২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতা নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর অবস্থায় পেয়েছিল। বিশেষ করে ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারসহ সামগ্রিক অর্থ খাতে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, তিনি একটি শক্তিশালী অর্থনীতি দিয়ে দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন এবং শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর নির্বাচন আয়োজন করবেন। আগামী নির্বাচনের চিত্র জীবনানন্দের রূপসী বাংলার মতো সৌন্দর্যমণ্ডিত হবে কিনা, তা এখন বলা কঠিন। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায় অর্থনীতি এখনও শক্ত ভিত্তিতে নেই। সামগ্রিক খাতের ভঙ্গুরতা কমেনি, বরং বেড়েছে।
বিনিয়োগের দুর্বলতা শুধু পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সঠিক বিনিয়োগ পরিবেশের অভাব এমন মাত্রা আগের ৩৫ বছরে দেখা যায়নি। অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভীতি, যা গত ১৬ মাস ধরে অব্যাহত। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও মব-তাণ্ডবের কারণে ব্যবসায়ীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। তিন শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে। কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা কমেছে, বেকারত্ব বেড়েছে।
জিডিপির প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি শতকরা চার ভাগের নিচে নেমেছে, যা কভিডের বছর বাদে গত ৩৫ বছরে দেখা যায়নি। সব মিলিয়ে বর্তমান সরকার আগামী নির্বাচিত সরকারের জন্য অর্থনীতির পরিস্থিতি কঠিন করে রেখেছে। তবে এই ‘কঠিনের মধ্যেও আশা’ মেনে আগামী নির্বাচিত সরকার অর্থনীতিতে পুনর্জাগরণের ঢেউ আনতে সক্ষম হবে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এই অমোঘ বিশ্বাসের পেছনে নেই কোনো গণকের মন্তব্য বা রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের প্রভাব। এটি মূলত অর্থনৈতিক ইতিহাস থেকে পাওয়া শিক্ষা। সব দেশের বিনিয়োগে এক জোয়ার আসে যখন অনিশ্চয়তা, অদক্ষতা বা দুর্বলতা কমে যায়। এটি একটি রাজনৈতিক–বাণিজ্যিক চক্র, যা আমরা আগেও দেখেছি। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর বিনিয়োগ নতুন উদ্দীপনায় ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
চীনের উদাহরণও চোখে পড়ে। ১৯৮৯ সালের এপ্রিল থেকে বেইজিংয়ের তিয়েন-আনমেন স্কোয়ারে তরুণরা গণতন্ত্রের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করলে বিদেশী বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। জুনে চীন সরকার কঠোর অবস্থান নিয়ে বিদ্রোহ দমন করলে বিশ্ব, বিশেষ করে পুঁজিবাদী দেশগুলো নিন্দা জানিয়েছিল। তবুও ১৯৯১ সাল থেকে বিনিয়োগকারীরা চীনের বাজারে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
বিনিয়োগের জন্য নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্বল প্রশাসন এটি দিতে ব্যর্থ হওয়ায় উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে পারেননি। নির্বাচিত সরকার এই গুটিয়ে যাওয়া উদ্যোক্তাদের ভরসা দিতে পারবে। শর্ত একটিই—সরকারি কর্তাদের আইন-শৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার দৃশ্যমান উন্নয়নে আন্তরিক ও সক্ষম হতে হবে। শুধু ‘সিঙ্গাপুর হওয়ার স্বপ্ন’ বা ‘দর্শক থেকে খেলোয়াড়’ হওয়ার কথাই যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান দৌরাত্ম্য। বিগত আওয়ামী সরকার এটি লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল। অসৎ ও ক্ষমতাসীন ব্যবসায়ীরা এই সুযোগে অর্থ লুণ্ঠন করত। এমন পরিস্থিতিতে একজন হিসাববিদকে অর্থমন্ত্রী করা হয়েছিল। তিনি খেলাপি ঋণের বিকৃত সংজ্ঞার এক অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তার সুনাম ছিল অর্থ পাচার ও শেয়ারবাজার কেলেংকারিতার ক্ষেত্রেও।
অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেয়। এটি সরকারের বড় উদ্যোগ। নতুন গভর্নর যোগ্য ও স্বাধীন। তিনি আগের সরকারের অবসরপ্রাপ্ত আমলা গভর্নরদের মতো অর্থমন্ত্রীর হুকুমের অপেক্ষায় থাকেন না।
নতুন গভর্নরের সামনে পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল—উচ্চ মূল্যস্ফীতি, তারল্য সংকটে নিমজ্জিত কয়েকটি ব্যাংক, বৈদেশিক রিজার্ভের নিম্নগমন, বর্ধমান খেলাপি ঋণ এবং লেনদেনের ভারসাম্যে টানাপড়েন। প্রথম কাজ হিসেবে তিনি নীতি সুদহার বা রেপো রেট শতকরা ১০ ভাগে উন্নীত করেন। এটি কঠোর মুদ্রানীতির (‘টাইটেন্ড’) লক্ষণ। এতে ব্যক্তি খাতে ঋণগ্রহণ কমে আসে। ২০২৫ অর্থবছরে এটি মাত্র সাড়ে ৬ ভাগে নেমেছে, স্বাভাবিক সময়ে যা ১২–১৬ ভাগের মধ্যে থাকার কথা।
এ কষায়ণের কারণে মূল্যস্ফীতির হার কমার কথা ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার গঠনের সময় গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৯৫ শতাংশ। ১৫ মাস পর, ২০২৫ সালের নভেম্বরে তা অতি সামান্য কমে ৮.৯৬ শতাংশে ঠেকেছে। মাত্র এক শতাংশের পতন পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নয়। প্রতিবেশী দেশগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা যায়নি। বিশ্ববাজারে তেল ও পণ্যমূল্যও এখন সহনীয়। তবুও বলা যায়, গভর্নর মূল্যস্ফীতির প্রবণতাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এনেছেন।
মূল্যস্ফীতি আশানুরূপভাবে কমেনি। এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের ওপর অবাধ চাঁদাবাজি দমনে ব্যর্থ হয়েছে। মুমূর্ষু ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা এবং সরকারের রাজস্ব আদায় ব্যর্থতার ক্ষতি পোষাতে টাকা ছাপানো স্ববিরোধী কাজগুলো মূল্যস্ফীতিকে উচ্চ পর্যায়ে ধরে রেখেছে।
পাঁচটি শরিয়াহ ব্যাংককে একীভূত করা হলেও গ্রাহকরা এখনো তাদের আমানত ঠিকভাবে পাচ্ছেন না। মুদ্রা পাচার কমেছে কি না, তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। তবে ছন্দপতন দেখা দিয়েছে। অনেক পাচারকারী দৌড়ের ওপর রয়েছেন। কেউ সুযোগের অপেক্ষায়, কেউ নির্বাচনী খরচের কারণে মুদ্রা পাচার স্থগিত রেখেছেন। কিছু ব্যবসায়ী কড়াকড়ি অমান্য করেও পাচার কমিয়েছে।
নতুন গভর্নর ডলারের দামকে বাজারভিত্তিক করার ফলে বৈধ রেমিট্যান্স প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ অর্থবছরে রেমিট্যান্স ছিল প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩০ বিলিয়নের সামান্য ওপরে পৌঁছেছে। ২০২৭ অর্থবছরে এটি ৩৩–৩৬ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে থাকার আশা করা হচ্ছে। নির্বাচনী মৌসুমে এমপিকে সহায়তা দিতে ভাই-বন্ধুরা পাঠানো টাকা সরকারের চলতি হিসাবকে আরও ধনাত্মক করবে।
এর সুফল পড়েছে বৈদেশিক রিজার্ভে। বছরের শেষে এটি প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শেষে রিজার্ভ ছিল মাত্র ২০.৫ বিলিয়ন ডলার। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে আসে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দক্ষতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। গভর্নর আগের সরকারের শেষ সময়ে প্রাপ্ত নিম্নমুখী রিজার্ভকে হালকা পাতলা হলেও ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরিয়েছেন। তবে সম্প্রতি সংকুচিত আমদানির কারণে এই সঞ্চয় কিছুটা সন্তোষজনক হলেও স্বাভাবিক সময়ের সাবলীল আমদানির তুলনায় যথেষ্ট নয়। ক্ষুধামান্দ্য বা খাদ্যের ব্যয় কমে যাওয়াকে ভালো লক্ষণ হিসেবে দেখা যাবে না।
২০২৫ অর্থবছরে মূলধনপণ্যের আমদানি ২৫ শতাংশ কমেছে। মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে। এ প্রবণতা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়তা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান কমিয়ে দিয়েছে। এ কারণেও জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে গেছে।
চিন্তার বিষয়, ২০২৫ সালের জুলাই-নভেম্বরেও আমদানির সক্ষমতা হারানোর প্রবণতায় কোনো পরিবর্তন হয়নি। মাত্র পাঁচ মাসে পুঁজিপণ্যের আমদানি কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ, মধ্যবর্তী পণ্য ১৬ শতাংশ ও পেট্রোলিয়াম পণ্য ১১ শতাংশ।
অর্থনীতির এ গুরুত্বপূর্ণ আমদানির পতন না হলে শুধুমাত্র রেমিট্যান্সের ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি ও রফতানির পৌনে ৮ শতাংশ বৃদ্ধির মাধ্যমে রিজার্ভ বাড়ানো সম্ভব হত না। তাই রিজার্ভ বৃদ্ধির গল্প পুরোপুরি সুখকর নয়। এর জন্য অর্থনীতিকে যথেষ্ট মূল্য দিতে হয়েছে। ২০২৬ সালে নির্বাচিত সরকার আসার পর বিনিয়োগ পুনর্জাগরণের সময় রিজার্ভ সংকট আবার সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
২০২৫ অর্থবছরে আমদানি ছিল প্রায় ৬৮ বিলিয়ন ডলার, রফতানি প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলার। রিজার্ভকে স্বস্তির অবস্থায় রাখতে কমপক্ষে ছয় মাসের আমদানি ব্যয় নির্বাহের ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। অর্থাৎ ২০২৬ সালে ৪০–৪২ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ প্রয়োজন হবে। আমদানি বাড়লে রফতানিও বাড়বে।
অন্তর্বর্তী সরকার আসার আগে, ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণ ছিল মোট ঋণের প্রায় ১৩ শতাংশ। সেই বছর সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ১৭ শতাংশ, ডিসেম্বরে ২০ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২৫ সালের মার্চে তা ২৪ শতাংশ, জুনে ৩৪ শতাংশ ও সেপ্টেম্বরে ৩৬ শতাংশে দাঁড়ায়। খেলাপি ঋণের এ দ্রুত বৃদ্ধি ক্যান্সার থেকে করোনা মহামারির পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটি নবনির্বাচিত সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ।
প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংক শুরুতে আমলা গভর্নরের সংজ্ঞা বাদ দিয়ে খেলাপি ঋণের প্রকৃত অবস্থার একটি মানসম্পন্ন সংজ্ঞা চালু করেছিল। এটি ছিল ভালো উদ্যোগ। তবে কিছুদিনের মধ্যেই নতুন গভর্নর অনুধাবন করলেন, সুস্থ সংজ্ঞা অনুসরণ করলে খেলাপি ঋণ ৫০ শতাংশে গিয়ে পৌঁছাবে। এতে আমানতকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ণ হবে এবং ব্যাংক খাতকে সোজা পথে বসানো কঠিন হয়ে যাবে। ভয়ের কারণে গভর্নর আবার ফিরে গেলেন আগের আওয়ামী আমলের ‘টিপ অব দ্য আইসবার্গ’ সংজ্ঞায়, যা সমস্যাটিকে ছোট করে দেখাবে। এতে কিছু চালাকির ছাপ থাকলেও দৃঢ় নীতি-সামঞ্জস্য দেখা যায় না।
দ্বিতীয়ত, শুধু সংজ্ঞার পরিবর্তনে খেলাপি ঋণ বেড়ায়নি, প্রকৃত অংকেও বৃদ্ধি হয়েছে। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের অভিযোগ, তারা ব্যবসা করতে পারছেন না। কল-কারখানা ঋণের অভাব, চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্যের কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সংস্কারের নামে অস্থিরতা বেড়েছে। এর ফলে হাজার হাজার ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে খেলাপি ঋণে পতিত হচ্ছেন। নির্বাচিত সরকারের প্রধান কাজ হবে এই উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদেরকে উদ্ধার করা।
চলমান সরকারের মতো ইতিহাস ও ‘সভ্যতা’ নিয়ে ব্যস্ত হলে নির্বাচিত সরকারকে আবারও জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। ২০২৬ সালের অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ার পূর্বশর্ত হলো সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চিত ব্যবস্থা। নির্বাচিত সরকার যদি প্রথমে এ দিকে নজর দেয়, তাহলে দ্বিতীয় ধাপে ব্যাংক খাতের পুনর্গঠন কঠিন হবে না। এরপর বিনিয়োগ পুনর্জাগরণের প্রক্রিয়া স্বাভাবিক গতিতে এগোবে। এটাই বিনিয়োগের প্রকৃতি।

