জিডিপির প্রবৃদ্ধি বা মূল্যস্ফীতি পরিমাপ করতে অসংখ্য পরিসংখ্যানের প্রয়োজন হয়। তবে এগুলো ব্যক্তিগত তথ্য নয়। এসব তথ্য অন্য উৎস থেকে সংগৃহীত হয়।
আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুযায়ী, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করলে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে গোপন রাখতে হয়। কিন্তু জিডিপি বা মূল্যস্ফীতির হিসাব আসে অন্যান্য সূত্র থেকে, যেখানে কোনো গোপনীয়তার প্রয়োজন নেই।
প্রতিটি বছর জিডিপি ও মূল্যস্ফীতি কিভাবে হিসাব করা হচ্ছে, কোন বাজার থেকে কোন সামগ্রীর দাম নেওয়া হচ্ছে—সব কিছু উন্মুক্ত। সাংবাদিক রিজভীর সঙ্গে কথা বলার সময় আমি বলেছি, যদি মনে হয় বাজারের দাম এবং সরকারি পরিসংখ্যানের মধ্যে পার্থক্য আছে, তবে বিবিএসে যাচাই করুন। আলু, পেঁয়াজের দাম ঠিক কোন বাজার থেকে নেওয়া হয়েছে তা পরীক্ষা করতে পারবেন। এ স্বচ্ছতাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
এ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন একটু কঠিন। তবে বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান ডিজিটালাইজড করা হচ্ছে। বিবিএসকেও সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একবার ডিজিটালাইজড হলে, গবেষক বা সাংবাদিক চাইলে তথ্য সংগ্রহ এবং যাচাই করতে পারবেন। এতে গবেষকরা পরামর্শ দিতে পারবেন—‘এই পরিমাপের জন্য আরও ভালো উৎস ব্যবহার করলে ফল আরও নির্ভুল হতো।’ ফলস্বরূপ, বিবিএসের তথ্যভান্ডার আরও সমৃদ্ধ হবে।
সংস্কারের বিষয়গুলো প্রাতিষ্ঠানিক বা আমলাতান্ত্রিক। কিন্তু বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলে, অবৈধ আয় বা ‘রেন্ট সিকিং’ কমাতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু নতুন আইন বা বিধিবিধান যথেষ্ট নয়। অতীত দেখিয়েছে, যদি অবৈধ আয়ের একটি উৎস বন্ধ করা হয়, অন্য একটি উৎস খুঁজে বের করা হয়।
যেকোনো রাষ্ট্রের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা দেখলে দেখা যায়, সফল বা ব্যর্থ—উভয় উদাহরণই রয়েছে। গণতান্ত্রিক হোক বা একদলীয় শাসন, সব ধরনের শাসনব্যবস্থায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলতে মূলত বোঝায়—দুই-তিন দশক ধরে জিডিপি ৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পাওয়া। দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, চীন, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার উদাহরণ এই সত্য প্রমাণ করে।
এই দেশগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো শাসন ব্যবস্থায় জবাবদিহি। প্রশাসনের সব স্তরে সফলতা বা ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, চীনে ১৯৮০-এর দশকে বাজারমুখী সংস্কার শুরু হলেও, দলের ভেতরে সব নীতি নির্ধারক ও কর্মকর্তা সময়ভিত্তিক ও ফলাফলভিত্তিক জবাবদিহির আওতায় ছিল। ভিয়েতনামে ১৯৯০-এর দশকে বাজার অর্থনীতি নীতি চালু হওয়ার সময়ও একই ধরনের ব্যবস্থা ছিল।
একটি দেশের আচরণবিধি, মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক আস্থা উদারীকরণের সফলতায় বড় ভূমিকা রাখে। ভিয়েতনামের ব্যবসায়ী নিজেই নিয়ম ঠিক করেছিল—কেউ অসম প্রতিযোগিতায় যাবে না, মূল্য হার প্রতিযোগিতামূলক থাকবে এবং ঋণ ফেরত দেওয়া হবে। এটি পুরোপুরি সাংস্কৃতিক দিক।
জবাবদিহির সঙ্গে দায়িত্ববোধও গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে, একজন ডাক্তার সময়মতো অফিসে আসছেন কি না, রোগী দেখছেন কি না, সেটা জবাবদিহি। কিন্তু রোগীর বাড়ি গিয়ে অর্থ সাহায্য করা হলো দায়িত্ববোধ। প্রাইমারি শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও একই। আমার ছোটবেলায় শিক্ষকরা ছাত্রদের বাসায় গিয়ে শিক্ষাগত সহায়তা দিতেন—এটাই দায়িত্ববোধ।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বাজার অর্থনীতিতে ন্যায্য সমাজ ও বৈষম্য কমানো কঠিন। নীতিনির্ধারণে আদর্শগত পার্থক্য থাকে—বাম, ডান বা মধ্যম অবস্থান। তবে আশা করা যায়, নির্বাচনী ইশতেহারে এসব অন্তর্ভুক্ত হবে।
ন্যায্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলতে বোঝানো হয় সামাজিক ও আয়ের ভারসাম্য। কেবল দারিদ্র্য কমানো বা সুরক্ষা দেওয়াই যথেষ্ট নয়। সরকারকে প্রয়োজনীয় আয় নিশ্চিত করতে হবে, করনীতি স্থির করতে হবে, বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, উদ্যোক্তাদের সমান সুযোগ দিতে হবে। পরিবেশের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থও রক্ষা করতে হবে।
পরিবেশ নিয়ে ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণে সাধারণত ৩০ বছরের সময় ধরা হয়। আজকের ক্ষতি এবং ৩০ বছর পরের ক্ষতির মূল্য সমান ধরা হয় না। ভবিষ্যতের ক্ষতি কম গণ্য করা নৈতিক নয়। এটি অর্থনীতিবিদদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
আমার বই দুটোতে এসব বিষয় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তবে প্রকাশ্যে আলোচনা করলে দল-নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ হতে পারে। তাই আমি দুটি মৌলিক প্রতিপাদ্য দিয়ে শেষ করি:
১. কোনো দেশই এত দরিদ্র নয় যে, তার সব নাগরিকের ন্যূনতম জীবিকা ধারণের চাহিদা মেটানো সম্ভব না। প্রয়োজন শুধু অর্থনৈতিক কাঠামো ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
২. সুশাসন হলো সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে স্বার্থের সমন্বয় বা ভারসাম্য রক্ষা করা। আয় বণ্টনের চূড়ান্ত নির্ধারণ সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর নির্ভর করে। ফরাসি অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটিও বলেছেন, পুঁজিবাদী অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবণতা হলো বৈষম্য বাড়ানো।

