বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক জটিল বাস্তবতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাঠামোগত দুর্বলতা আর উচ্চ সুদের চাপে অর্থনীতির শ্লথগতি যেভাবে বেড়েছিল, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাঝামাঝি এসে তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। কিছু সামষ্টিক সূচকে উন্নতির আভাস মিললেও বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সংকট এখনও তীব্র।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ স্টেট অব দ্য ইকোনমি ২০২৫’ প্রতিবেদনে এই বাস্তবচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সোমবার শেরেবাংলানগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এক সেমিনার হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জিইডি সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অতিরিক্ত সচিব ড. মুনিরা বেগম। প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী।
প্রথম প্রান্তিকে ধস, পরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানো
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে দাঁড়ায় মাত্র ২ শতাংশে—এমন নিম্ন প্রবৃদ্ধি শিল্প ও সেবা খাতে সরাসরি চাপে ফেলে। এসময় কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ০.৭৬%, শিল্পে ২.৪৪%, আর সেবায় ২.৪১%।
তবে দ্বিতীয় প্রান্তিক থেকে পরিস্থিতি কিছুটা বদলায়। শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হঠাৎই ৭.১%-এ লাফিয়ে ওঠে এবং তৃতীয় প্রান্তিকে তা ৬.৯১%। সার্বিকভাবে তৃতীয় প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪.৯% হয়।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন—এই পুনরুদ্ধার এখনো ভঙ্গুর।
উচ্চ সুদে থমকে গেছে বিনিয়োগ
মূল্যস্ফীতি দমনে বাংলাদেশ ব্যাংক গত ছয় মাস ধরে নীতি সুদহার ১০% ধরে রেখেছে। এর প্রভাব পড়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে—জুন ২০২৫-এ ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৭.১৫%, যা বিনিয়োগ সম্প্রসারণের জন্য যথেষ্ট নয়। এর ওপরে সরকারের ঋণ গ্রহণ বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে বেসরকারি খাতে অর্থ সরবরাহ আরও সংকুচিত হয়েছে। ফলে বিনিয়োগ পুরোপুরি কোণঠাসা।
শিল্প উৎপাদনে ওঠানামা, চাকরির বাজারে চাপ
অর্থবছর ২০২৪-২৫ এ শিল্প খাতে মোট প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪.৩%। অক্টোবর (১১.৩৯%) ও ডিসেম্বর (১০.৩৬%)—দুই মাসে ভালো প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও আগস্টে উৎপাদন ছিল নেতিবাচক। স্থায়ী গতি না থাকায় শিল্প সম্প্রসারণও হয়নি, আর সেটার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানে।
শ্রমশক্তি জরিপে দেখা যায়—
• ২০২৪ সালে বেকারত্ব বেড়ে ৩.৬৬%, যা আগের বছর ছিল ৩.৩৫%
• যুব বেকারত্ব ৭.২৫% → ৮.০৭%
• শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা তরুণদের হার (NEET) বেড়ে ২০.৩%
কাঠামোগত অর্থনৈতিক রূপান্তর হলেও চাকরি সৃষ্টির সেই ধারা তৈরি হয়নি—এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট।
মূল্যস্ফীতি কমলেও মানুষের কষ্ট রয়ে গেছে
জুন ২০২৫-এ মূল্যস্ফীতি নেমে আসে ৮.৪৮%, যা দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও এক অঙ্কে এসেছে। কিন্তু চালের দাম উদ্বেগ তৈরি করেছে। জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে চালের অবদান দাঁড়ায় ৫১.৫৫%। বোরো মৌসুমের পরে উৎপাদন বেড়লেও বাজারে তার প্রভাব তেমন দেখা যায়নি।
অর্থবছর ২০২৫-এ আউশ উৎপাদন কমেছে ০.৮৫%, আর আমন কমেছে ৬.০৪%। বন্যা, অনিশ্চিত আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কৃষিকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। এর বড় প্রভাব পড়ছে খাদ্য নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতিতে।
সরকারের পদক্ষেপ: ব্যাংক কাঠামো সংস্কার থেকে ইনভেস্টমেন্ট সামিট
অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে—
• দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ
• বাংলাদেশ ব্যাংককে বাড়তি ক্ষমতা প্রদান
• শ্রমবাজারে বরাদ্দ বৃদ্ধি
• বিডার কাঠামোগত সংস্কার
• বিনিয়োগ বাড়াতে ইনভেস্টমেন্ট সামিট
কিন্তু উচ্চ সুদের দেয়ালে বিনিয়োগ এখনো আটকে আছে। শিল্প উৎপাদনও প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছে না, ফলে কর্মসংস্থানেও তৈরি হচ্ছে না নতুন গতি।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুর জানান—তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অর্থনীতি স্বস্তির দিকে ফেরাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার মতে, বাংলাদেশ অর্থনীতি এখনো চাপের মুখে থাকলেও পুনরুদ্ধারের পথে এগোচ্ছে।

