বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল ও চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মুখোমুখি। মহামারির পর থেকে আর্থিক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চললেও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের চাপ অর্থনীতিকে কঠিন অবস্থায় ফেলেছে। সরকারের ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদের বোঝা। এতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হচ্ছে এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলো বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ছে।
উচ্চ সুদের হার এবং ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির কারণে জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ এখন ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ সীমিত হয়ে পড়ছে। মেগা প্রকল্পগুলোর ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের হার বাড়তে থাকায় এই চাপ আরও তীব্র হয়েছে। এর ফলে ঋণের বোঝা শুধু সরকারের আর্থিক নীতিতেই নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভাবনাকেও উদ্বেগজনক অবস্থায় ফেলেছে।
চলতি অর্থবছরের জন্য উপস্থাপিত বাজেট এই কারণে বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। স্বাধীনতার পর এবারই প্রথম বাজেটের আকার আগের বছরের তুলনায় ছোট রাখা হয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সংসদে এই বাজেট উপস্থাপন করেছেন, যেখানে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ সামনের দিনগুলোতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে শুধুমাত্র সুদ পরিশোধের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা, যা পুরো বাজেটের প্রায় ১৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ। । এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ বাবদ রাখা হয়েছে ১ লাখ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ ২২ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই খাতে ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এক বছরে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বৃদ্ধিই প্রমাণ করে যে, ঋণের সুদ পরিশোধ এখন বাজেটের জন্য ক্রমেই বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি অর্থবছরের শেষে সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় সাড়ে ২৩ লাখ কোটি টাকা। এত বিপুল পরিমাণ ঋণ আগামী দিনে যে কোনো সরকারের জন্য বড় ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল একসঙ্গে পরিশোধের চাপ, কারণ বহু মেগা প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ফলে শুধু সুদ নয়, মূল অর্থও ফেরত দিতে হচ্ছে সরকারকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিকে বলা যায় “ঋণের সুদে ব্যয়ের বিস্ফোরণ”। ঋণ পরিশোধে সুদের অঙ্ক এত দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে যে, তা সরকারের সামগ্রিক ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করছে। এর মূল কারণ হলো বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির কারণে সুদের হার বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যাওয়া এবং টাকার অবমূল্যায়ন। একই ঋণ পরিশোধ করতেও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতিও প্রমাণ করে যে ঋণের সুদ একটি বড় বোঝা হতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ- যুক্তরাষ্ট্রকে সম্প্রতি তাদের জাতীয় ঋণের সুদ বাবদ ১ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে, যা তাদের বাজেটের একটি বিশাল অংশ দখল করেছে। বাংলাদেশেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদেশি ঋণ পরিশোধে রেকর্ড ৩৩৬ কোটি ডলার ব্যয় করেছে, যার মধ্যে প্রায় ১৩৫ কোটি ডলার গিয়েছে কেবল সুদ পরিশোধে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই পরিচালন ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি গেছে সুদ পরিশোধে যার পরিমাণ ৪২ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। এসব তথ্য প্রমাণ করে, ঋণের সুদ এখন বাজেট ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করছে।
বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে ঋণের সুদের হার বাজারভিত্তিক করার কারণে তা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সুদের হার ১৪ শতাংশ থেকে বেড়ে কোথাও কোথাও ১৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এত উচ্চ সুদের হারের ফলে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ নেওয়া ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে, ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগ বা ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা থেকে সরে আসছে। এতে শুধু উৎপাদনশীলতা কমছে না, সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের চাপও বাড়ছে। টাকার অবমূল্যায়নের কারণে একই ঋণ পরিশোধে এখন অনেক বেশি টাকার প্রয়োজন হচ্ছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে করের বোঝা এবং রাজস্ব আহরণের সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। নতুন অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা না বাড়ায় সাধারণ জনগণের ওপর চাপ বেড়েছে। অন্যদিকে আমদানি হ্রাস ও কর ফাঁকি বৃদ্ধির কারণে রাজস্ব ঘাটতি বাড়ছে।
সরকার কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর চেষ্টা করলেও বাস্তবে তা উল্টো হ্রাস পাচ্ছে। ২০২৩ সালে কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ৭ দশমিক ৪ শতাংশ, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশে, যা এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড় কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং বিশ্ব অর্থনীতির গড় অনুপাত প্রায় ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ হলেও বাংলাদেশ এই খাতে অনেক পিছিয়ে। এই নিম্ন অনুপাত প্রমাণ করে দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ দুর্বল, যা উন্নয়নমূলক লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বাঁধা সৃষ্টি করছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে কর ফাঁকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। অপরদিকে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এনবিআর সংগ্রহ করেছে মাত্র ৩ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা। এতে স্পষ্ট হয়, কর ফাঁকি রোধ এবং কর আদায় দক্ষতা বাড়ানো না গেলে রাজস্ব ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না।
ঋণের সুদের চাপ কমাতে হলে প্রথমেই সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনা জরুরি। বাজেট বাস্তবায়নে অপচয় ও দুর্নীতি রোধ, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস এবং রাজস্ব আহরণের উৎস বাড়ানো দরকার। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো গেলে সরকারের ঋণনির্ভরতা কমবে।
ব্যাংক খাতে সংস্কার প্রয়োজন। এই জন্য খেলাপি ঋণ কমানো, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ানো এবং বড় উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণসীমা যুক্তিযুক্তভাবে বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগীদের কাছ থেকে স্বল্পসুদে ঋণ নেওয়া এবং উচ্চসুদ ঋণকে কমসুদে রূপান্তর করার কৌশল গ্রহণ অতীব জরুরি। সামাজিক খাতেও সংস্কার প্রয়োজন। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধ এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতা স্থিতিশীল করা গেলে সরকারের আর্থিক চাপ কিছুটা লাঘব হবে।
সব মিলিয়ে ঋণের সুদ দেশের বাজেট কাঠামো ও উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য এখন বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠছে। কার্যকর ঋণ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছ বাজেট বাস্তবায়ন, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাত সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সুদ কমানোর কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব। ঋণের বোঝা কমানো এবং সুদের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা কেবল অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার জন্যই নয়, সামাজিক ও উন্নয়নমূলক লক্ষ্য অর্জনের জন্যও অত্যন্ত জরুরি।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন কার্যকর ঋণ ব্যবস্থাপনা, বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক ঋণে কম সুদের সুযোগ নেওয়া। এছাড়া ব্যক্তিগত বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ উৎসাহিত করতে সুদের হার যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ে রাখা জরুরি। যদি এসব পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে দেশের অর্থনীতি শুধুমাত্র ঋণের বোঝা সামলাতে সক্ষম হবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ঋণের বোঝা কমানো এবং সুদের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা কেবল অর্থনৈতিক দিকেই নয়, দেশের সামাজিক ও উন্নয়নমূলক লক্ষ্য অর্জনের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাখার জন্য এটি আর সময়োপযোগী নয়, এটি এখন নিত্যপ্রয়োজনীয়।

