ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন বর্তমানে ফ্রান্সভিত্তিক কেজ বিজনেস স্কুলের সিনিয়র অধ্যাপক এবং জিওপলিটিকস ল্যাবের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি অ্যাবেরিস্টউইথ ইউনিভার্সিটি ও সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটিতে (যুক্তরাজ্য), কিং আবদুল আজিজ ইউনিভার্সিটিতে (সৌদি আরব) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির ট্রিনিটি কলেজ থেকে এমফিল এবং পরে সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। আন্তর্জাতিক ব্যবসা, জ্ঞান ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল উদ্ভাবন, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) এবং ভূরাজনীতি তার গবেষণা ও আগ্রহের মূল ক্ষেত্র।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের জন্য সামনের দিনগুলোয় সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি কোনটি? সামরিক, সাইবার নাকি অর্থনৈতিক?
ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন: অবশ্যই অর্থনৈতিক। বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিমান রাষ্ট্রগুলো আধিপত্য বিস্তার করছে। এর বড় উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী হলেও বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে থাকায় বাণিজ্য ও শুল্ককে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এ থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হলো অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধি। সামরিক বা সাইবার হুমকি ব্যবস্থাপনাযোগ্য। প্রয়োজনীয় সম্পদ থাকলে এগুলো মোকাবেলা করা সম্ভব। আমি গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোর উদাহরণ দিয়ে একটি মডেলে দেখিয়েছি যে অর্থনৈতিক অবস্থা শক্তিশালী হলে প্রতিরক্ষা বাজেটও শক্তিশালী হয়। আর পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা বাজেট থাকলে সামরিক বা সাইবার—উভয় খাতের নিরাপত্তাই নিশ্চিত করা সহজ হয়। সুতরাং একটি দেশের টেকসই ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে নির্ধারক নিয়ামক হলো অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন এবং পণ্যের বৈচিত্র্যায়ণের মাধ্যমে সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা শক্তিশালী করা।
প্রশ্ন: যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক বাণিজ্য সংকটে বাংলাদেশের করণীয় কী?
ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন: যুক্তরাষ্ট্র তার দৃষ্টিকোণ থেকে নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করছে। ফলে আমাদের মতো দেশগুলো একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়েছে। এর মূল কারণ হলো আমাদের অর্থনীতি মূলত জনশক্তি রফতানি ও তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের বহুমুখীকরণের পথে হাঁটতে হবে। প্রথমত, পণ্যের বহুমুখীকরণ। আমাদের উদ্যোক্তাদের তৈরি পোশাক খাতের বাইরে নতুন নতুন সম্ভাবনাময় খাত খুঁজে বের করতে হবে। সে অনুযায়ী বিনিয়োগ ও উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বাজারের বহুমুখীকরণ। আমাদের প্রচলিত বাজারের বাইরে নতুন বাজার খুঁজতে হবে। আফ্রিকার সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখনো যথেষ্ট বিকশিত হয়নি। আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো আমাদের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় নতুন বাজার হতে পারে। এ দুটি দিকে অর্থাৎ নতুন পণ্য ও নতুন বাজার—মনোযোগ দিতে পারলে একক কোনো খাতের ওপর আমাদের নির্ভরতা যেমন কমবে, তেমনি একক কোনো দেশের বাণিজ্য নীতির কারণে সৃষ্ট ঝুঁকিও মোকাবেলা করা সহজ হবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের প্রবাসীদের ওপর থেকেও চাপ কমে আসবে।
প্রশ্ন: বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণ করতে হলে প্রচলিত গন্তব্যগুলোর বাইরে অন্যান্য দেশে আর কোন কোন পণ্য রফতানির সম্ভাবনা দেখছেন?
ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন: আমাদের সম্ভাবনাময় অনেক খাত রয়েছে। আমাদের অনেক কৃষিপণ্য আছে। সেগুলো নতুন বাজারে প্রায় অপরিচিত। সঠিক বিপণন ও সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে নতুন বাজারে আমরা এসব পণ্যের চাহিদা তৈরি করতে পারি। কৃষিপণ্য ছাড়াও আইটি, চামড়াজাত পণ্যের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া স্বল্প ব্যবহৃত পণ্যগুলোর বাজার আমাদেরই উদ্যোগী হয়ে তৈরি করতে হবে। ফলে পণ্য ও বাজার উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের বৈচিত্র্যায়ণ ঘটাতে হবে। আমরা তৈরি পোশাকের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে তাদের নীতির সামান্য পরিবর্তনেই আমাদের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়।
বহুমুখীকরণ হলে এ সংকটজনক পরিস্থিতি আর থাকবে না। এরই মধ্যে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বাজার খুঁজছে। পণ্যের বৈচিত্র্যায়ণ করছে। ফলে তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতাও কমছে। আমি মনে করি, যুক্তরাষ্ট্রের এ সংরক্ষণবাদী বাণিজ্য নীতি দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো এর থেকে শিক্ষা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর থেকে তাদের নির্ভরতা কৌশলগতভাবেই কমিয়ে আনবে। সুতরাং তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য সম্ভাবনাময় পণ্য নিয়ে নতুন বাজারে প্রবেশ করাই হবে আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার মূল চাবিকাঠি।
প্রশ্ন: অন্তর্বর্তী সরকার আসিয়ানের সদস্যপদ লাভের জন্য বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে। বাংলাদেশ আসিয়ানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে কী ধরনের সম্ভাবনা দেখছেন?
ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন: আসিয়ান জোটে পূর্ণ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া বাংলাদেশের জন্য সহজ হবে না। এর প্রধান কারণ ভৌগোলিক। অর্থাৎ সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নৈকট্যের অভাব। এটিই সবচেয়ে বড় প্রায়োগিক বাধা। এ ভৌগোলিক দূরত্বের কারণেই বাংলাদেশের পূর্ণ সদস্যপদ পাওয়া বেশ কঠিন। তবে হাল ছেড়ে দেয়া উচিত হবে না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে অগ্রসর হতে হবে। বিশেষ করে এ জোটের প্রভাবশালী দুই সদস্য—ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াকে—বিশেষভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে হবে।
বাংলাদেশকে যেকোনো আঙ্গিকে এ জোটে অন্তর্ভুক্ত করার সুবিধাগুলো তাদের কাছে তুলে ধরতে হবে। পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ কঠিন হলেও ‘খাতভিত্তিক অংশীদারত্ব’ (সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার) অর্জন করা সম্ভব। বাংলাদেশের প্রাথমিক লক্ষ্য সেটিই হওয়া উচিত। যদি সরকারি পর্যায়ে নিবিড়ভাবে কাজ করা যায় এবং নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো যায়, তাহলেও এ প্রক্রিয়ায় কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। এর জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি ও গবেষণার প্রয়োজন। মূলত ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াকে পাশে পাওয়া গেলে একটি সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় সরাসরি পূর্ণ সদস্যপদ পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
প্রশ্ন: বিশ্বের দুই শীর্ষ অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক অনেক সমীকরণ রয়েছে। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালনা করা যেতে পারে?
ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন: এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ‘কূটনৈতিক বিচক্ষণতা’ বা অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার একটি চৌকস কৌশল নিতে হবে। বাস্তবতা হলো, আমাদের শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য চীন থেকে সুলভ মূল্যে কাঁচামাল আমদানি করা অপরিহার্য। চীন থেকে প্রচুর পরিমাণ আমদানি করা হচ্ছে। এটি আমাদের শিল্পকে টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর পরিমাণ রফতানি করছি। সেজন্য বাণিজ্য শুল্কের বিষয়টি সামনে এসেছে। এটি কেবল বাংলাদেশের জন্যই নয়, বরং বিভিন্ন দেশের জন্য। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয় দেশকে ধীরে ধীরে বোঝাতে হবে, দেশের অর্থনীতির জন্য সস্তায় চীন থেকে পণ্য কিনতে হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তুষ্ট হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
তাছাড়া সুলভ মূল্যে কাঁচামাল আমদানির কারণে সে পণ্যটি যুক্তরাষ্ট্রেই রফতানি করছি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের প্রধান রফতানি বাজার। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে সম্প্রতি কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ কোম্পানি বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ ক্রয় বা দেশটি থেকে গম আমদানির সিদ্ধান্ত এক ধরনের অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার প্রয়াস। এছাড়া এর মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়া হয়েছে। যদিও তারা জানে যে দীর্ঘমেয়াদে চীনের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অপরিহার্য থাকবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কোনো একটি নির্দিষ্ট পক্ষের দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে না পড়া। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান এবং পারিপার্শ্বিকতার কারণে সব পক্ষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলাই সবচেয়ে বিচক্ষণ নীতি। এক্ষেত্রে আবেগ বা অনুভূতির কোনো স্থান নেই। থাকতে হবে কঠোর পেশাদারত্ব। একই নীতি আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাদের নিরাশ না করে বা তাদের বিরুদ্ধে না গিয়ে, পারস্পরিক দেয়া-নেয়ার ভিত্তিতে একটি যৌক্তিক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত—এ তিন প্রধান শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অত্যন্ত পরিপক্বতার পরিচয় দিতে হবে। আমাদের নীতিনির্ধারণে সেই বিচক্ষণতার প্রতিফলন থাকতে হবে।
প্রশ্ন: রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আমাদের কূটনৈতিক ব্যর্থতার মূল কারণ কী?
ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন: এর প্রধান কারণ হলো শুরু থেকেই একটি সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক কর্মপন্থার অভাব। বিভিন্ন সময়ে সরকারের ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি থাকলেও চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোটা নিশ্চিত করতে আমরা সম্মিলিতভাবে ব্যর্থ হয়েছি। আন্তর্জাতিক ফোরামে আমাদের আরো কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন ছিল, যা কেবল মানবিক সহায়তা গ্রহণেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত ছিল না।
প্রশ্ন: এ অচলাবস্থা থেকে বের হওয়ার বাস্তবসম্মত উপায় কী?
ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন: এর সমাধানে একটি ত্রিদেশীয় কূটনৈতিক তৎপরতা অপরিহার্য, যেখানে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীন একসঙ্গে কাজ করবে। চীন ঐতিহাসিকভাবে আমাদের বন্ধুপ্রতিম এবং মিয়ানমারের ওপর তাদের প্রভাব রয়েছে। চীনকে ‘মধ্যস্থতাকারী’ বা অভিভাবকের ভূমিকায় রেখে মিয়ানমারের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বকেও মিয়ানমারের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক স্থাপন করতে দেখা যাচ্ছে। আমাদের উচিত এসব দেশকে নিয়মিত আমাদের অগ্রগতির বিষয়ে অবহিত রাখা এবং বোঝানো যে এ বিশাল জনগোষ্ঠীর ভার বহন করা আমাদের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় একটি ঝুঁকি।
প্রশ্ন: রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন ওঠে এবং কখনো কখনো একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনের কথাও শোনা যায়। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মূলনীতি কী হওয়া উচিত?
ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন: এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার হওয়া উচিত। আমরা কোনোভাবেই বিচ্ছিন্নতাবাদের দর্শনকে সমর্থন করতে পারি না। আমাদের নিজেদের সার্বভৌমত্ব যেমন আমাদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়, তেমনি মিয়ানমারের অখণ্ডতার প্রতিও আমাদের শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো শান্তি ও উন্নয়ন, কোনো সংঘাত নয়। এ সংকটে বাংলাদেশকে কোনো অনুগত রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতাকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবেলা করে, চোখে চোখ রেখে ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ আদায় করতে হবে।
প্রশ্ন: ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কার্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হচ্ছে। এ উদ্যোগের মূল সম্ভাবনা ও ঝুঁকিগুলো কী কী বলে আপনি মনে করেন?
ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন: আমি এটিকে একটি ইতিবাচক ও সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে দেখি। এর প্রধান সুবিধা হলো, এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি বৃদ্ধি করবে। যেভাবে একটি স্বনামধন্য বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস বা বিশ্বব্যাংক, এডিবির মতো প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক কার্যালয় একটি দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করে, জাতিসংঘের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ও আমাদের দেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করবে। এর কার্যক্রম কেবল প্রশিক্ষণে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি মানবাধিকার, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি ‘নজরদারি’ বা ওয়াচডগ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে।
সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো এ কার্যালয় যদি সফলভাবে কাজ করতে পারে, তবে ভবিষ্যতে এটিকে দক্ষিণ এশিয়ার ‘আঞ্চলিক কার্যালয়ে’ উন্নীত করা সম্ভব। তেমনটি হলে বাংলাদেশ এ অঞ্চলের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ পাবে, যা আমাদের ভাবমূর্তিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। আমি জানি, কিছু রক্ষণশীল ও ধর্মীয় রাজনৈতিক দল এর বিরোধিতা করছে। তাদের আশঙ্কা, এটি হয়তো আমাদের সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ রয়েছে। যতদূর জানি, চুক্তি অনুযায়ী এ কার্যালয়ের কার্যক্রম যদি দেশের সংস্কৃতি, ধর্ম ও মূল্যবোধের পরিপন্থী হয়, তবে বাংলাদেশ সরকার যেকোনো সময় এটি বন্ধ করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। যেহেতু সে সুযোগ আমাদের হাতে থাকছে, তাই আমি মনে করি এটিকে কাজ শুরু করার সুযোগ দেয়া উচিত। তবে শর্ত হলো, কার্যালয়টিকে অবশ্যই আমাদের স্থানীয় সংস্কৃতি, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ও সামাজিক মূল্যবোধকে সম্মান করে তার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
প্রশ্ন: ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের বাস্তবতা, সম্ভাবনা ও ঝুঁকি কীভাবে দেখছেন?
ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন: প্রথমত, জনগণের মধ্যে ভোট দেয়ার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন পর মানুষ একটি সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাবই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বর্তমানে তিনটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি মাঠে রয়েছে—বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও নতুন দল এনসিপি। বিএনপি চায় দ্রুত নির্বাচন হোক। অন্যদিকে এনসিপি নিজেদের গুছিয়ে নেয়ার জন্য আরো সময় নিতে আগ্রহী। জামায়াতে ইসলামীরও আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মতো নিজস্ব কিছু দাবি-দাওয়া রয়েছে। এ দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে নির্বাচন আয়োজন কঠিন হবে। তবে আমার ধারণা, রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা বর্তমান সরকার একটি ‘নিরাপদ প্রস্থান’ বা সেফ এক্সিটের জন্য নির্বাচন আয়োজনে আগ্রহী এবং শেষ পর্যন্ত সেদিকেই অগ্রসর হতে পারে।
প্রশ্ন: রাজনৈতিক দলগুলোর এ ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের কারণে আগামী দিনে আমরা কী ধরনের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ বা জোটের সম্ভাবনা দেখতে পারি?
ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন: আগামী দিনে দুটি সম্ভাব্য জোটের সমীকরণ তৈরি হতে পারে। একটি হলো বিএনপি ও এনসিপির জোট, অন্যটি হলো জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির জোট। এনসিপি কোনদিকে যাবে তা নির্ভর করবে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাবনিকাশের ওপর। বিএনপি দেশের একটি বৃহৎ দল। তাদের প্রার্থীসংখ্যা অনেক, যা অভ্যন্তরীণভাবে ব্যবস্থাপনা করাও একটি চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলনও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি, যাদের উপেক্ষা করা যাবে না। দলগুলোর মধ্যে যদি দেশ পরিচালনায় যাওয়ার মতো সদিচ্ছা থাকে, তবেই একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক সরকার গঠন সম্ভব হবে।
প্রশ্ন: নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কীভাবে দেখছেন?
ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন: আমার পর্যবেক্ষণ হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন এসেছে। আগামীতে বিএনপি, জামায়াত বা এনসিপি—যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, আগের মতো দমনমূলক শাসন চালানোর সুযোগ আর পাবে না। দেশের মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। কোনো সরকার তেমন চেষ্টা করলে গণ-আন্দোলন অথবা সুসংগঠিত রাজনৈতিক প্রতিবাদের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হবে। কোনো সরকারই আর ‘ফ্রি রাইড’ পাবে না। দ্বিতীয়ত, আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই, ডিজিএফআই) ও পুলিশ বাহিনী, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু শিখেছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে ফেলার প্রয়োজন নেই। বরং শৃঙ্খলা ও পেশাদারত্বের মাধ্যমে তাদের পুনর্গঠন করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক শক্তি আগের মতো সহজে এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে না। জনগণ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান—উভয়ের এ নতুন ভূমিকাই হবে আগামী দিনের বাংলাদেশের রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি।
প্রশ্ন: আগামী এক বা দুই দশকে বাংলাদেশকে কোন জায়গায় দেখতে চান?
ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন: আমি অত্যন্ত আশাবাদী। স্বপ্ন ও সম্ভাবনার দিক থেকে দেখলে বাংলাদেশ নিয়ে ইতিবাচক না হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমার এ আশার মূল ভিত্তি দেশের সাধারণ উদ্যমী মানুষ, বিশেষ করে আমাদের অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা। ঢাকার রাস্তায় যানজট সৃষ্টিকারী একজন ফলবিক্রেতাকে দেখে আগে বিরক্ত হতাম। কিন্তু এখন আমি ভাবি, এ মানুষগুলো সরকারি সহায়তা ছাড়াই নিজেরা ৫-১০ হাজার টাকা পুঁজি দিয়ে দিনে ১২-১৪ ঘণ্টা পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করছে। দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান বিশাল। আমাদের কাজ তাদের উচ্ছেদ করা নয়, বরং শৃঙ্খলার মধ্যে আনা। চাঁদাবাজির বদলে তাদের যদি বলা হয়, ‘আপনি পুরো রাস্তা না নিয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ব্যবসা করুন’, তাহলে নগরজীবন ও তাদের জীবিকা—দুটোই বাঁচে।
এ তৃণমূলের সম্ভাবনাকে জাতীয় পর্যায়ে কাজে লাগাতে হলে আমাদের কিছু মৌলিক জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের মধ্যে মূল্যবোধ, নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মতো বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সুশাসন বা জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো শুধু কেতাবি শব্দ হিসেবে না রেখে সাধারণ মানুষকে এর অর্থ ও গুরুত্ব বোঝাতে হবে। সূত্র: বনিক বার্তা

