নতুন নির্মিত সেতুতে অতিরিক্ত মাশুল আরোপ করে বিনিয়োগের অর্থ তুলছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এবার একই নিয়ম পুরনো সেতু ও কালভার্টেও কার্যকর করা হয়েছে।
রেলের পূর্বাঞ্চল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১১টি সেতুতে নিয়মিতভাবে পন্টেজ চার্জ আরোপের ফলে ২০ ডিসেম্বর থেকে সব যাত্রীবাহী ট্রেনের ভাড়া বাড়ানো হবে। এতে সর্বোচ্চ ভাড়া ২০০ টাকারও বেশি বাড়তে পারে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর গতকাল পূর্বাঞ্চল রেলের বাণিজ্যিক বিভাগ নতুন ভাড়া কার্যকর করার অনুমোদন দিয়েছে। তাই ২০ ডিসেম্বর থেকে টিকিট ক্রয়ে যাত্রীদের বাড়তি খরচ গুনতে হবে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যেই পুরনো সেতু ও কালভার্টের ওপর পন্টেজ চার্জ আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ১০০ মিটার বা তার বেশি দৈর্ঘ্যের ব্রিজ ও কালভার্টের ডিসট্যান্স চার্ট অনুযায়ী চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ২৫ নভেম্বর রেলের উপপরিচালক (মার্কেটিং) শাহ আলম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়, নতুন ভাড়া ২০ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে। এরপর ৮ ডিসেম্বর সহকারী প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া নতুন ভাড়া কার্যকর ও জনস্বার্থে প্রচারের অনুমোদন দেন। এ অনুযায়ী পূর্বাঞ্চলের ট্রেনের সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ টাকা বাড়ছে, আর সর্বোচ্চ ২২৬ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে নতুন পন্টেজ চার্জ আরোপ করেছে। এর ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-কক্সবাজার ও ঢাকা-সিলেট রুটসহ বেশ কিছু রুটে যাত্রীদের ভাড়া বেড়েছে। পুরনো নিয়মে প্রতি কিলোমিটার সেতুর জন্য ১৭ কিলোমিটার দূরত্ব বিবেচনা করা হতো। নতুন নিয়মে প্রতি কিলোমিটার সেতুকে ২৫ কিলোমিটার ধরে ভাড়া নেওয়া হবে। পূর্বাঞ্চলের সাধারণ ট্রেন (আন্তঃনগর, মেইল ও কমিউটার) ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের বর্তমান একমুখী ভাড়া ৩৪৬ কিলোমিটার। পন্টেজ চার্জের পরে দূরত্ব বেড়ে ৩৮১ কিলোমিটার হয়েছে।
ফলে ভাড়া বৃদ্ধির হিসাব দাঁড়াচ্ছে:
- মেইল ট্রেন: ১৫ টাকা
- কমিউটার: ২০ টাকা
- শোভন চেয়ার: ৪৫ টাকা
- প্রথম সিট: ৬৪ টাকা
- স্নিগ্ধা: ৮০ টাকা
- প্রথম বার্থ ও এসি সিট: ৯৮ টাকা
- এসি বার্থ: ১৪৩ টাকা
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের বিরতিহীন ট্রেনে ভাড়া বৃদ্ধি:
- শোভন চেয়ার: ৪৯ টাকা
- প্রথম সিট: ৬৯ টাকা
- স্নিগ্ধা: ৮৮ টাকা
- প্রথম বার্থ ও এসি সিট: ১০৮ টাকা
- এসি বার্থ: ১৫৯ টাকা
মধ্যবর্তী স্টেশনগুলোর সেকশন অনুযায়ীও পন্টেজ চার্জের হিসাব করে ভাড়া বৃদ্ধি করা হবে। ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা রুটে একমুখী দূরত্ব ৫৩৫ কিলোমিটার থেকে বেড়ে ৫৮৬ কিলোমিটার হয়েছে। ফলে ভাড়া বৃদ্ধি:
- মেইল ট্রেন: ২০ টাকা
- কমিউটার: ২৫ টাকা
- শোভন চেয়ার: ৬০ টাকা
- প্রথম সিট: ৯২ টাকা
- স্নিগ্ধা: ১১৫ টাকা
- প্রথম বার্থ ও এসি বার্থ: ১৩৮ টাকা
- এসি বার্থ: ২০৭ টাকা
বিরতিহীন ট্রেনে একই রুটের ভাড়া বৃদ্ধি:
- শোভন চেয়ার: ৬৪ টাকা
- প্রথম সিট: ১০১ টাকা
- স্নিগ্ধা: ১২৭ টাকা
- প্রথম বার্থ: ১৫১ টাকা
- এসি সিট: ১৫০ টাকা
- এসি বার্থ: ২২৬ টাকা
ঢাকা-সিলেট-ঢাকা রুটের একমুখী দূরত্ব ৩১৯ কিলোমিটার থেকে ৩৫০ কিলোমিটার বেড়েছে। ভাড়া বৃদ্ধি:
- মেইল ও কমিউটার: ১৫ টাকা
- শোভন চেয়ার: ৩৫ টাকা
- প্রথম সিট: ৫৮ টাকা
- স্নিগ্ধা: ৬৯ টাকা
- প্রথম বার্থ ও এসি সিট: ৮০ টাকা
- এসি বার্থ: ১২৭ টাকা
চট্টগ্রাম-সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে একমুখী দূরত্ব ৩৯১ কিলোমিটার থেকে ৪০৩ কিলোমিটার হয়েছে। ভাড়া বৃদ্ধি:
- মেইল ও কমিউটার: ১০ টাকা
- শোভন চেয়ার: ২৫ টাকা
- প্রথম সিট: ৪০ টাকা
- স্নিগ্ধা: ৫২ টাকা
- প্রথম বার্থ ও এসি সিট: ৫৭ টাকা
- এসি বার্থ: ৮৭ টাকা
রেলওয়ের নতুন পন্টেজ চার্জ কার্যকর হওয়ায় ২০ ডিসেম্বর থেকে টিকিট ক্রয়ে যাত্রীদের বাড়তি খরচ গুনতে হবে। বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে নতুন পন্টেজ চার্জ আরোপ করেছে। এর ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-কক্সবাজার, ঢাকা-সিলেট, চট্টগ্রাম-জামালপুর এবং ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ রুটে ভাড়া বেড়েছে।
চট্টগ্রাম-জামালপুর-চট্টগ্রাম (ভায়া: ভৈরববাজার-ময়মনসিংহ) রুটের একমুখী দূরত্ব ৪৪৭ থেকে ৪৬৪ কিলোমিটার বেড়েছে। বাড়তি ১৭ কিলোমিটারের জন্য ভাড়া বৃদ্ধি: মেইল-কমিউটার ১০ টাকা, শোভন চেয়ার ২০ টাকা, প্রথম সিট ২৯ টাকা, স্নিগ্ধা ৩৪ টাকা, প্রথম বার্থ ও এসি সিট ৪৬ টাকা, এসি বার্থ ৬৯ টাকা।
ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা রুটের একমুখী দূরত্ব ২১২ থেকে ২১৬ কিলোমিটার হয়েছে। বাড়তি ৪ কিলোমিটার: মেইল ট্রেনে কোনো বৃদ্ধি নেই, তবে কমিউটার, শোভন চেয়ার ও প্রথম সিট ৫ টাকা, স্নিগ্ধা ১১ টাকা, প্রথম বার্থ ও এসি সিট ১২ টাকা এবং এসি বার্থ ১৭ টাকা বৃদ্ধি পাবে।
রেলওয়েসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে রেলের ভাড়া বাড়েনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভাড়া বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হলেও যাত্রীদের অসন্তোষের কারণে বাস্তবায়ন হয়নি। বর্তমানে পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে আয় সমন্বয় করতে রেলওয়ে বিকল্প পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার, এক্সট্রা কোচে ভ্রমণে ২০ ও ৩০ শতাংশ (এসি ও নন-এসি) বাড়তি ভাড়া, আসন সংরক্ষণ টিকিট ও কোচে বাড়তি ভাড়া এবং নন-এসি প্রথম শ্রেণীর টিকিটে ভ্যাট আরোপ।
সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের পর এক্সট্রা ডিসট্যান্স অব পন্টেজ চার্জ আরোপ করা হয়েছে। পদ্মা সেতুসহ পশ্চিমাঞ্চলের বড় সেতুতে প্রথমে পদ্ধতিটি প্রয়োগ করা হয়েছিল। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের পরও একই নিয়ম চালু রাখা হয়। এবার পূর্বাঞ্চলের সব সেতু ও কালভার্ট পর্যালোচনা করে ১০০ মিটার বা তার চেয়ে দীর্ঘ সেতুতে পন্টেজ চার্জ আরোপ করা হয়েছে।
বাণিজ্যিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রেলওয়ে লোকসানে যাত্রী পরিবহন করলেও নিয়মিত ভাড়া বৃদ্ধি কার্যকর করেনি। এবার আইনানুগভাবে কিছুটা ভাড়া বৃদ্ধি করে আয় বাড়াতে চাইছে। পূর্বাঞ্চলে নতুন ভাড়ার হার ইতিমধ্যে টিকিট বিক্রি ব্যবস্থাপনাকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সহজকে (জেভি) পাঠানো হয়েছে। ১০ ডিসেম্বর থেকে অগ্রিম টিকিটে যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া দিতে হবে।
পদ্মা সেতুতে ট্রেন চালুর সময় প্রতি কিলোমিটারকে ২৫ কিলোমিটার হিসেবে গণনা করে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল। ভায়াডাক্টের প্রতি কিলোমিটারকে পাঁচ কিলোমিটার ধরা হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশের ১০০ মিটারের ঊর্ধ্বে সেতু-কালভার্টে পন্টেজ চার্জ আরোপের নির্দেশনা দেওয়া হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ট্রেন চালুর সময়ও বেশ কয়েকটি সেতুতে চার্জ কার্যকর করা হয়েছিল। এবার সারা দেশের সব ১০০ মিটার বা তার বেশি দীর্ঘ সেতুতে পন্টেজ চার্জ আরোপ হচ্ছে। এতে ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা ও ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের ট্রেনগুলোর যাত্রী ভাড়া (আন্তঃনগর ট্রেন) সর্বনিম্ন ১৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২২৬ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।
ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বণিক বলেন, ‘রেলের ভাড়া ২০১৬ সালে সর্বশেষ বাড়ানো হয়েছিল। পশ্চিমাঞ্চলে পদ্মা সেতুসহ বেশ কয়েকটি অবকাঠামোতে পন্টেজ চার্জ আরোপ করা হলেও পূর্বাঞ্চলে করা হয়নি। এখন পূর্বাঞ্চলের মাত্র ১১টি সেতুর জন্য চার্জ যুক্ত করা হয়েছে। এতে ঢাকা-চট্টগ্রামের সর্বনিম্ন ভাড়া মাত্র ১৫ টাকা বেড়েছে। সাধারণ যাত্রীদের জন্য ভাড়া কম বৃদ্ধি করা হয়েছে।’ তিনি আরও জানিয়েছেন, সেতু স্থাপন ও মেরামতে বাড়তি বিনিয়োগের কারণে রেলওয়ে আইনের অধীনে ভাড়া বৃদ্ধি কার্যকর করা হয়েছে।

