতে আবার সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া ১২টি প্যাকেজের দরপত্র প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। তাই তাৎক্ষণিক সংশোধন বাস্তবসম্মত নয়।
প্রকল্পের নির্মাতা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জাইকা। প্যাকেজ সিপি-০৩-এর পুনঃদরপত্র আহ্বানে জাইকার সম্মতির অপেক্ষা চলছে। এই প্যাকেজের ভূমি অধিগ্রহণও সম্পূর্ণ হয়নি। চূড়ান্ত হিসাব বাজারমূল্য, সরকারি মূল্যায়ন, ক্ষতিপূরণের হার ও পুনর্বাসন ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল।
সরকারি খাতের প্রকল্প সংশোধন সংক্রান্ত নির্দেশিকা (জুন ২০২২) অনুযায়ী, প্রকল্প সর্বোচ্চ দুবার সংশোধন করা যাবে। অতিরিক্ত সংশোধন নিরুৎসাহিত। তাই প্রকল্প কর্মকর্তারা ডিপিপি সংশোধন না করার পক্ষে। ক্রয়-প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে জাইকার সম্মতি রয়েছে। তারা অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়ে অবগত।

