সাধারণত অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়। তবে এবার সেই চিত্র বদলেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে লক্ষ্যমাত্রা কমানোর বদলে উল্টো বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যমান লক্ষ্যের সঙ্গে যোগ করা হয়েছে আরও ৫৫ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই বাড়তি কর আদায়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষ এমনিতেই বিপর্যস্ত। ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়েছে। এই অবস্থায় রাজস্ব বাড়াতে গিয়ে অতিরিক্ত কর আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ বলেন, আইএমএফের চাপে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলেও তা পূরণ হবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। বর্তমানে এনবিআর বড় ঘাটতিতে রয়েছে। আইএমএফকে সন্তুষ্ট করতে রাজস্বের লক্ষ্য বাড়ানো হয়েছে। এই অতিরিক্ত রাজস্ব সাধারণ মানুষকেই পরিশোধ করতে হবে। এতে তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
এনবিআর সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে ই-রিটার্ন ও অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাড়া-মহল্লা ও উপজেলা পর্যায় থেকেও করদাতা শনাক্ত করা হচ্ছে। এসব এলাকা থেকে ভ্যাটযোগ্য প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করতে কাজ চলছে। শীর্ষ ১০০ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চাকরিজীবীরা সঠিকভাবে ই-রিটার্ন দিচ্ছেন কি না, তা কঠোরভাবে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেশি আয়ের অভিভাবকদের তালিকা সংগ্রহ করে কর পরিশোধের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় থেকে কর্মকর্তাদের করসংক্রান্ত তথ্য দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) থেকে গাড়ির মালিকদের তথ্য নিয়ে কর পরিশোধের অবস্থা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট মালিকদের আয়-ব্যয়ের হিসাবও নজরদারিতে রয়েছে। এনবিআরের তিনটি গোয়েন্দা শাখা তৎপরতা বাড়িয়েছে। প্রতিটি বন্দরে অতিরিক্ত গোয়েন্দা মোতায়েন করা হয়েছে। বিনা নোটিশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে রাজস্ব পরিশোধের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি এম মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, দেশে ঋণের সুদহার বেশি। জ্বালানিসংকট চলছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম চড়া। সামনে নির্বাচন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। পরিবহন খরচ বেড়েছে। সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কার্যত স্থবির। এমন সময়ে বাড়তি রাজস্বের চাপ দিলে সব খাতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসা ভালো না থাকলে মানুষের আয় বাড়ে না। চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ারও তেমন খবর নেই। সরকার রাজস্ব আদায়ের চাপ বাড়ালে শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিবারের মতো এবারও এনবিআর রাজস্ব আদায়ে পিছিয়ে আছে। এমন অবস্থায় অর্থবছরের মাঝপথে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো উচ্চাভিলাষী সিদ্ধান্ত। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে পারলে রাজস্ব আদায় বাড়তে পারত। কিন্তু এনবিআর এখনো সে সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতির চাপে আছে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত সব পণ্যের দাম বেড়েছে। তিন বেলা পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করতেই মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পাড়া-মহল্লা বা উপজেলার দোকানপাটে এনবিআর অভিযান চালালে পণ্যের দাম আরও বাড়বে। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে।
বাংলাদেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফ ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করে। একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার এবং ডিসেম্বরে দ্বিতীয় কিস্তির ৬৮ কোটি ১০ লাখ ডলার দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের জুনে তৃতীয় কিস্তির ১১৫ কোটি ডলার দেয় সংস্থাটি। গত জুনে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির মোট ১৩৩ কোটি ডলার ছাড় করা হয়।
সাড়ে তিন বছরে সাত কিস্তিতে ৪৭০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলার। বাকি রয়েছে ১০৬ কোটি ডলার। গত বছরের জুনে আইএমএফ বাংলাদেশের ঋণ কর্মসূচির মেয়াদ ছয় মাস বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ঋণের পরিমাণ আরও ৮০ কোটি ডলার বাড়িয়ে মোট ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়েছে। কিস্তির সংখ্যা সাত থেকে বাড়িয়ে আটটি করা হয়েছে। ফলে সংস্থাটির কাছ থেকে আরও ১৮৬ কোটি ডলার পাওয়ার কথা। নতুন সময়সূচি অনুযায়ী ঋণ কর্মসূচি শেষ হবে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে। ঋণ অনুমোদনের সময় আইএমএফ রাজস্ব আদায় বাড়ানো ও লক্ষ্যমাত্রা পূরণের শর্ত দিয়েছিল।
কিন্তু ঋণ গ্রহণের পর থেকে একবারও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি এনবিআর। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই রাজস্ব ঘাটতি ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
চলতি অর্থবছরে এনবিআরকে ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা শুল্ক ও কর আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছিল। পরে এর সঙ্গে আরও ৫৫ হাজার কোটি টাকা যোগ করা হয়। এর মধ্যে আমদানি-রপ্তানি পর্যায়ে শুল্কে ১৪ হাজার কোটি টাকা, ভ্যাটে ২০ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা এবং আয়করে ২০ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা ভালো নয়। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ীরা নানা সমস্যায় ভুগছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় না নিয়ে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে, যা ব্যবসায়ীদের আরও বেকায়দায় ফেলছে।
তৈরি পোশাকমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মো. হাতেম বলেন, জ্বালানিসংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অল্প আয়ের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চরম সংকটে। খেলাপি ঋণও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে তা আদায়ের জন্য ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ দেওয়া হচ্ছে, যা যৌক্তিক নয়।

