দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ থেকে ডিজিটাল ভ্যাট রিফান্ড প্রক্রিয়া চালু করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা সরাসরি এনবিআরের কর্মকর্তাদের কাছে হাজির না হয়ে অনলাইনে আবেদন করতে পারবে। করদাতারা জানিয়েছেন, আবেদন জমা দেওয়ার ১০ কার্যদিবসের মধ্যে অতিরিক্ত ভ্যাট ব্যাংকে ফেরত পাওয়া যাবে।
এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও কর বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এটি সময় সাশ্রয় করবে, কর অফিসে যাতায়াতজনিত ঝামেলা কমাবে এবং পুরোনো ম্যানুয়াল পদ্ধতির ধীরগতি ও দুর্নীতিপ্রবণতার সমস্যার সমাধান করবে।
এনবিআরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, প্রথম ধাপে ভ্যাট রিফান্ড বা ই-ভ্যাট সিস্টেমের মাধ্যমে সরাসরি ব্যাংকে টাকা পাঠানো হবে। পরবর্তী সময়ে আয়কর ও কাস্টমস শুল্কসহ অন্যান্য করের রিফান্ডও ধাপে ধাপে এই অনলাইন পদ্ধতির আওতায় আনা হবে। বৈশ্বিকভাবে ডিজিটাল রিফান্ড প্রক্রিয়া ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ ও স্বচ্ছ পরিবেশ তৈরি করবে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এটি কর রিফান্ড প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর ও দ্রুততর করবে।
হাজার কোটি টাকা আটকে আছে ভ্যাট রিফান্ডে:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কেবল ভ্যাট উইংয়ের কাছে ব্যবসায়ীদের জন্য তৈরি রিফান্ডের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১,৪৬৬ কোটি টাকা। এর একটি বড় অংশ বছরের পর বছর ধরে আটকে আছে। এছাড়া আয়কর ও কাস্টমস উইংয়ে কত রিফান্ড তৈরি হয়েছে, তার সামষ্টিক কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, এই পরিমাণও কয়েক হাজার কোটি টাকার বেশি হবে।
ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, আইন অনুযায়ী রিফান্ড পাওয়ার কথা থাকলেও তা নিয়মিত বিলম্বিত হয়। অধিকাংশ ভ্যাট রিফান্ড হয় বাণিজ্যিক পণ্য আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে। তারা আমদানি পর্যায়ে আগাম কর (ইট) জমা দেন। পরবর্তী হিসাব সমন্বয়ের পরে যদি দেখা যায়, প্রকৃত ভ্যাট আগাম করের চেয়ে কম হয়েছে, তাহলে বাকি অংশ রিফান্ডযোগ্য হয়। তবে রিফান্ড দাবি করার প্রক্রিয়া প্রচলিতভাবে দীর্ঘ এবং ব্যয়সাপেক্ষ। ব্যবসায়ীরা জানান, কর অফিসে বারবার যেতে হয়।
বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) জানায়, দেশে প্রায় ৬ হাজার বাণিজ্যিক আমদানিকারক রয়েছে। এদের মধ্যে একটি বড় অংশেরই নিয়মিত রিফান্ড তৈরি হয়। ঢাকাভিত্তিক এক ব্যবসায়ী, নাম প্রকাশ না করার শর্তে, বলেন, “রিফান্ড পেতে তিন বছর বা তার বেশি সময় লাগে। টাকা ছাড় করাতে প্রায় ২০ শতাংশ কর্মকর্তাদের পেছনে খরচ হয়ে যায়।”
ফয়সাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী মো. সোলায়মান পার্সি ফয়সাল বলেন, বিদ্যমান ম্যানুয়াল ব্যবস্থা ব্যবসায়ীদের ঝুঁকিতে ফেলে। তিনি বলেন, “এনবিআরের কাছে রিফান্ড তৈরি হলে বর্তমান ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে তা আদায় করতে গেলে কর্মকর্তারা অনেক সময় জিম্মি করে ফেলেন। তারা অতিরিক্ত ডকুমেন্টস চান এবং হয়রানি করেন।” তিনি আরও যোগ করেন, “এতে সময় বেশি লাগে এবং অতিরিক্ত খরচ করতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে আমরা দাবি জানিয়ে আসছি, রিফান্ড ব্যবস্থাকে অনলাইনে আনা হোক। অনলাইন হলে হিউম্যান ইন্টারেকশন কমবে, হয়রানি ও বাড়তি খরচও কমবে।”
বিশেষজ্ঞরা দেখছেন আস্থা ফেরানোর সুযোগ:
এনবিআরের সাবেক সদস্য লুৎফর রহমান মনে করেন, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে অনলাইন রিফান্ড উদ্যোগ করদাতা ও রাজস্ব কর্তৃপক্ষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।
তিনি বলেন, “যেসব দেশে কমপ্লায়েন্ট কর ব্যবস্থা আছে, সেখানে রিফান্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে করদাতার একাউন্টে জমা হয়। এ কারণে মানুষ কর প্রদানে আগ্রহী হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই ব্যবস্থা নেই। তাই অনেকেই কর দেওয়ায় অনীহা প্রকাশ করেন।” তিনি আরও বলেন, করদাতা ও রাজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্যে অবিশ্বাস থাকায় অনেক ব্যবসায়ী পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে চায় না। তবে যদি বাড়তি কর অটোমেটিকভাবে ব্যাংকে ট্রান্সফার হয়, তাহলে হয়রানি কমবে এবং মানুষ যথাযথ ট্যাক্স প্রদানে উৎসাহী হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভ্যাট ব্যবস্থায় এই অনলাইন রিফান্ড কার্যকর হলেও দ্রুত আয়কর ও কাস্টমস করেও একই ব্যবস্থা চালু করা দরকার। এছাড়া, অনলাইন রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অনলাইন রিফান্ডের মধ্যেও সংশয় রয়ে গেছে:
অনলাইন রিফান্ডের আশাবাদ থাকা সত্ত্বেও কিছু ব্যবসায়ী নেতা এখনও সংশয় প্রকাশ করেছেন। ইস্পাত আমদানিকারক ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক আমির হোসেন নূরানি বলেন, কাঠামোগত সমস্যাগুলো এখনো সমাধান হয়নি। তিনি বলেন, “আমার ক্ষেত্রে প্রকৃত ভ্যালু এডিশন ১ শতাংশের কম, অথচ আমদানি পর্যায়ে আমাকে ৭.৫ শতাংশ পরিশোধ করতে হয়। বাকী অর্থ এখনও রিফান্ড পাইনি।” তিনি আরও বলেন, “রিফান্ড পাওয়ার শর্ত সহজ করা না হলে, অনলাইন-ভিত্তিক হলেও রিফান্ডে বড় অগ্রগতি হবে না।”
রিফান্ড কেন তৈরি হয়:
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া জানান, আমদানি পর্যায়ে পরিশোধিত কর প্রকৃত ভ্যাট দায়ের চেয়ে বেশি হলে মূলত রিফান্ড তৈরি হয়। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, “যেমন কারো ভ্যাট ৩০ টাকা, কিন্তু তিনি ৫০ টাকা পরিশোধ করেছেন। বাকী ২০ টাকা তার রিফান্ড হওয়ার কথা।”
তিনি আরও বলেন, একই সার্ভিসের ক্ষেত্রে দুই দফায় ভ্যাট কর্তন হলে রিফান্ড সৃষ্টি হয়। এছাড়া ভ্যাট মওকুফ থাকা সত্ত্বেও রপ্তানিমুখী শিল্পে আমদানিকৃত কাঁচামালে ভ্যাট বা অগ্রিম কর পরিশোধ করলে রিফান্ড হয়। স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, “আইন অনুযায়ী এসব রিফান্ড পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ব্যবসায়ীরা হয়রানি, ঘুষ এবং বছরের পর বছর অপেক্ষার মুখে পড়েন। অনলাইন পদ্ধতিতে রিফান্ড ব্যবস্থা চালু হলে এসব ঝামেলা কমবে।”
৩–১০ দিনের মধ্যে রিফান্ড পাওয়ার সুযোগ:
এনবিআরের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, পুরোনো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ভ্যাট রিফান্ড পেতে ৬ মাস বা তারও বেশি সময় লেগে যেত। তবে অনলাইন পদ্ধতি পুরোপুরি চালু হলে রিফান্ড ৩ থেকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে পাওয়া সম্ভব হবে। তবে এর জন্য কিছু শর্ত মানতে হবে।
ঢাকার একজন ভ্যাট কমিশনার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনলাইনে রিফান্ড পেতে হলে অবশ্যই রিটার্ন অনলাইনে জমা দিতে হবে। বর্তমানে এনবিআরে জমা হওয়া ভ্যাট রিটার্নের প্রায় ৬০ শতাংশ অনলাইনে জমা হয়।
নতুন ব্যবস্থায় অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় প্রয়োজনীয় নথিপত্রও ডিজিটালি আপলোড করতে হবে। আবেদন আসার পর তা ডিভিশন অফিস পরীক্ষা করবে, যেখানে ২৪টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বিবেচনা করা হবে। সব কিছু সঠিক থাকলে আবেদন অনুমোদনের জন্য কমিশনারের কাছে পাঠানো হবে। কমিশনারের অনুমোদনের পর প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ের ব্যাংক একাউন্টে রিফান্ড সরাসরি ট্রান্সফার করা হবে। ওই কর্মকর্তা বলেন, “এজন্য ব্যবসায়ী বা তার প্রতিনিধি ভ্যাট অফিসে আসার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু যদি কোনো নথি ঘাটতি থাকে, বা কর্মকর্তাদের কোনো পর্যবেক্ষণ থাকে, শুধুমাত্র তখনই অফিসে এসে সেই নথি জমা দিতে হবে।”

